দিকপাল

ইরানের হামলায় ইসরাইলে বিস্ময় বাড়ছে কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ | ০৬:২৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানের হামলায় ইসরাইলে বিস্ময় বাড়ছে কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সাম্প্রতিক প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত ও নজিরবিহীন উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নীতি-নির্ধারক এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে এক তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও গভীর মতভেদ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা করে তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করছেন। অপরদিকে, অন্য অংশটি মার্কিন প্রশাসনকে চটিয়ে নতুন করে আরেকটি বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এই হঠকারী সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের অগ্রিম সতর্ক করে দিচ্ছেন।


বিশেষ করে, গত রোববার রাতের আকস্মিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তেল আবিবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একপ্রকার স্তম্ভিত ও অবাক করেছে। ইসরাইলের অন্যতম শীর্ষ গণমাধ্যম চ্যানেল থার্টিন নিউজের প্রবীণ সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এতকাল এক ধরনের আত্মতুষ্টি ছিল। তাদের ধারণা ছিল যে, সাম্প্রতিক ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরান অন্তত সরাসরি ইসরাইলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট ছোড়ার মতো ‘সাহস’ কোনোভাবেই দেখাবে না। তবে এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে তেহরান। এর আগে রোববার সকালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি বেসামরিক ভবনে ইসরাইলি বিমান বাহিনী এক আকস্মিক হামলা চালায়, যা তৎকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল ইরান। সাংবাদিক বেন ডেভিডের মতে, ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী সেটি ‘নামমাত্র প্রতীকী’ হামলা হলেও, তাতে অন্তত দুজন লেবানিজ নাগরিক নিহত হন এবং মূলত এই ঘটনার জের ধরেই রাতে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে নতুন করে এই ভয়াবহ উত্তেজনার আগুন ছড়িয়ে পড়ে।


বর্তমানে ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলোতে ইরানি হামলা এবং তার জবাবে নিজেদের সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া বিবৃতির ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তিনি নেতানিয়াহুকে ইরানে আর কোনো নতুন হামলা না করার জন্য সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন। এই মার্কিন চাপের কারণে অনেক ইসরাইলি সমালোচক নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলছেন যে, নেতানিয়াহু দেশের জাতীয় নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণভাবে বিদেশি নেতাদের মর্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। মা’আরিভ পত্রিকার অত্যন্ত প্রবীণ ও প্রভাবশালী ইসরাইলি সাংবাদিক বেন ক্যাসপিট এই নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাকে একপ্রকার ‘বেসরকারীকরণ’ বা অন্য দেশের হাতে বন্ধক রেখে ট্রাম্পের ইচ্ছার ওপর সঁপে দেওয়া হয়েছে এবং দেশের নিজস্ব সামরিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এখন তেল আবিবকে ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেত বা অনুমোদনের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার এই বক্তব্যের সুর মিলিয়ে সহকর্মী আভি আশকেনাজি সতর্ক করে বলেন যে, ইসরাইলের উচিত হবে না মার্কিন নির্দেশ মেনে নিয়ে মুখ বুজে চুপচাপ বসে থাকা। এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের অস্তিত্বকেই এক চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।


অবশ্য ইরানের রকেট হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোনো ধরনের মার্কিন তোয়াক্কা না করে তেহরানসহ দেশটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরাইলি বিমান বাহিনী। সোমবারও যখন দুই পক্ষের মধ্যে সীমান্তজুড়ে ও আকাশপথে তীব্র গোলাগুলি অব্যাহত ছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় প্রকাশ্যে উভয় পক্ষকে ‘অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার’ এবং যুদ্ধ থেকে সরে আসার চূড়ান্ত আহ্বান জানান। তবে ট্রাম্পের এই প্রভাবের সমালোচনার পাশাপাশি সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এই পুরো ঘটনাকে চলতি বছরের শুরুতে ইরানের পরমাণু ও সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে চালানো যৌথ ইসরাইল-মার্কিন অভিযানের এক শোচনীয় ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইসরাইল-ইরান বিষয়ক বিশিষ্ট কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, এই সর্বশেষ উত্তেজনা প্রমাণ করে যে, ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানটি আসলে একটি শোচনীয় কৌশলগত বিপর্যয় ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ইসরাইল এখন একটি ভাগ্যনির্ধারক ও ঐতিহাসিক দ্বিধার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তারা কি পাল্টা বড় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে এক চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে, নাকি হামলা থেকে বিরত থেকে লেবাননের মাটিতে নিজেদের সামরিক আধিপত্য ও হিজবুল্লাহর ওপর হামলা সীমিত করার এক অপমানজনক ঝুঁকি মেনে নেবে? তিনি আরও যোগ করেন, পূর্ববর্তী যৌথ যুদ্ধ ইরান সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের স্বাধীনভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। এর বিপরীতে ইরানের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে এবং স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এখন সামরিক লড়াইয়ের চেয়ে কূটনৈতিক উপায়ে এই গভীর সংকট সমাধানের ইচ্ছা তীব্র হয়ে উঠছে।


একই সুর শোনা গেছে হারেৎস পত্রিকার প্রখ্যাত সামরিক বিষয়ক বিশ্লেষক আমোস হারেলের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, গত এপ্রিলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দিতে ক্রমাগত যুদ্ধ পুনরারম্ভের জন্য উসকানিমূলক কাজ করছিলেন। রোববারের এই তীব্র উত্তেজনা আসলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এবং হোয়াইট হাউসের ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বাড়তে থাকা গভীর মানসিক দূরত্বের এক স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এই যুদ্ধাবস্থার কারণে ইসরাইলি অভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে একাধিক জরুরি অবস্থা জারি করেছে। সব ধরনের স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সব ধরনের সামাজিক ও গণজমায়েত সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি হাসপাতালগুলো অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কাজ করছে এবং সামরিক কমাণ্ডাররা সুরক্ষার স্বার্থে বেন গুরিওন বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও আগমন সাময়িকভাবে সীমিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।


প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক এই চরম উত্তেজনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, তার মন্ত্রিসভার অতি-ডানপন্থি মন্ত্রীরা ইরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার উন্মত্ত দাবি তুলেছেন। চ্যানেল টুয়েলভ নিউজের সিনিয়র সাংবাদিক অমিত সেগালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সোমবারের বিশেষ ক্যাবিনেট বৈঠকে এই দাবি তুলতে পারেন যে, ইসরাইলে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের কঠোর প্রতিশোধ হিসেবে দক্ষিণ বৈরুতের শহরতলির অসংখ্য বহুতল ভবন যেন বিমান হামলা চালিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে ইসরাইলের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির অত্যন্ত উগ্র ভাষায় হুংকার দিয়ে বলেছেন যে, এই অপরাধের জন্য তেহরানকে অবশ্যই আগুনের শিখায় জ্বলতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহরও নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার জোর তাগিদ দিয়ে বলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কেবল শক্তি ও ক্ষমতার ভাষাই বোঝে, কোনো শান্তি আলোচনা নয়।


আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরানে এই মারণ হামলার পক্ষে শুধু সরকারি দলই নয়, বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মতো প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতাদের কাছ থেকেও ব্যাপক সমর্থন এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে বেনেট লিখেছেন যে, এটিই মূলত ইসরাইলের জন্য সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আসল মুহূর্ত। ইসরাইল কি আসলেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, যে মার্কিন সাহায্য ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম? ইসরাইলকে অবশ্যই এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ শক্তি ও কার্যকারিতার সাথে শত্রুর ওপর আঘাত করতে হবে। ডানপন্থি বিরোধী দল ইসরাইল বেইতেনু পার্টির প্রধান অ্যাভিগডোর লিবারম্যানও একই সুরে সুর মিলিয়ে বলেন যে, আমাদের আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে মারাত্মক আঘাত হানতে হবে। সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্তজও মন্তব্য করেছেন যে, পূর্ববর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননে হঠাৎ যুদ্ধ বন্ধ করা ছিল তেল আবিবের এক ঐতিহাসিক ভুল এবং এই বড় কৌশলগত ভুলটি এখন ইরানের ওপর জোরালো ও ধ্বংসাত্মক জবাবের মাধ্যমেই সংশোধন করতে হবে। ইতিমধ্যেই ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নতুন করে হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে একত্রিত করছে এবং সামরিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আগামী বেশ কয়েকদিন ব্যাপী একটি দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ লড়াইয়ের মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।


তবে ইসরাইলের সব বিরোধী নেতা এই নতুন করে যুদ্ধ ফিরে আসাকে মোটেও স্বাগত জানাননি, বরং দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, আমাদের শত্রুরা বাইরে থেকে তা-ই দেখছে যা দেশের ভেতরের সবাই দেখতে পাচ্ছে—প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন অত্যন্ত দুর্বল ও দিকভ্রান্ত। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ইসরাইলকে আরেকটি অন্তহীন আঞ্চলিক যুদ্ধের আগুনে জড়ানোর কোনো নৈতিক ম্যান্ডেট বা অধিকার এই বর্তমান সরকারের নেই। গোলান অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু মূলত দেশে আগাম নির্বাচন এড়াতে এবং নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন লাগিয়ে লেবানন ও ইরানে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন। একই রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ বলেন, নেতানিয়াহু ইসরাইলের সাধারণ নাগরিক এবং রাষ্ট্রকে সামগ্রিক নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এই যুদ্ধবাজ সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রতিটি ইসরাইলি পুরুষ ও নারীর জীবনকে চরম বিপন্ন ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।


সূত্র: মিডল ইস্ট আই

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ইরানের হামলায় ইসরাইলে বিস্ময় বাড়ছে কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সাম্প্রতিক প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত ও নজিরবিহীন উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নীতি-নির্ধারক এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে এক তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও গভীর মতভেদ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা করে তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করছেন। অপরদিকে, অন্য অংশটি মার্কিন প্রশাসনকে চটিয়ে নতুন করে আরেকটি বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এই হঠকারী সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের অগ্রিম সতর্ক করে দিচ্ছেন।


বিশেষ করে, গত রোববার রাতের আকস্মিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তেল আবিবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একপ্রকার স্তম্ভিত ও অবাক করেছে। ইসরাইলের অন্যতম শীর্ষ গণমাধ্যম চ্যানেল থার্টিন নিউজের প্রবীণ সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এতকাল এক ধরনের আত্মতুষ্টি ছিল। তাদের ধারণা ছিল যে, সাম্প্রতিক ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরান অন্তত সরাসরি ইসরাইলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট ছোড়ার মতো ‘সাহস’ কোনোভাবেই দেখাবে না। তবে এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে তেহরান। এর আগে রোববার সকালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি বেসামরিক ভবনে ইসরাইলি বিমান বাহিনী এক আকস্মিক হামলা চালায়, যা তৎকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল ইরান। সাংবাদিক বেন ডেভিডের মতে, ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী সেটি ‘নামমাত্র প্রতীকী’ হামলা হলেও, তাতে অন্তত দুজন লেবানিজ নাগরিক নিহত হন এবং মূলত এই ঘটনার জের ধরেই রাতে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে নতুন করে এই ভয়াবহ উত্তেজনার আগুন ছড়িয়ে পড়ে।


বর্তমানে ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলোতে ইরানি হামলা এবং তার জবাবে নিজেদের সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া বিবৃতির ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তিনি নেতানিয়াহুকে ইরানে আর কোনো নতুন হামলা না করার জন্য সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন। এই মার্কিন চাপের কারণে অনেক ইসরাইলি সমালোচক নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলছেন যে, নেতানিয়াহু দেশের জাতীয় নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণভাবে বিদেশি নেতাদের মর্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। মা’আরিভ পত্রিকার অত্যন্ত প্রবীণ ও প্রভাবশালী ইসরাইলি সাংবাদিক বেন ক্যাসপিট এই নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাকে একপ্রকার ‘বেসরকারীকরণ’ বা অন্য দেশের হাতে বন্ধক রেখে ট্রাম্পের ইচ্ছার ওপর সঁপে দেওয়া হয়েছে এবং দেশের নিজস্ব সামরিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এখন তেল আবিবকে ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেত বা অনুমোদনের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার এই বক্তব্যের সুর মিলিয়ে সহকর্মী আভি আশকেনাজি সতর্ক করে বলেন যে, ইসরাইলের উচিত হবে না মার্কিন নির্দেশ মেনে নিয়ে মুখ বুজে চুপচাপ বসে থাকা। এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের অস্তিত্বকেই এক চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।


অবশ্য ইরানের রকেট হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোনো ধরনের মার্কিন তোয়াক্কা না করে তেহরানসহ দেশটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরাইলি বিমান বাহিনী। সোমবারও যখন দুই পক্ষের মধ্যে সীমান্তজুড়ে ও আকাশপথে তীব্র গোলাগুলি অব্যাহত ছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় প্রকাশ্যে উভয় পক্ষকে ‘অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার’ এবং যুদ্ধ থেকে সরে আসার চূড়ান্ত আহ্বান জানান। তবে ট্রাম্পের এই প্রভাবের সমালোচনার পাশাপাশি সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এই পুরো ঘটনাকে চলতি বছরের শুরুতে ইরানের পরমাণু ও সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে চালানো যৌথ ইসরাইল-মার্কিন অভিযানের এক শোচনীয় ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইসরাইল-ইরান বিষয়ক বিশিষ্ট কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, এই সর্বশেষ উত্তেজনা প্রমাণ করে যে, ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানটি আসলে একটি শোচনীয় কৌশলগত বিপর্যয় ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ইসরাইল এখন একটি ভাগ্যনির্ধারক ও ঐতিহাসিক দ্বিধার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তারা কি পাল্টা বড় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে এক চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে, নাকি হামলা থেকে বিরত থেকে লেবাননের মাটিতে নিজেদের সামরিক আধিপত্য ও হিজবুল্লাহর ওপর হামলা সীমিত করার এক অপমানজনক ঝুঁকি মেনে নেবে? তিনি আরও যোগ করেন, পূর্ববর্তী যৌথ যুদ্ধ ইরান সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের স্বাধীনভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। এর বিপরীতে ইরানের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে এবং স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এখন সামরিক লড়াইয়ের চেয়ে কূটনৈতিক উপায়ে এই গভীর সংকট সমাধানের ইচ্ছা তীব্র হয়ে উঠছে।


একই সুর শোনা গেছে হারেৎস পত্রিকার প্রখ্যাত সামরিক বিষয়ক বিশ্লেষক আমোস হারেলের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, গত এপ্রিলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দিতে ক্রমাগত যুদ্ধ পুনরারম্ভের জন্য উসকানিমূলক কাজ করছিলেন। রোববারের এই তীব্র উত্তেজনা আসলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এবং হোয়াইট হাউসের ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বাড়তে থাকা গভীর মানসিক দূরত্বের এক স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এই যুদ্ধাবস্থার কারণে ইসরাইলি অভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে একাধিক জরুরি অবস্থা জারি করেছে। সব ধরনের স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সব ধরনের সামাজিক ও গণজমায়েত সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি হাসপাতালগুলো অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কাজ করছে এবং সামরিক কমাণ্ডাররা সুরক্ষার স্বার্থে বেন গুরিওন বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও আগমন সাময়িকভাবে সীমিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।


প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক এই চরম উত্তেজনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, তার মন্ত্রিসভার অতি-ডানপন্থি মন্ত্রীরা ইরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার উন্মত্ত দাবি তুলেছেন। চ্যানেল টুয়েলভ নিউজের সিনিয়র সাংবাদিক অমিত সেগালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সোমবারের বিশেষ ক্যাবিনেট বৈঠকে এই দাবি তুলতে পারেন যে, ইসরাইলে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের কঠোর প্রতিশোধ হিসেবে দক্ষিণ বৈরুতের শহরতলির অসংখ্য বহুতল ভবন যেন বিমান হামলা চালিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে ইসরাইলের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির অত্যন্ত উগ্র ভাষায় হুংকার দিয়ে বলেছেন যে, এই অপরাধের জন্য তেহরানকে অবশ্যই আগুনের শিখায় জ্বলতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহরও নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার জোর তাগিদ দিয়ে বলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কেবল শক্তি ও ক্ষমতার ভাষাই বোঝে, কোনো শান্তি আলোচনা নয়।


আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরানে এই মারণ হামলার পক্ষে শুধু সরকারি দলই নয়, বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মতো প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতাদের কাছ থেকেও ব্যাপক সমর্থন এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে বেনেট লিখেছেন যে, এটিই মূলত ইসরাইলের জন্য সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আসল মুহূর্ত। ইসরাইল কি আসলেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, যে মার্কিন সাহায্য ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম? ইসরাইলকে অবশ্যই এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ শক্তি ও কার্যকারিতার সাথে শত্রুর ওপর আঘাত করতে হবে। ডানপন্থি বিরোধী দল ইসরাইল বেইতেনু পার্টির প্রধান অ্যাভিগডোর লিবারম্যানও একই সুরে সুর মিলিয়ে বলেন যে, আমাদের আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে মারাত্মক আঘাত হানতে হবে। সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্তজও মন্তব্য করেছেন যে, পূর্ববর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননে হঠাৎ যুদ্ধ বন্ধ করা ছিল তেল আবিবের এক ঐতিহাসিক ভুল এবং এই বড় কৌশলগত ভুলটি এখন ইরানের ওপর জোরালো ও ধ্বংসাত্মক জবাবের মাধ্যমেই সংশোধন করতে হবে। ইতিমধ্যেই ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নতুন করে হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে একত্রিত করছে এবং সামরিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আগামী বেশ কয়েকদিন ব্যাপী একটি দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ লড়াইয়ের মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।


তবে ইসরাইলের সব বিরোধী নেতা এই নতুন করে যুদ্ধ ফিরে আসাকে মোটেও স্বাগত জানাননি, বরং দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, আমাদের শত্রুরা বাইরে থেকে তা-ই দেখছে যা দেশের ভেতরের সবাই দেখতে পাচ্ছে—প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন অত্যন্ত দুর্বল ও দিকভ্রান্ত। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ইসরাইলকে আরেকটি অন্তহীন আঞ্চলিক যুদ্ধের আগুনে জড়ানোর কোনো নৈতিক ম্যান্ডেট বা অধিকার এই বর্তমান সরকারের নেই। গোলান অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু মূলত দেশে আগাম নির্বাচন এড়াতে এবং নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন লাগিয়ে লেবানন ও ইরানে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন। একই রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ বলেন, নেতানিয়াহু ইসরাইলের সাধারণ নাগরিক এবং রাষ্ট্রকে সামগ্রিক নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এই যুদ্ধবাজ সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রতিটি ইসরাইলি পুরুষ ও নারীর জীবনকে চরম বিপন্ন ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।


সূত্র: মিডল ইস্ট আই


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল