যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ও মাংসখেকো এক পরজীবী পোকার দ্বিতীয় সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে দেশটির কৃষি বিভাগ। মাত্র কয়েক দিন আগে যে স্থানে প্রথম এই ক্ষতিকর পরজীবীর সন্ধান মিলেছিল, তার থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার বা সাড়ে পাঁচ মাইলেরও কম দূরত্বের মধ্যে নতুন এই আক্রান্ত পশুর খোঁজ মিলেছে। পর পর দুটি সংক্রমণের এই ঘটনা সামনে আসতেই আমেরিকার গবাদি পশু পালনকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। খামারিরা আশঙ্কা করছেন, যদি সময় থাকতে এই পরজীবীর বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো না যায়, তবে তাদের বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসান ও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।
মার্কিন কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টেক্সাসের জাভালা কাউন্টির অন্তর্গত একটি গবাদি পশুর খামারে মাত্র এক মাস বয়সী একটি বাছুরের শরীরে এই ভয়ংকর পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সরকারি প্রাণী ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য পরিদর্শন সংস্থার গবেষকেরা ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি খামার থেকে সন্দেহজনক নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর দ্বিতীয় এই সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে খামারিদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, আক্রান্ত খামারটির চারপাশের অন্যান্য খামার থেকে সংগ্রহ করা বাকি সব নমুনার পরীক্ষার ফলাফল নেতিবাচক এসেছে, অর্থাৎ সেখানে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশেষ মাংসখেকো পরজীবীটি আসলে এক ধরনের অত্যন্ত ক্ষতিকর মাছি। এই মাছিগুলো সাধারণত গরু, ছাগল, ভেড়াসহ যেকোনো উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর শরীরের খোলা ক্ষতস্থান, কাটা জায়গা কিংবা নরম চামড়া লক্ষ্য করে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা বা এক ধরনের কীড়া বের হওয়ার পর, তারা আক্রান্ত পশুর শরীরের জ্যান্ত মাংস ও কোষ কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পশুর রক্ত চুষে খেয়েই এগুলো বেঁচে থাকে এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এই পরজীবীর আক্রমণ এতটাই মারাত্মক যে, সঠিক সময়ে এবং উপযুক্ত উপায়ে চিকিৎসা না করা হলে আক্রান্ত পশুটি তীব্র যন্ত্রণায় ভুগে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই একই পরজীবীর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। সেই সময় দেশটির বন্যপ্রাণী এবং গৃহপালিত গবাদি পশুর এক বিশাল অংশ এই পোকার আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতিতে ধস নেমেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে টেক্সাস হলো সমগ্র আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে বড় গবাদি পশু উৎপাদনকারী এবং সরবরাহকারী অঙ্গরাজ্য। ফলে এবারও যদি এই পোকার সংক্রমণ কোনোভাবে অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তবে পশুদের ব্যাপক মৃত্যুর পাশাপাশি খামারিদের চিকিৎসা খরচ, বাড়তি শ্রম এবং পশু সুরক্ষায় বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা তাদের দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিতে পারে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সত্ত্বেও এই পোকার আগমন ঠেকাতে না পারা বিজ্ঞানীদের বেশ ভাবিয়ে তুলছে। গত এক বছর ধরে মেক্সিকোর মধ্য দিয়ে এই ক্ষতিকর পোকাটি ক্রমান্বয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, যা নিয়ে টেক্সাসের পশুপালকেরা আগে থেকেই চরম আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। সম্ভাব্য এই বিশাল ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে মার্কিন প্রশাসন বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার অংশ হিসেবে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো থেকে যেকোনো ধরনের জ্যান্ত গবাদি পশু আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি এই ধ্বংসাত্মক পোকার বিস্তার পুরোপুরি রুখে দিতে মার্কিন সরকার ইতিমধ্যেই কোটি কোটি ডলারের বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করেছে এবং মাঠপর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে এই ক্ষতিকর পোকার প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি রোধ করতে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে তারা বংশবিস্তার করতে না পারে। এর পাশাপাশি আক্রান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পোকা ধরার জন্য বিশেষ ফাঁদ পাতার কর্মসূচি ব্যাপক আকারে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি খামারে গবাদি পশুদের শারীরিক অবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় নজরদারির ব্যবস্থা আরও জোরদার করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও খামারিদের প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ও মাংসখেকো এক পরজীবী পোকার দ্বিতীয় সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে দেশটির কৃষি বিভাগ। মাত্র কয়েক দিন আগে যে স্থানে প্রথম এই ক্ষতিকর পরজীবীর সন্ধান মিলেছিল, তার থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার বা সাড়ে পাঁচ মাইলেরও কম দূরত্বের মধ্যে নতুন এই আক্রান্ত পশুর খোঁজ মিলেছে। পর পর দুটি সংক্রমণের এই ঘটনা সামনে আসতেই আমেরিকার গবাদি পশু পালনকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। খামারিরা আশঙ্কা করছেন, যদি সময় থাকতে এই পরজীবীর বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো না যায়, তবে তাদের বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসান ও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।
মার্কিন কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টেক্সাসের জাভালা কাউন্টির অন্তর্গত একটি গবাদি পশুর খামারে মাত্র এক মাস বয়সী একটি বাছুরের শরীরে এই ভয়ংকর পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সরকারি প্রাণী ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য পরিদর্শন সংস্থার গবেষকেরা ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি খামার থেকে সন্দেহজনক নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর দ্বিতীয় এই সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে খামারিদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, আক্রান্ত খামারটির চারপাশের অন্যান্য খামার থেকে সংগ্রহ করা বাকি সব নমুনার পরীক্ষার ফলাফল নেতিবাচক এসেছে, অর্থাৎ সেখানে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশেষ মাংসখেকো পরজীবীটি আসলে এক ধরনের অত্যন্ত ক্ষতিকর মাছি। এই মাছিগুলো সাধারণত গরু, ছাগল, ভেড়াসহ যেকোনো উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর শরীরের খোলা ক্ষতস্থান, কাটা জায়গা কিংবা নরম চামড়া লক্ষ্য করে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা বা এক ধরনের কীড়া বের হওয়ার পর, তারা আক্রান্ত পশুর শরীরের জ্যান্ত মাংস ও কোষ কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পশুর রক্ত চুষে খেয়েই এগুলো বেঁচে থাকে এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এই পরজীবীর আক্রমণ এতটাই মারাত্মক যে, সঠিক সময়ে এবং উপযুক্ত উপায়ে চিকিৎসা না করা হলে আক্রান্ত পশুটি তীব্র যন্ত্রণায় ভুগে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই একই পরজীবীর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। সেই সময় দেশটির বন্যপ্রাণী এবং গৃহপালিত গবাদি পশুর এক বিশাল অংশ এই পোকার আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতিতে ধস নেমেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে টেক্সাস হলো সমগ্র আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে বড় গবাদি পশু উৎপাদনকারী এবং সরবরাহকারী অঙ্গরাজ্য। ফলে এবারও যদি এই পোকার সংক্রমণ কোনোভাবে অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তবে পশুদের ব্যাপক মৃত্যুর পাশাপাশি খামারিদের চিকিৎসা খরচ, বাড়তি শ্রম এবং পশু সুরক্ষায় বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা তাদের দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিতে পারে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সত্ত্বেও এই পোকার আগমন ঠেকাতে না পারা বিজ্ঞানীদের বেশ ভাবিয়ে তুলছে। গত এক বছর ধরে মেক্সিকোর মধ্য দিয়ে এই ক্ষতিকর পোকাটি ক্রমান্বয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, যা নিয়ে টেক্সাসের পশুপালকেরা আগে থেকেই চরম আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। সম্ভাব্য এই বিশাল ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে মার্কিন প্রশাসন বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার অংশ হিসেবে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো থেকে যেকোনো ধরনের জ্যান্ত গবাদি পশু আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি এই ধ্বংসাত্মক পোকার বিস্তার পুরোপুরি রুখে দিতে মার্কিন সরকার ইতিমধ্যেই কোটি কোটি ডলারের বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করেছে এবং মাঠপর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে এই ক্ষতিকর পোকার প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি রোধ করতে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে তারা বংশবিস্তার করতে না পারে। এর পাশাপাশি আক্রান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পোকা ধরার জন্য বিশেষ ফাঁদ পাতার কর্মসূচি ব্যাপক আকারে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি খামারে গবাদি পশুদের শারীরিক অবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় নজরদারির ব্যবস্থা আরও জোরদার করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও খামারিদের প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স

আপনার মতামত লিখুন