আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মূল্যে এক বড় ধরনের ধস নেমেছে। বিগত ছয় মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে মূল্যবান এই ধাতুর দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে সোনার এই দরপতন লক্ষ্য করা গেছে, যা গত বছরের একুশে নভেম্বরের পর সবচেয়ে কম। এই দরপতনের ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে বা তাৎক্ষণিক ক্রয়ের বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম চার হাজার তেষট্টি দশমিক সাতাশি মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, একই সময়ে ভবিষ্যৎ সরবরাহের বাজার বা ফিউচার মার্কেটে আগামী আগস্ট মাসে ডেলিভারির জন্য মার্কিন সোনার দাম প্রতি আউন্স চার হাজার ছিয়াশি দশমিক পঞ্চাশ ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই মূল্যবান ধাতুর বাজারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, কোনো ধরনের টেকসই শান্তি চুক্তি না হলে ইরানে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে—এমন কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় বুধবার রাতের আঁধারে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে জোরালো হামলা চালানো হয়েছে।
আমেরিকার এই আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলার পর পরই তীব্র ক্ষোভে ও পালটা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই ডলারের চেয়েও বেশি বেড়ে গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেলের এই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে চলমান মুদ্রাস্ফীতির আগুনকে আরও বেশি উসকে দিতে পারে। সাধারণত অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে বা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সোনাকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বড় বড় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার সোনার মূল্যের ওপর এক ধরনের প্রচণ্ড মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ সুদের হার যখন অনেক বেশি থাকে, তখন সুদবিহীন এই মূল্যবান ধাতুটি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে ব্যাংকিং বন্ড বা অন্যান্য সুদি খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সোনার দামে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক উপাত্ত ও তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের কারণে জ্বালানি পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সদ্য সমাপ্ত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ও রেকর্ড হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতি-নির্ধারকদের জন্য আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত সুদের হার বর্তমানের মতো উচ্চ পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে আরও জোরালো যুক্তি তৈরি হয়েছে। এদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী মুদ্রানীতি ও সুদের হারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে একদম স্পষ্ট ধারণা পেতে বিশ্বজুড়ে থাকা বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এখন মে মাসের মার্কিন উৎপাদক মূল্যসূচক প্রতিবেদনের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন, যা বৃহস্পতিবার দিনের শেষভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পাওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে সোনার জোগানের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক খবর দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্ট। দেশটির খনি মহাপরিচালক সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, তাদের দেশের বিদ্যমান সোনার খনিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কারণে দেশটির সামগ্রিক সোনা উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় অনেক বাড়বে। তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ঊনষাট দশমিক তেত্রিশ টন সোনা উৎপাদনের রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৬ সালে তা প্রায় বাষট্টি মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারে সোনার এই বাড়তি জোগানও দাম কমায় ভূমিকা রাখছে।
সোনার বাজারে এই মন্দাভাবের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও এক ধরনের মিশ্র বা ওঠানামার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে রুপার দাম প্রায় শূন্য দশমিক নয় শতাংশ কমে গিয়ে প্রতি আউন্স তেষট্টি দশমিক পনেরো ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে আরেক মূল্যবান ধাতু প্লাটিনামের দামও শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ হ্রাস পেয়ে এক হাজার ছশ পঞ্চান্ন দশমিক ছয় ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এই মন্দার বাজারেও ব্যতিক্রমী চিত্র দেখিয়েছে প্যালাডিয়াম; এই ধাতুর দাম এক ধাক্কায় প্রায় এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স এক হাজার দুইশত পঁচিশ দশমিক পঁচিশ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মূল্যে এক বড় ধরনের ধস নেমেছে। বিগত ছয় মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে মূল্যবান এই ধাতুর দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে সোনার এই দরপতন লক্ষ্য করা গেছে, যা গত বছরের একুশে নভেম্বরের পর সবচেয়ে কম। এই দরপতনের ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে বা তাৎক্ষণিক ক্রয়ের বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম চার হাজার তেষট্টি দশমিক সাতাশি মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, একই সময়ে ভবিষ্যৎ সরবরাহের বাজার বা ফিউচার মার্কেটে আগামী আগস্ট মাসে ডেলিভারির জন্য মার্কিন সোনার দাম প্রতি আউন্স চার হাজার ছিয়াশি দশমিক পঞ্চাশ ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই মূল্যবান ধাতুর বাজারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, কোনো ধরনের টেকসই শান্তি চুক্তি না হলে ইরানে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে—এমন কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় বুধবার রাতের আঁধারে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে জোরালো হামলা চালানো হয়েছে।
আমেরিকার এই আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলার পর পরই তীব্র ক্ষোভে ও পালটা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই ডলারের চেয়েও বেশি বেড়ে গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেলের এই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে চলমান মুদ্রাস্ফীতির আগুনকে আরও বেশি উসকে দিতে পারে। সাধারণত অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে বা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সোনাকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বড় বড় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার সোনার মূল্যের ওপর এক ধরনের প্রচণ্ড মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ সুদের হার যখন অনেক বেশি থাকে, তখন সুদবিহীন এই মূল্যবান ধাতুটি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে ব্যাংকিং বন্ড বা অন্যান্য সুদি খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সোনার দামে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক উপাত্ত ও তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের কারণে জ্বালানি পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সদ্য সমাপ্ত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ও রেকর্ড হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতি-নির্ধারকদের জন্য আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত সুদের হার বর্তমানের মতো উচ্চ পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে আরও জোরালো যুক্তি তৈরি হয়েছে। এদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী মুদ্রানীতি ও সুদের হারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে একদম স্পষ্ট ধারণা পেতে বিশ্বজুড়ে থাকা বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এখন মে মাসের মার্কিন উৎপাদক মূল্যসূচক প্রতিবেদনের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন, যা বৃহস্পতিবার দিনের শেষভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পাওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে সোনার জোগানের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক খবর দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্ট। দেশটির খনি মহাপরিচালক সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, তাদের দেশের বিদ্যমান সোনার খনিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কারণে দেশটির সামগ্রিক সোনা উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় অনেক বাড়বে। তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ঊনষাট দশমিক তেত্রিশ টন সোনা উৎপাদনের রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৬ সালে তা প্রায় বাষট্টি মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারে সোনার এই বাড়তি জোগানও দাম কমায় ভূমিকা রাখছে।
সোনার বাজারে এই মন্দাভাবের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও এক ধরনের মিশ্র বা ওঠানামার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে রুপার দাম প্রায় শূন্য দশমিক নয় শতাংশ কমে গিয়ে প্রতি আউন্স তেষট্টি দশমিক পনেরো ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে আরেক মূল্যবান ধাতু প্লাটিনামের দামও শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ হ্রাস পেয়ে এক হাজার ছশ পঞ্চান্ন দশমিক ছয় ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এই মন্দার বাজারেও ব্যতিক্রমী চিত্র দেখিয়েছে প্যালাডিয়াম; এই ধাতুর দাম এক ধাক্কায় প্রায় এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স এক হাজার দুইশত পঁচিশ দশমিক পঁচিশ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।

আপনার মতামত লিখুন