ইরানের ওপর আসন্ন সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে আসায় আন্তর্জাতিক অর্থ ও মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামরিক উত্তেজনার পারদ হঠাৎ নেমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছেন। এর ফলে প্রধান প্রধান মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, আর অন্যদিকে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে শেয়ারবাজার ও মূল্যবান ধাতুর বাজার।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে এবং একটি সম্ভাব্য চুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এই আলোচনা এখন সরাসরি ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটও এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। যদিও ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, তেহরান এই চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান বজায় রেখেছে, তবুও ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাধারণত আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সামরিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সম্পদ রক্ষায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করেন। এর ফলে বাজারে ডলারের চাহিদা এবং মান উভয়ই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ বা সংঘাতের শঙ্কা কেটে গিয়ে যখন শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা সাধারণত শেয়ারবাজারের মতো তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা ঠিক সেই কৌশলই গ্রহণ করেছেন।
এই ঘটনার আগে দিনের শুরুতেই ট্রাম্পের মনোভাব ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় ইরানের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানতে পারে। এমনকি তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে টানা দুদিনের হামলার ঘটনায় যখন বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল, তখনই ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা পরিস্থিতিকে অনেকটা শান্ত করে দিয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বমুদ্রাবাজারে। সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান প্রায় শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৭৯৪৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। দিনের শুরুতে ডলারের সামান্য যে উত্থান ছিল, তা দ্রুত হারিয়ে যেতে দেখা গেছে। ইউরো ও জাপানি ইয়েনসহ বিশ্বের প্রধান মুদ্রাসমূহের বিপরীতে ডলারের মান পরিমাপকারী সূচকটিও প্রায় শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৯৯ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বাজার বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন এমন এক পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন যেখানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা হুটহাট বাড়ে আবার খুব দ্রুতই তা প্রশমিত হয়। তাদের মতে, সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কা থাকলে ডলারের অবস্থান শক্তিশালী থাকে, কিন্তু শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ামাত্রই শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়ে যায় এবং ডলারের চাহিদা কমে যায়। বিশেষ করে ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার ডলারের মতো প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান তিনটি সূচকই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লেনদেন শেষ করেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের নাসডাক সূচক দিনের শেষে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলারের মান কমে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ২০৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন আগামী সপ্তাহের দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাজারের ধারণা অনুযায়ী, সুদের হারের বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে আর্থিক খাতের ব্যবসায়ীরা ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার কিছুটা বৃদ্ধির সম্ভাবনা মাথায় রেখেই তাদের বিনিয়োগ কৌশল সাজাচ্ছেন। একই সঙ্গে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের দিকেও বিনিয়োগকারীরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের এই টানাপড়েন এবং বিশ্ব অর্থনীতির বড় ব্যাংকগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজার কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ধারণ করবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
ইরানের ওপর আসন্ন সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে আসায় আন্তর্জাতিক অর্থ ও মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামরিক উত্তেজনার পারদ হঠাৎ নেমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছেন। এর ফলে প্রধান প্রধান মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, আর অন্যদিকে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে শেয়ারবাজার ও মূল্যবান ধাতুর বাজার।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে এবং একটি সম্ভাব্য চুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এই আলোচনা এখন সরাসরি ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটও এই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। যদিও ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, তেহরান এই চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান বজায় রেখেছে, তবুও ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাধারণত আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সামরিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সম্পদ রক্ষায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করেন। এর ফলে বাজারে ডলারের চাহিদা এবং মান উভয়ই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ বা সংঘাতের শঙ্কা কেটে গিয়ে যখন শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা সাধারণত শেয়ারবাজারের মতো তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা ঠিক সেই কৌশলই গ্রহণ করেছেন।
এই ঘটনার আগে দিনের শুরুতেই ট্রাম্পের মনোভাব ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় ইরানের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানতে পারে। এমনকি তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে টানা দুদিনের হামলার ঘটনায় যখন বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল, তখনই ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা পরিস্থিতিকে অনেকটা শান্ত করে দিয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বমুদ্রাবাজারে। সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান প্রায় শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৭৯৪৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। দিনের শুরুতে ডলারের সামান্য যে উত্থান ছিল, তা দ্রুত হারিয়ে যেতে দেখা গেছে। ইউরো ও জাপানি ইয়েনসহ বিশ্বের প্রধান মুদ্রাসমূহের বিপরীতে ডলারের মান পরিমাপকারী সূচকটিও প্রায় শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৯৯ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বাজার বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন এমন এক পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন যেখানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা হুটহাট বাড়ে আবার খুব দ্রুতই তা প্রশমিত হয়। তাদের মতে, সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কা থাকলে ডলারের অবস্থান শক্তিশালী থাকে, কিন্তু শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ামাত্রই শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়ে যায় এবং ডলারের চাহিদা কমে যায়। বিশেষ করে ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার ডলারের মতো প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান তিনটি সূচকই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লেনদেন শেষ করেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের নাসডাক সূচক দিনের শেষে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলারের মান কমে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ২০৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন আগামী সপ্তাহের দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাজারের ধারণা অনুযায়ী, সুদের হারের বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে আর্থিক খাতের ব্যবসায়ীরা ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার কিছুটা বৃদ্ধির সম্ভাবনা মাথায় রেখেই তাদের বিনিয়োগ কৌশল সাজাচ্ছেন। একই সঙ্গে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের দিকেও বিনিয়োগকারীরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের এই টানাপড়েন এবং বিশ্ব অর্থনীতির বড় ব্যাংকগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজার কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ধারণ করবে।

আপনার মতামত লিখুন