মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে এবার ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সামরিক কাঠামোতে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির গত রাতে অনুষ্ঠিত দেশের উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বর্তমানে ‘ভেতর থেকে একদম ভেঙে পড়ার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে’। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বিভিন্ন ফ্রন্টের সামরিক অভিযানের প্রচণ্ড চাপ এবং সেই তুলনায় আশঙ্কাজনক সৈন্য সংকটই সেনাবাহিনীকে এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে তিনি মন্ত্রিসভাকে অবহিত করেন।
ইসরাইলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১৩ নিউজ’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সেনাপ্রধান এয়াল জামির বৈঠকে উপস্থিত সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছেন, ‘আমি এই মুহূর্তে আপনাদের সামনে ১০টি লাল পতাকা তথা সর্বোচ্চ সতর্কতার সংকেত তুলছি। ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এই মুহূর্তেই একটি কঠোর ও সর্বজনীন সেনা নিয়োগ আইন, রিজার্ভ ডিউটি আইন এবং বাধ্যতামূলক সেনা সেবার মেয়াদ বৃদ্ধি করার জন্য বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। যদি তা অনতিবিলম্বে করা না হয়, তবে অচিরেই দেশের মূল সেনাবাহিনী তার নিয়মিত সামরিক কাজগুলো পরিচালনা করার সক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে এবং দেশের সামগ্রিক রিজার্ভ ব্যবস্থাও আর কোনোভাবেই টিকে থাকবে না।’
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন চরম ও হতাশাজনক সতর্কবার্তা এবারই প্রথম নয়, বরং এর আগেও তিনি একাধিকবার নীতিনির্ধারকদের এই আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে তিনি সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতেও তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, তীব্র সৈন্য সংকট খুব শিগগিরই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি ও রণক্ষেত্রের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু করে দিতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ও সর্বাত্মক হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ বারবার দেশের আইনপ্রণেতা ও সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খতিয়ান দিয়ে জানিয়েছে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের তীব্র চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সামরিক চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে তাদের মূল বাহিনীতে অন্তত ১২ হাজার সক্রিয় সৈন্যের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শূন্যতা পূরণ করা না গেলে সামনের দিনগুলোতে সামরিক ফ্রন্টগুলো ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুন মাসে ইসরাইলের সর্বোচ্চ আদালত একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। উচ্চ আদালতের সেই রায়ে পরিষ্কারভাবে বলা হয়, দেশটির হারেদি ইয়েশিভা তথা অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সামরিক সেবা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতো, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। আদালতের এই আদেশের পর থেকেই দেশের ভেতরে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইসরাইল সরকারের জোটে থাকা অতি-রক্ষণশীল ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব ধর্মীয় সম্প্রদায়কে যেকোনো মূল্যে সেনাবাহিনীর বাইরে রাখার জন্য একটি বিশেষ সুরক্ষামূলক আইন পাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আসছে। বর্তমানে দেশটিতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৮০ হাজার হারেদি পুরুষ সম্পূর্ণ সশরীরে সামরিক সেবার জন্য উপযুক্ত ও যোগ্য বলে মনে করা হলেও, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তারা এখনো মূল সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি, যা দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও ব্যাপক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন, নামাজের সময়সূচী কিংবা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের মতো নানামুখী সামাজিক বিষয়ের ভিড়ে ইসরাইলের এই অভ্যন্তরীণ সামরিক ফাটল এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মূল উৎস: টাইমস অব ইসরাইল।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে এবার ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সামরিক কাঠামোতে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির গত রাতে অনুষ্ঠিত দেশের উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বর্তমানে ‘ভেতর থেকে একদম ভেঙে পড়ার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে’। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বিভিন্ন ফ্রন্টের সামরিক অভিযানের প্রচণ্ড চাপ এবং সেই তুলনায় আশঙ্কাজনক সৈন্য সংকটই সেনাবাহিনীকে এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে তিনি মন্ত্রিসভাকে অবহিত করেন।
ইসরাইলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১৩ নিউজ’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সেনাপ্রধান এয়াল জামির বৈঠকে উপস্থিত সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছেন, ‘আমি এই মুহূর্তে আপনাদের সামনে ১০টি লাল পতাকা তথা সর্বোচ্চ সতর্কতার সংকেত তুলছি। ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এই মুহূর্তেই একটি কঠোর ও সর্বজনীন সেনা নিয়োগ আইন, রিজার্ভ ডিউটি আইন এবং বাধ্যতামূলক সেনা সেবার মেয়াদ বৃদ্ধি করার জন্য বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। যদি তা অনতিবিলম্বে করা না হয়, তবে অচিরেই দেশের মূল সেনাবাহিনী তার নিয়মিত সামরিক কাজগুলো পরিচালনা করার সক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে এবং দেশের সামগ্রিক রিজার্ভ ব্যবস্থাও আর কোনোভাবেই টিকে থাকবে না।’
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন চরম ও হতাশাজনক সতর্কবার্তা এবারই প্রথম নয়, বরং এর আগেও তিনি একাধিকবার নীতিনির্ধারকদের এই আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে তিনি সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতেও তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, তীব্র সৈন্য সংকট খুব শিগগিরই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি ও রণক্ষেত্রের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু করে দিতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ও সর্বাত্মক হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ বারবার দেশের আইনপ্রণেতা ও সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খতিয়ান দিয়ে জানিয়েছে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের তীব্র চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সামরিক চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে তাদের মূল বাহিনীতে অন্তত ১২ হাজার সক্রিয় সৈন্যের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শূন্যতা পূরণ করা না গেলে সামনের দিনগুলোতে সামরিক ফ্রন্টগুলো ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুন মাসে ইসরাইলের সর্বোচ্চ আদালত একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। উচ্চ আদালতের সেই রায়ে পরিষ্কারভাবে বলা হয়, দেশটির হারেদি ইয়েশিভা তথা অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সামরিক সেবা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতো, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। আদালতের এই আদেশের পর থেকেই দেশের ভেতরে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইসরাইল সরকারের জোটে থাকা অতি-রক্ষণশীল ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব ধর্মীয় সম্প্রদায়কে যেকোনো মূল্যে সেনাবাহিনীর বাইরে রাখার জন্য একটি বিশেষ সুরক্ষামূলক আইন পাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আসছে। বর্তমানে দেশটিতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৮০ হাজার হারেদি পুরুষ সম্পূর্ণ সশরীরে সামরিক সেবার জন্য উপযুক্ত ও যোগ্য বলে মনে করা হলেও, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তারা এখনো মূল সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি, যা দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও ব্যাপক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন, নামাজের সময়সূচী কিংবা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের মতো নানামুখী সামাজিক বিষয়ের ভিড়ে ইসরাইলের এই অভ্যন্তরীণ সামরিক ফাটল এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মূল উৎস: টাইমস অব ইসরাইল।

আপনার মতামত লিখুন