দিকপাল

কয়লা খাত পুনরুজ্জীবনে ট্রাম্পের বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ | ০৪:৩০ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

কয়লা খাত পুনরুজ্জীবনে ট্রাম্পের বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একই সাথে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারে কয়লা রপ্তানির পরিধি আরও বাড়াতে কয়েক কোটি ডলারের এক বিশাল ও অভূতপূর্ব আর্থিক তহবিল ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তিনি এই বিতর্কিত ও বড় ধরনের নীতিগত ঘোষণা দেন। এই বিশাল তহবিলের একটি বড় এবং প্রধান অংশই মূলত স্নায়ুযুদ্ধকালীন একটি বিশেষ জরুরি ও জাতীয় নিরাপত্তা আইন থেকে সংস্থান করা হবে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের কথা চিন্তা করে ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও বিশাল আর্থিক বরাদ্দের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

ঘোষিত এই বিশাল কর্মপরিকল্পনার আওতায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত ১৩টি ঐতিহ্যবাহী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য ৪২৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ৪২ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছেন। এর পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কৌশলগত কয়লা রপ্তানি টার্মিনাল বা বন্দরের অবকাঠামো সংস্কারের জন্য আরও ৭৫ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ অনুদান দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে তিনি ১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ নামক একটি বিশেষ ও জরুরি আইন প্রয়োগ করেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া এই বিশেষ আইনটি মূলত জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে দেশের প্রেসিডেন্টকে যেকোনো শিল্প খাতের উৎপাদন বা তার গতিপ্রকৃতির ওপর একচ্ছত্র ও ব্যাপক ক্ষমতা অর্পণ করে। এ ছাড়া মার্কিন জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আলাস্কা এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার নতুন কিছু খনি ও প্রকল্পসহ আরও চারটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধুনিকায়নে অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের আরেকটি তহবিল চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত বর্তমান যুগের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিশাল তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোর জন্য কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং জ্বালানি খাতে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে আনতেই এই কঠোর ও ঐতিহ্যবাহী কয়লা খাতের দিকে পুনরায় ঝুঁকছে।

তবে ট্রাম্পের এই জীবাশ্ম জ্বালানিমুখী সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দেশটির পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কয়লা পোড়ানোর ফলে যে ক্ষতিকর ধোঁয়া ও কার্বন নির্গত হয়, তা বাতাসের গুণগত মান নষ্ট করে মানুষের হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় আঘাত এবং মানুষের গড় আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবাদী সংগঠন সিয়েরা ক্লাবের জলবায়ুনীতি পরিচালক প্যাট্রিক ড্রাপ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভের সাথে জানান, পরিবেশকে ধ্বংস করার জন্য সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থের এমন অপচয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা খুব শিগগিরই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আইনি লড়াই শুরু করবেন বলেও পরিষ্কার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকায় পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য শক্তির অভাবনীয় প্রসার এবং সাশ্রয়ী প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ওপর নির্ভরতা আগের চেয়ে অনেক হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ সালের দিকেও আমেরিকার মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি আসত কয়লা পুড়িয়ে, যা বর্তমানে কমে এক-পঞ্চমাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নানামুখী চেষ্টা ও কয়লা খনি মালিকদের বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও দেশটিতে কয়লা খনি শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। ২০১৭ সালে যেখানে দেশটিতে খনি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৫০০ জন, সেখানে গত বছর তা আরও কমে মাত্র ৩৯ হাজার ৮০০ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের নতুন এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাল কতটুকু সফল হবে এবং পরিবেশের ওপর এর কতখানি দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে এক বড় বিতর্ক ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


কয়লা খাত পুনরুজ্জীবনে ট্রাম্পের বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একই সাথে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারে কয়লা রপ্তানির পরিধি আরও বাড়াতে কয়েক কোটি ডলারের এক বিশাল ও অভূতপূর্ব আর্থিক তহবিল ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তিনি এই বিতর্কিত ও বড় ধরনের নীতিগত ঘোষণা দেন। এই বিশাল তহবিলের একটি বড় এবং প্রধান অংশই মূলত স্নায়ুযুদ্ধকালীন একটি বিশেষ জরুরি ও জাতীয় নিরাপত্তা আইন থেকে সংস্থান করা হবে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের কথা চিন্তা করে ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও বিশাল আর্থিক বরাদ্দের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

ঘোষিত এই বিশাল কর্মপরিকল্পনার আওতায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত ১৩টি ঐতিহ্যবাহী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য ৪২৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ৪২ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছেন। এর পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কৌশলগত কয়লা রপ্তানি টার্মিনাল বা বন্দরের অবকাঠামো সংস্কারের জন্য আরও ৭৫ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ অনুদান দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে তিনি ১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ নামক একটি বিশেষ ও জরুরি আইন প্রয়োগ করেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া এই বিশেষ আইনটি মূলত জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে দেশের প্রেসিডেন্টকে যেকোনো শিল্প খাতের উৎপাদন বা তার গতিপ্রকৃতির ওপর একচ্ছত্র ও ব্যাপক ক্ষমতা অর্পণ করে। এ ছাড়া মার্কিন জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আলাস্কা এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার নতুন কিছু খনি ও প্রকল্পসহ আরও চারটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আধুনিকায়নে অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের আরেকটি তহবিল চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত বর্তমান যুগের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিশাল তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোর জন্য কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং জ্বালানি খাতে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে আনতেই এই কঠোর ও ঐতিহ্যবাহী কয়লা খাতের দিকে পুনরায় ঝুঁকছে।

তবে ট্রাম্পের এই জীবাশ্ম জ্বালানিমুখী সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দেশটির পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কয়লা পোড়ানোর ফলে যে ক্ষতিকর ধোঁয়া ও কার্বন নির্গত হয়, তা বাতাসের গুণগত মান নষ্ট করে মানুষের হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় আঘাত এবং মানুষের গড় আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবাদী সংগঠন সিয়েরা ক্লাবের জলবায়ুনীতি পরিচালক প্যাট্রিক ড্রাপ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভের সাথে জানান, পরিবেশকে ধ্বংস করার জন্য সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থের এমন অপচয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা খুব শিগগিরই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আইনি লড়াই শুরু করবেন বলেও পরিষ্কার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকায় পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য শক্তির অভাবনীয় প্রসার এবং সাশ্রয়ী প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ওপর নির্ভরতা আগের চেয়ে অনেক হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ সালের দিকেও আমেরিকার মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি আসত কয়লা পুড়িয়ে, যা বর্তমানে কমে এক-পঞ্চমাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নানামুখী চেষ্টা ও কয়লা খনি মালিকদের বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও দেশটিতে কয়লা খনি শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। ২০১৭ সালে যেখানে দেশটিতে খনি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৫০০ জন, সেখানে গত বছর তা আরও কমে মাত্র ৩৯ হাজার ৮০০ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের নতুন এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাল কতটুকু সফল হবে এবং পরিবেশের ওপর এর কতখানি দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে এক বড় বিতর্ক ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল