চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং আগামী সোমবার দুই দিনের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর বেইজিংয়ের কোনো শীর্ষ নেতার পিয়ংইয়ং সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম জং উন বিশ্বরাজনীতিতে বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে একটি শক্তিশালী কৌশলগত সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং নিজেদের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক একাকীত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে অনেকটাই মুক্ত করতে পেরেছে। এর আগে যখন শি জিনপিং উত্তর কোরিয়া সফরে গিয়েছিলেন, তখনকার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত আলোচনা আকস্মিক ব্যর্থ হওয়ায় বেশ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপে ছিলেন কিম।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দিনব্যাপী এই আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনের আড়ালে শি জিনপিং মূলত পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর বিরুদ্ধে দুই সমাজতান্ত্রিক মিত্র দেশের একটি অবিচল ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বিশ্বমঞ্চে প্রদর্শন করতে চান। তবে একই সঙ্গে বেইজিংয়ের আরেকটি অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো মূল্যে তাদের এই প্রতিবেশী দেশের ওপর নিজেদের একক প্রভাব বজায় রাখা, যে দেশিটি সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের চেয়ে মস্কোর দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছে। অন্য দিকে কিম জং উনও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের কাছে নিজেকে কেবল একজন অনুগত বা ছোট অংশীদার হিসেবে দেখতে একেবারেই রাজি নন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে তার তৈরি হওয়া নতুন এই ঘনিষ্ঠতাকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বেইজিংয়ের কাছ থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা ও ছাড় আদায়ের চেষ্টা চালাবেন। উত্তর কোরিয়া যদি তার এই দুই বিশাল প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে পুরোপুরি সফল হয়, তবে কিম তার বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীন ও উগ্র বোধ করতে পারেন, যা অদূর ভবিষ্যতে সমগ্র এশীয় অঞ্চলকে মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে লিপ্ত থাকার কারণে ওয়াশিংটনের সামরিক ও আর্থিক রসদ দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে, যা এশিয়ায় থাকা মার্কিন মিত্রদের মধ্যে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বিরল সফরের মাধ্যমে শি জিনপিং মূলত বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট এই বার্তা দিতে চান যে, উত্তর কোরিয়া এখনো সব দিক থেকে চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং বেইজিংকে এড়িয়ে এই অঞ্চলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এই পুরো রণকৌশলটি বিশ্বমঞ্চে চীনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টারই একটি অংশ। বেইজিং দেখাতে চায়, ওয়াশিংটন যখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ কিংবা নিজস্ব মিত্র ও শত্রু সবার ওপর একতরফা শুল্ক আরোপ করে বিশ্বজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, ঠিক সেই সময়ে চীন বিশ্বে একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। অতি সম্প্রতি বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকেও চীনের এই সুদূরপ্রসারী কৌশলের প্রতিফলন দেখা গেছে। মার্কিন বাইডেন প্রশাসনের সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এবং এশিয়া গ্রুপের প্রধান কার্ট ক্যাম্পবেল এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, শি জিনপিং আন্তর্জাতিক মহলে এটি প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার গণতান্ত্রিক অংশীদারদের সঙ্গে যেমন ভঙ্গুর সম্পর্কের মধ্যে আছেন, শি তার কর্তৃত্ববাদী জোটের সদস্যদের সঙ্গে তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও ভালো অবস্থানে আছেন।
তবে শি জিনপিংয়ের এই ঝটিকা সফরটি কিম জং উনের মন জয় করার প্রয়োজনীয়তাকেও সমানভাবে ফুটিয়ে তোলে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে মস্কোর সাথে স্নায়ুযুদ্ধ আমলের পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলত চীনের ওপর তাদের একক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ সেনা ও গোলাবারুদ সরবরাহের বিনিময়ে মস্কো উত্তর কোরিয়াকে তাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল, খাদ্যশস্য এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এই বিষয়টি চীনের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বেইজিং সবসময়ই উত্তর কোরিয়ার ওপর তাদের একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রেখে নিজেদের সীমানায় ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়। এশিয়া সোসাইটির সিউলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিদ জন ডিলুরি মনে করেন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্ক যেভাবে গভীর হচ্ছে তা নিয়ে চীনারা নিশ্চিতভাবেই ভেতরে ভেতরে বেশ চিন্তিত। এই সফর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে এবং এই অঞ্চলের ক্ষমতার সমীকরণে চীনকে আবারও চালকের আসনে ফিরিয়ে আনতে শি জিনপিংকে বড় সাহায্য করবে।
অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও কিম জং উনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে ২০১৯ সালে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে ট্রাম্প পারমাণবিক আলোচনা থেকে হঠাৎ সরে আসায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সব আশা ভেস্তে গিয়েছিল। এর পরের বছর বিশ্বজুড়ে মহামারি শুরু হলে সংক্রমণ ঠেকাতে কিম দেশের সব সীমান্ত দীর্ঘদিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন, যার ফলে লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চীনের সাথেও তাদের সব ধরনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশটিতে চরম খাদ্যসংকট দেখা দেয়। তবে মহামারির প্রকোপ কমে আসার পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক সংকটের মোক্ষম সুযোগটি লুফে নিয়ে মস্কোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করে কিম নিজের ভাগ্য ও দেশের অর্থনীতি রাতারাতি বদলে ফেলেন। রাশিয়ার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তেল ও সামরিক সহায়তা আসে পিয়ংইয়ংয়ে। যদিও শি জিনপিং গত মার্চ মাসে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে পুনরায় নিয়মিত ট্রেন ও বিমান যোগাযোগ চালু করে কিমকে পরোক্ষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে চীনই এখনো তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক, তবুও কিম চীনের কাছ থেকে আরও বড় অঙ্কের সুবিধা চান। বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা করের বাইরে থাকা পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করতে কিম দেশের মনোরম সমুদ্র সৈকত ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিশাল সব বিলাসবহুল রিসোর্ট তৈরি করছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো বিপুল সংখ্যক চীনা পর্যটকদের নিজেদের দেশে আকৃষ্ট করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা। সিউলের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক লি বিয়ং-চুল বলেন, উত্তর কোরিয়া এখন আর কেবল একটি মাত্র পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরশীল কোনো অসহায় বা দুর্বল দেশ নয়। দীর্ঘদিনের পরম বন্ধু চীনের পাশাপাশি তারা এখন রাশিয়াকে নিজেদের নতুন কৌশলগত শক্তিশালী ডানা হিসেবে পাশে পেয়েছে।
এই হাইভোল্টেজ সম্মেলনে শি জিনপিং নতুন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরারম্ভ করার জন্য কিমকে কোনো বিশেষ চাপ দেবেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন রয়েছে। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও কিমের সাথে ব্যক্তিগতভাবে শীর্ষ বৈঠকে বসার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কূটনৈতিক পাড়ায় এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে, ট্রাম্প হয়তো পিয়ংইয়ংয়ের জন্য জিনপিংয়ের কাছে কোনো বিশেষ বা গোপন বার্তা পাঠিয়েছেন। তবে কিম ইতিমধ্যেই বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার টেবিলে রেখে বা এটি বন্ধ করার শর্তে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপে জড়াবেন না। কিম তার এই পারমাণবিক সক্ষমতাকে চীন ও রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানোর একমাত্র উপায় এবং সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার প্রধান ঢাল হিসেবে বিবেচনা করেন। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার অজুহাতে সেখানে যেভাবে সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়েছে, তা দেখার পর কিমের এই আত্মরক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি সুদৃঢ় ও অনড় হয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অবস্থানেরও এক বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালের দিকে বেইজিং ও মস্কো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু দুই বছর আগে পুতিনের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই নিষিদ্ধ কর্মসূচির প্রতি রাশিয়ার এক ধরনের পরোক্ষ অনুমোদন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রাগারে আনুমানিক ৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে এবং তারা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম এমন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তির সন্ধান করছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়ার এই পারমাণবিক সক্ষমতার ঘোর বিরোধী, কারণ পিয়ংইয়ং পারমাণবিক শক্তিধর হলে তা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মার্কিন মিত্রদেরও নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে মারাত্মকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, যা চীনের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই ঐতিহ্যগত অবস্থানেরও এখন এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটছে। চীন এখন মনে করে, একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়া আসলে এশীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও সিউলের যৌথ সামরিক জোটের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে বেইজিংকে এক বাড়তি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান করে। গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে জিনপিং ও কিমের বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার দীর্ঘদিনের চেনা কূটনৈতিক বাক্যটি রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যদিও গত মাসে হোয়াইট হাউস ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের যৌথ লক্ষ্যের কথা বড় করে প্রচার করেছিল, তবে চীন সরকার কেবল কোরীয় উপদ্বীপ নিয়ে নিজেদের মধ্যে 'মতামত বিনিময়' হয়েছে বলে একটি অত্যন্ত মৃদু ও সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়ে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং আগামী সোমবার দুই দিনের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর বেইজিংয়ের কোনো শীর্ষ নেতার পিয়ংইয়ং সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম জং উন বিশ্বরাজনীতিতে বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে একটি শক্তিশালী কৌশলগত সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং নিজেদের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক একাকীত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে অনেকটাই মুক্ত করতে পেরেছে। এর আগে যখন শি জিনপিং উত্তর কোরিয়া সফরে গিয়েছিলেন, তখনকার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত আলোচনা আকস্মিক ব্যর্থ হওয়ায় বেশ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপে ছিলেন কিম।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দিনব্যাপী এই আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনের আড়ালে শি জিনপিং মূলত পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর বিরুদ্ধে দুই সমাজতান্ত্রিক মিত্র দেশের একটি অবিচল ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বিশ্বমঞ্চে প্রদর্শন করতে চান। তবে একই সঙ্গে বেইজিংয়ের আরেকটি অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো মূল্যে তাদের এই প্রতিবেশী দেশের ওপর নিজেদের একক প্রভাব বজায় রাখা, যে দেশিটি সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের চেয়ে মস্কোর দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছে। অন্য দিকে কিম জং উনও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের কাছে নিজেকে কেবল একজন অনুগত বা ছোট অংশীদার হিসেবে দেখতে একেবারেই রাজি নন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে তার তৈরি হওয়া নতুন এই ঘনিষ্ঠতাকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বেইজিংয়ের কাছ থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা ও ছাড় আদায়ের চেষ্টা চালাবেন। উত্তর কোরিয়া যদি তার এই দুই বিশাল প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে পুরোপুরি সফল হয়, তবে কিম তার বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীন ও উগ্র বোধ করতে পারেন, যা অদূর ভবিষ্যতে সমগ্র এশীয় অঞ্চলকে মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে লিপ্ত থাকার কারণে ওয়াশিংটনের সামরিক ও আর্থিক রসদ দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে, যা এশিয়ায় থাকা মার্কিন মিত্রদের মধ্যে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বিরল সফরের মাধ্যমে শি জিনপিং মূলত বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট এই বার্তা দিতে চান যে, উত্তর কোরিয়া এখনো সব দিক থেকে চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং বেইজিংকে এড়িয়ে এই অঞ্চলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এই পুরো রণকৌশলটি বিশ্বমঞ্চে চীনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টারই একটি অংশ। বেইজিং দেখাতে চায়, ওয়াশিংটন যখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ কিংবা নিজস্ব মিত্র ও শত্রু সবার ওপর একতরফা শুল্ক আরোপ করে বিশ্বজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, ঠিক সেই সময়ে চীন বিশ্বে একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। অতি সম্প্রতি বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকেও চীনের এই সুদূরপ্রসারী কৌশলের প্রতিফলন দেখা গেছে। মার্কিন বাইডেন প্রশাসনের সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এবং এশিয়া গ্রুপের প্রধান কার্ট ক্যাম্পবেল এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, শি জিনপিং আন্তর্জাতিক মহলে এটি প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার গণতান্ত্রিক অংশীদারদের সঙ্গে যেমন ভঙ্গুর সম্পর্কের মধ্যে আছেন, শি তার কর্তৃত্ববাদী জোটের সদস্যদের সঙ্গে তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও ভালো অবস্থানে আছেন।
তবে শি জিনপিংয়ের এই ঝটিকা সফরটি কিম জং উনের মন জয় করার প্রয়োজনীয়তাকেও সমানভাবে ফুটিয়ে তোলে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে মস্কোর সাথে স্নায়ুযুদ্ধ আমলের পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলত চীনের ওপর তাদের একক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ সেনা ও গোলাবারুদ সরবরাহের বিনিময়ে মস্কো উত্তর কোরিয়াকে তাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল, খাদ্যশস্য এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এই বিষয়টি চীনের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বেইজিং সবসময়ই উত্তর কোরিয়ার ওপর তাদের একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রেখে নিজেদের সীমানায় ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়। এশিয়া সোসাইটির সিউলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিদ জন ডিলুরি মনে করেন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্ক যেভাবে গভীর হচ্ছে তা নিয়ে চীনারা নিশ্চিতভাবেই ভেতরে ভেতরে বেশ চিন্তিত। এই সফর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে এবং এই অঞ্চলের ক্ষমতার সমীকরণে চীনকে আবারও চালকের আসনে ফিরিয়ে আনতে শি জিনপিংকে বড় সাহায্য করবে।
অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও কিম জং উনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে ২০১৯ সালে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে ট্রাম্প পারমাণবিক আলোচনা থেকে হঠাৎ সরে আসায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সব আশা ভেস্তে গিয়েছিল। এর পরের বছর বিশ্বজুড়ে মহামারি শুরু হলে সংক্রমণ ঠেকাতে কিম দেশের সব সীমান্ত দীর্ঘদিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন, যার ফলে লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চীনের সাথেও তাদের সব ধরনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশটিতে চরম খাদ্যসংকট দেখা দেয়। তবে মহামারির প্রকোপ কমে আসার পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক সংকটের মোক্ষম সুযোগটি লুফে নিয়ে মস্কোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করে কিম নিজের ভাগ্য ও দেশের অর্থনীতি রাতারাতি বদলে ফেলেন। রাশিয়ার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তেল ও সামরিক সহায়তা আসে পিয়ংইয়ংয়ে। যদিও শি জিনপিং গত মার্চ মাসে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে পুনরায় নিয়মিত ট্রেন ও বিমান যোগাযোগ চালু করে কিমকে পরোক্ষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে চীনই এখনো তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক, তবুও কিম চীনের কাছ থেকে আরও বড় অঙ্কের সুবিধা চান। বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা করের বাইরে থাকা পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করতে কিম দেশের মনোরম সমুদ্র সৈকত ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিশাল সব বিলাসবহুল রিসোর্ট তৈরি করছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো বিপুল সংখ্যক চীনা পর্যটকদের নিজেদের দেশে আকৃষ্ট করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা। সিউলের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক লি বিয়ং-চুল বলেন, উত্তর কোরিয়া এখন আর কেবল একটি মাত্র পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরশীল কোনো অসহায় বা দুর্বল দেশ নয়। দীর্ঘদিনের পরম বন্ধু চীনের পাশাপাশি তারা এখন রাশিয়াকে নিজেদের নতুন কৌশলগত শক্তিশালী ডানা হিসেবে পাশে পেয়েছে।
এই হাইভোল্টেজ সম্মেলনে শি জিনপিং নতুন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরারম্ভ করার জন্য কিমকে কোনো বিশেষ চাপ দেবেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন রয়েছে। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও কিমের সাথে ব্যক্তিগতভাবে শীর্ষ বৈঠকে বসার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কূটনৈতিক পাড়ায় এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে, ট্রাম্প হয়তো পিয়ংইয়ংয়ের জন্য জিনপিংয়ের কাছে কোনো বিশেষ বা গোপন বার্তা পাঠিয়েছেন। তবে কিম ইতিমধ্যেই বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার টেবিলে রেখে বা এটি বন্ধ করার শর্তে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপে জড়াবেন না। কিম তার এই পারমাণবিক সক্ষমতাকে চীন ও রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানোর একমাত্র উপায় এবং সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার প্রধান ঢাল হিসেবে বিবেচনা করেন। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার অজুহাতে সেখানে যেভাবে সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়েছে, তা দেখার পর কিমের এই আত্মরক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি সুদৃঢ় ও অনড় হয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অবস্থানেরও এক বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালের দিকে বেইজিং ও মস্কো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু দুই বছর আগে পুতিনের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই নিষিদ্ধ কর্মসূচির প্রতি রাশিয়ার এক ধরনের পরোক্ষ অনুমোদন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রাগারে আনুমানিক ৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে এবং তারা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম এমন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তির সন্ধান করছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়ার এই পারমাণবিক সক্ষমতার ঘোর বিরোধী, কারণ পিয়ংইয়ং পারমাণবিক শক্তিধর হলে তা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মার্কিন মিত্রদেরও নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে মারাত্মকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, যা চীনের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই ঐতিহ্যগত অবস্থানেরও এখন এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটছে। চীন এখন মনে করে, একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়া আসলে এশীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও সিউলের যৌথ সামরিক জোটের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে বেইজিংকে এক বাড়তি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান করে। গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে জিনপিং ও কিমের বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার দীর্ঘদিনের চেনা কূটনৈতিক বাক্যটি রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যদিও গত মাসে হোয়াইট হাউস ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের যৌথ লক্ষ্যের কথা বড় করে প্রচার করেছিল, তবে চীন সরকার কেবল কোরীয় উপদ্বীপ নিয়ে নিজেদের মধ্যে 'মতামত বিনিময়' হয়েছে বলে একটি অত্যন্ত মৃদু ও সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়ে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

আপনার মতামত লিখুন