নতুন দেশে পাড়ি জমানোর পর মাত্র ছয় মাসের মাথাতেই এরিন ক্ল্যাট নিজের জীবনের অন্যতম বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, জন্মভূমি ছেড়ে আসা এই নতুন দেশটিকেই তিনি নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানাতে চান। ২০১৬ সালে যখন তিনি ব্যক্তিগত নানা হতাশা এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন, তখন থেকেই তার মনে অন্য কোথাও থিতু হওয়ার এক সুপ্ত বাসনা কাজ করছিল। নিউজিল্যান্ডে এসে তার মনে হলো, জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ যেন এখানে এসেই পুরোপুরি মিলে গেছে। আর তাই, প্রায় এক দশক পর, চৌত্রিশ বছর বয়সে এসে তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজের জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও আইনি সম্পর্ক ছিন্ন করার এক সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের ফি বা মাশুল প্রায় আশি শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেওয়ার আগেই তিনি দুই হাজার তিনশো পঞ্চাশ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের শপথ পাঠ করেন।
এরিনের এই নতুন জীবনের শুরুটা হয়েছিল বেশ সাধারণভাবেই। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে দুগ্ধ খামারে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় নিউজিল্যান্ডেও তিনি খুব সহজেই একই ধরনের একটি পেশায় যুক্ত হতে পেরেছিলেন। সেই কাজের দক্ষতার সুবাদে পাওয়া বিশেষ এক ধরনের কর্মানুমতি বা ভিসা তাকে দেশটিতে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। ওই একই দুগ্ধ খামারে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত এক ইংরেজ যুবকের সঙ্গে। কাজের ফাঁকে গড়ে ওঠা সেই পরিচয় একসময় প্রণয়ে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একসঙ্গে যখন নিউজিল্যান্ডের স্থায়ী নাগরিকত্ব অর্জন করেন, ঠিক তখনই এরিন চূড়ান্তভাবে অনুভব করেন যে, এবার তার মার্কিন নাগরিকত্ব পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে।
নিজের এই বড় সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণের কথা উল্লেখ করেছেন এরিন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার কখনোই খুব একটা গভীর দেশপ্রেম বা আবেগের টান ছিল না। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দেশটি যে রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শের দিকে অগ্রসর হয়েছে, তা নিয়ে তিনি ভেতরে ভেতরে তীব্র হতাশা বোধ করতেন। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী মার্কিন নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত করের বোঝা—এই দুইয়ে মিলে নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্তটি তার কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক ও স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। শুধু এরিন নন, তার মতো অসংখ্য মার্কিন নাগরিক এখন এই পথে হাঁটছেন। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না, তবে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ প্রতি তিন মাস অন্তর এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে।
বিদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের বিভিন্ন আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মার্কিন রাজস্ব বিভাগের ওই তালিকায় প্রায় চার হাজার আটশো ঊননব্বই জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি ২০২০ সালের পর থেকে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ সংখ্যা, সে বছর প্রায় ছয় হাজার সাতশো পাঁচ জন নাগরিকত্ব ছেড়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চলতি বছর নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের ধারণা, গত বছরের তুলনায় এ বছর এই হার অন্তত পনেরো শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং আগামী কয়েক বছর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় চল্লিশ হাজার মার্কিন নাগরিককে আইনি পরামর্শ দিচ্ছে, যারা ইতোমধ্যেই নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন অথবা এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন।
তবে নাগরিকত্ব ত্যাগের এই আইনি প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। এরিন জানান, এই কাজ শুরু করতে গিয়ে তাকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল এবং সরকারি সহায়তা পাওয়াটা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি প্রথম বৈদ্যুতিক বার্তা বা ই-মেইলের মাধ্যমে সরকারকে তার ইচ্ছার কথা জানান। কিন্তু দীর্ঘ দুই মাস পর অক্টোবর পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তরই পাননি। পরবর্তীতে তিনি নিজে থেকে প্রয়োজনীয় সব ফরম পূরণ করে জমা দেন। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে তিনি অকল্যান্ডের মার্কিন দূতাবাসে সাক্ষাতের সুযোগ পান এবং মার্চ মাসে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ওই সময়টিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল, যা তার এই সিদ্ধান্তকে মানসিকভাবে আরও বেশি রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল। নাগরিকত্ব ত্যাগের পর এরিন এক অনাবিল স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করেন। তিনি জানান, নিজের এই সিদ্ধান্তে তিনি ভীষণ খুশি এবং এর জন্য তার মনে বিন্দুমাত্র কোনো অনুশোচনা নেই; বরং মাঝে মাঝেই তিনি এই ভেবে উল্লাস করেন যে, তিনি আর ওই দেশের কোনো অংশ নন।
অবশ্য সবার ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক ক্ষোভই নাগরিকত্ব ত্যাগের একমাত্র কারণ নয়। আন্তর্জাতিক কর ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনের অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, মার্কিন নাগরিকদের তাদের বিশ্বব্যাপী অর্জিত আয়ের ওপর মৃত্যু পর্যন্ত কর প্রদানের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা অনেককেই তাদের নাগরিকত্ব ছাড়তে বাধ্য করে। বিশেষ করে যারা দুর্ঘটনাবশত বা জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হয়েছেন, কিন্তু জীবনে কখনোই সেখানে বসবাস বা কাজ করেননি, তাদের জন্য এই করের বোঝা এক বিশাল মানসিক ও আর্থিক নিপীড়ন হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি অনেকের ক্ষেত্রে পরিচয়ের সংকটও একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ইতালিতে বসবাসরত এক দ্বৈত নাগরিক নিজেকে গর্বিত মার্কিন ভাবলেও তিনিও এখন তার মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করছেন। তার মতে, দ্বৈত নাগরিকদের মধ্যে সব সময়ই এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করে; ইতালিতে থাকলে মনে হয় তিনি বড্ড বেশি আমেরিকান, আবার আমেরিকায় গেলে মনে হয় তিনি পুরোপুরি ইতালীয়। তিনি বিশ্বাস করেন, যে দেশে তিনি স্থায়ীভাবে জীবন কাটাতে চান, শুধু সেই দেশের পাসপোর্ট বা ছাড়পত্র নিজের কাছে রাখলে পরিচয়ের এই অহেতুক দ্বন্দ্ব চিরতরে দূর হবে।
সব মিলিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের এই আইনি পথে হাঁটার আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকাটা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। এছাড়াও, আবেদনের আগে অন্তত বিগত পাঁচ বছরের আয়করের যাবতীয় হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হালনাগাদ করতে হয়, যা অভিজ্ঞ আইনজীবী বা হিসাববিদের সাহায্য ছাড়া প্রায় অসম্ভব। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে থাকেন। তাদের মতে, মার্কিন নাগরিকত্ব একজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে যে শক্তিশালী সুবিধা এবং জন্মভূমিতে অবাধে বসবাস ও কাজের যে অধিকার দেয়, তা একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে আর সহজে ফিরে পাওয়া যায় না। নাগরিকত্ব ছাড়ার পর ওই ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে নিজের জন্মভূমিতে নিছক বেড়াতে যাওয়ার জন্যও ভিসার ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অনেক সময় নাও মিলতে পারে। তাই সাময়িক কিছু অর্থ সাশ্রয় বা রাজনৈতিক আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ অনেক সময়ই শুধু অর্থ বা রাজনীতির জন্য নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয়ে নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকেই এমন সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
সূত্র: সিএনএস

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
নতুন দেশে পাড়ি জমানোর পর মাত্র ছয় মাসের মাথাতেই এরিন ক্ল্যাট নিজের জীবনের অন্যতম বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, জন্মভূমি ছেড়ে আসা এই নতুন দেশটিকেই তিনি নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানাতে চান। ২০১৬ সালে যখন তিনি ব্যক্তিগত নানা হতাশা এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন, তখন থেকেই তার মনে অন্য কোথাও থিতু হওয়ার এক সুপ্ত বাসনা কাজ করছিল। নিউজিল্যান্ডে এসে তার মনে হলো, জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ যেন এখানে এসেই পুরোপুরি মিলে গেছে। আর তাই, প্রায় এক দশক পর, চৌত্রিশ বছর বয়সে এসে তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজের জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও আইনি সম্পর্ক ছিন্ন করার এক সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের ফি বা মাশুল প্রায় আশি শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেওয়ার আগেই তিনি দুই হাজার তিনশো পঞ্চাশ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের শপথ পাঠ করেন।
এরিনের এই নতুন জীবনের শুরুটা হয়েছিল বেশ সাধারণভাবেই। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে দুগ্ধ খামারে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় নিউজিল্যান্ডেও তিনি খুব সহজেই একই ধরনের একটি পেশায় যুক্ত হতে পেরেছিলেন। সেই কাজের দক্ষতার সুবাদে পাওয়া বিশেষ এক ধরনের কর্মানুমতি বা ভিসা তাকে দেশটিতে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। ওই একই দুগ্ধ খামারে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত এক ইংরেজ যুবকের সঙ্গে। কাজের ফাঁকে গড়ে ওঠা সেই পরিচয় একসময় প্রণয়ে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একসঙ্গে যখন নিউজিল্যান্ডের স্থায়ী নাগরিকত্ব অর্জন করেন, ঠিক তখনই এরিন চূড়ান্তভাবে অনুভব করেন যে, এবার তার মার্কিন নাগরিকত্ব পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে।
নিজের এই বড় সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণের কথা উল্লেখ করেছেন এরিন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার কখনোই খুব একটা গভীর দেশপ্রেম বা আবেগের টান ছিল না। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দেশটি যে রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শের দিকে অগ্রসর হয়েছে, তা নিয়ে তিনি ভেতরে ভেতরে তীব্র হতাশা বোধ করতেন। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী মার্কিন নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত করের বোঝা—এই দুইয়ে মিলে নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্তটি তার কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক ও স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। শুধু এরিন নন, তার মতো অসংখ্য মার্কিন নাগরিক এখন এই পথে হাঁটছেন। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না, তবে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ প্রতি তিন মাস অন্তর এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে।
বিদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের বিভিন্ন আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মার্কিন রাজস্ব বিভাগের ওই তালিকায় প্রায় চার হাজার আটশো ঊননব্বই জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি ২০২০ সালের পর থেকে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ সংখ্যা, সে বছর প্রায় ছয় হাজার সাতশো পাঁচ জন নাগরিকত্ব ছেড়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চলতি বছর নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের ধারণা, গত বছরের তুলনায় এ বছর এই হার অন্তত পনেরো শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং আগামী কয়েক বছর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় চল্লিশ হাজার মার্কিন নাগরিককে আইনি পরামর্শ দিচ্ছে, যারা ইতোমধ্যেই নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন অথবা এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন।
তবে নাগরিকত্ব ত্যাগের এই আইনি প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। এরিন জানান, এই কাজ শুরু করতে গিয়ে তাকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল এবং সরকারি সহায়তা পাওয়াটা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি প্রথম বৈদ্যুতিক বার্তা বা ই-মেইলের মাধ্যমে সরকারকে তার ইচ্ছার কথা জানান। কিন্তু দীর্ঘ দুই মাস পর অক্টোবর পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তরই পাননি। পরবর্তীতে তিনি নিজে থেকে প্রয়োজনীয় সব ফরম পূরণ করে জমা দেন। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে তিনি অকল্যান্ডের মার্কিন দূতাবাসে সাক্ষাতের সুযোগ পান এবং মার্চ মাসে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ওই সময়টিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল, যা তার এই সিদ্ধান্তকে মানসিকভাবে আরও বেশি রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল। নাগরিকত্ব ত্যাগের পর এরিন এক অনাবিল স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করেন। তিনি জানান, নিজের এই সিদ্ধান্তে তিনি ভীষণ খুশি এবং এর জন্য তার মনে বিন্দুমাত্র কোনো অনুশোচনা নেই; বরং মাঝে মাঝেই তিনি এই ভেবে উল্লাস করেন যে, তিনি আর ওই দেশের কোনো অংশ নন।
অবশ্য সবার ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক ক্ষোভই নাগরিকত্ব ত্যাগের একমাত্র কারণ নয়। আন্তর্জাতিক কর ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনের অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, মার্কিন নাগরিকদের তাদের বিশ্বব্যাপী অর্জিত আয়ের ওপর মৃত্যু পর্যন্ত কর প্রদানের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা অনেককেই তাদের নাগরিকত্ব ছাড়তে বাধ্য করে। বিশেষ করে যারা দুর্ঘটনাবশত বা জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হয়েছেন, কিন্তু জীবনে কখনোই সেখানে বসবাস বা কাজ করেননি, তাদের জন্য এই করের বোঝা এক বিশাল মানসিক ও আর্থিক নিপীড়ন হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি অনেকের ক্ষেত্রে পরিচয়ের সংকটও একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ইতালিতে বসবাসরত এক দ্বৈত নাগরিক নিজেকে গর্বিত মার্কিন ভাবলেও তিনিও এখন তার মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করছেন। তার মতে, দ্বৈত নাগরিকদের মধ্যে সব সময়ই এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করে; ইতালিতে থাকলে মনে হয় তিনি বড্ড বেশি আমেরিকান, আবার আমেরিকায় গেলে মনে হয় তিনি পুরোপুরি ইতালীয়। তিনি বিশ্বাস করেন, যে দেশে তিনি স্থায়ীভাবে জীবন কাটাতে চান, শুধু সেই দেশের পাসপোর্ট বা ছাড়পত্র নিজের কাছে রাখলে পরিচয়ের এই অহেতুক দ্বন্দ্ব চিরতরে দূর হবে।
সব মিলিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের এই আইনি পথে হাঁটার আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকাটা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। এছাড়াও, আবেদনের আগে অন্তত বিগত পাঁচ বছরের আয়করের যাবতীয় হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হালনাগাদ করতে হয়, যা অভিজ্ঞ আইনজীবী বা হিসাববিদের সাহায্য ছাড়া প্রায় অসম্ভব। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে থাকেন। তাদের মতে, মার্কিন নাগরিকত্ব একজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে যে শক্তিশালী সুবিধা এবং জন্মভূমিতে অবাধে বসবাস ও কাজের যে অধিকার দেয়, তা একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে আর সহজে ফিরে পাওয়া যায় না। নাগরিকত্ব ছাড়ার পর ওই ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে নিজের জন্মভূমিতে নিছক বেড়াতে যাওয়ার জন্যও ভিসার ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অনেক সময় নাও মিলতে পারে। তাই সাময়িক কিছু অর্থ সাশ্রয় বা রাজনৈতিক আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ অনেক সময়ই শুধু অর্থ বা রাজনীতির জন্য নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয়ে নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকেই এমন সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
সূত্র: সিএনএস

আপনার মতামত লিখুন