দিকপাল

ইরানের পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনে বাধা উদ্বেগে জাতিসংঘ


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ | ১২:০৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানের পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনে বাধা উদ্বেগে জাতিসংঘ

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ এবং তা যাচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রবেশাধিকার বা পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের এই কাজের সুযোগ না দেওয়ায় বৈশ্বিক পর্যায়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসা জাতিসংঘের এই সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ ও অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সাথে সংস্থাটি উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং বিশ্ব নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানকে অবিলম্বে ইতিবাচক ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কাজ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার পটভূমিতে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযানের পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ১২ দিনব্যাপী একটি রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সংঘাতের সময়ে ইরানের বেশ কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালানো হয়। ওই সামরিক হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের তাদের মূল পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না তেহরান প্রশাসন। সংস্থাটি তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, সাম্প্রতিক সামরিক হামলার কারণে সেখানে একটি নজিরবিহীন ও অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে তারা এটিও স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্ব নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করতে এবং যেকোনো ধরনের পারমাণবিক বিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে ওই পরমাণু কেন্দ্রগুলোর বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি ও সময়ের দাবি।

বিগত বছরের জুনে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের এক বিশাল মজুত ছিল। সাধারণত একটি কার্যকর পারমাণবিক বোমা তৈরি করার জন্য ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন পড়ে। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রযুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, যা ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তির নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ওই কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা গত এক বছর ধরে প্রবেশ করতে না পারায়, এই বিশাল ইউরেনিয়াম মজুদের বর্তমান অবস্থা আসলে কী, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এক চরম অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিধ্বস্ত কেন্দ্রগুলো থেকে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা ইউরেনিয়াম অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।


দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে দাবি করে আসছে যে, ইরান বিশ্ব চোখের আড়ালে গোপনে বিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার একটি সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, ইরানকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র তৈরির এই বিপজ্জনক পথ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসতে হবে এবং তাদের কাছে থাকা সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অবিলম্বে ধ্বংস করতে হবে। অন্যথায় এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অপরদিকে, ইরান প্রথম থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আনা পরমাণু অস্ত্র তৈরির এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকদের দাবি, তাদের এই পারমাণবিক কর্মসূচি কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সম্পূর্ণ বেসামরিক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিদর্শকদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার পেছনে তারা নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সামনে আনছে, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ইরানের পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনে বাধা উদ্বেগে জাতিসংঘ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ এবং তা যাচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রবেশাধিকার বা পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের এই কাজের সুযোগ না দেওয়ায় বৈশ্বিক পর্যায়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসা জাতিসংঘের এই সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ ও অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সাথে সংস্থাটি উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং বিশ্ব নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানকে অবিলম্বে ইতিবাচক ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কাজ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার পটভূমিতে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযানের পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ১২ দিনব্যাপী একটি রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সংঘাতের সময়ে ইরানের বেশ কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালানো হয়। ওই সামরিক হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের তাদের মূল পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না তেহরান প্রশাসন। সংস্থাটি তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, সাম্প্রতিক সামরিক হামলার কারণে সেখানে একটি নজিরবিহীন ও অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে তারা এটিও স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্ব নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করতে এবং যেকোনো ধরনের পারমাণবিক বিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে ওই পরমাণু কেন্দ্রগুলোর বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি ও সময়ের দাবি।

বিগত বছরের জুনে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের এক বিশাল মজুত ছিল। সাধারণত একটি কার্যকর পারমাণবিক বোমা তৈরি করার জন্য ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন পড়ে। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রযুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, যা ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তির নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ওই কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা গত এক বছর ধরে প্রবেশ করতে না পারায়, এই বিশাল ইউরেনিয়াম মজুদের বর্তমান অবস্থা আসলে কী, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এক চরম অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিধ্বস্ত কেন্দ্রগুলো থেকে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা ইউরেনিয়াম অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।


দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে দাবি করে আসছে যে, ইরান বিশ্ব চোখের আড়ালে গোপনে বিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার একটি সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, ইরানকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র তৈরির এই বিপজ্জনক পথ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসতে হবে এবং তাদের কাছে থাকা সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অবিলম্বে ধ্বংস করতে হবে। অন্যথায় এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অপরদিকে, ইরান প্রথম থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আনা পরমাণু অস্ত্র তৈরির এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকদের দাবি, তাদের এই পারমাণবিক কর্মসূচি কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সম্পূর্ণ বেসামরিক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিদর্শকদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার পেছনে তারা নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সামনে আনছে, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল