দিকপাল

ধনসম্পদ আল্লাহর নিয়ামত নাকি পরীক্ষা? ইসলাম কী বলে


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ | ০৩:২২ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ধনসম্পদ আল্লাহর নিয়ামত নাকি পরীক্ষা? ইসলাম কী বলে

অনেকেই মনে করেন ধনী হওয়া মানেই সফলতা, আবার কেউ কেউ মনে করেন অতিরিক্ত সম্পদ মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু ইসলাম ধনসম্পদকে এ দুই চরম দৃষ্টিভঙ্গির কোনো একটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইসলামের শিক্ষা হলো—সম্পদ নিজে ভালোও নয়, মন্দও নয়; বরং এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের ব্যবহার, নিয়ত এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ধনসম্পদ আল্লাহর একটি নিয়ামত এবং একই সঙ্গে একটি পরীক্ষা। একজন মানুষের হাতে থাকা অর্থ, জমি, ব্যবসা বা অন্যান্য সম্পদ তার জন্য কল্যাণের মাধ্যমও হতে পারে, আবার ভুল ব্যবহারের কারণে তা আখিরাতে জবাবদিহির কারণও হতে পারে। তাই ইসলাম সম্পদকে লক্ষ্য নয়, বরং একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখতে শেখায়।

বিষয়টি একটি ধারালো তরবারির সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি তলোয়ার নিজে থেকে কোনো ভালো বা মন্দ বৈশিষ্ট্য বহন করে না। যখন এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য বা আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন তা প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে। আবার একই তলোয়ার যদি নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি বা জুলুমের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা নিন্দনীয়। সম্পদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সম্পদ মানুষের চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায়—যে যেমন ব্যবহার করে, তার ফলও তেমনই হয়।

ইসলাম মানুষকে বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের উৎসাহ দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রম, কৃষি কিংবা অন্যান্য হালাল পেশার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদকে সম্মানের চোখে দেখা হয়েছে। তবে সেই সম্পদ যেন অহংকার, অপচয় কিংবা অন্যের অধিকার হরণের কারণ না হয়, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। কারণ সম্পদের মালিকানা শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই, মানুষ কেবল তার আমানতদার।

এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)। তিনি বলেন, একবার মহানবী (সা.) তাকে একটি অভিযানে পাঠানোর সময় বলেন যে আল্লাহ তাকে নিরাপদ রাখবেন এবং প্রচুর সম্পদ দান করবেন। তখন আমর (রা.) বলেন, তিনি সম্পদের লোভে ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং ইসলামের প্রতি ভালোবাসা এবং রাসুলের (সা.) সাহচর্য লাভের আশায় মুসলিম হয়েছেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন, “সৎ মানুষের জন্য সৎ সম্পদ কতই না উত্তম!” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ২৯৯)

এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই ইসলামের সম্পদবিষয়ক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। ইসলাম সম্পদকে প্রত্যাখ্যান করে না, বরং এমন মানুষের হাতে সম্পদ দেখতে চায়, যারা তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করবে। একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষের হাতে সম্পদ সমাজের উন্নয়ন, দরিদ্রের সহায়তা, শিক্ষা বিস্তার এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

ইসলামি চিন্তাবিদ আবু জাফর আত-তাহাবি ব্যাখ্যা করেছেন, কোনো সম্পদ তখনই ‘কল্যাণময় সম্পদ’ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করা হয়। অর্থাৎ সম্পদের প্রকৃত মর্যাদা তার পরিমাণে নয়; বরং সেটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং কোথায় ব্যয় করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে।

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে ধনসম্পদ কখনোই মানুষের মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড নয়। প্রকৃত সফলতা হলো এমন সম্পদের মালিক হওয়া, যা হালাল উপায়ে অর্জিত, ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবহৃত এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয়িত হয়। তখন সম্পদ কেবল দুনিয়ার ভোগের উপকরণ নয়, বরং আখিরাতের সফলতারও পাথেয় হয়ে ওঠে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ধনসম্পদ আল্লাহর নিয়ামত নাকি পরীক্ষা? ইসলাম কী বলে

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

অনেকেই মনে করেন ধনী হওয়া মানেই সফলতা, আবার কেউ কেউ মনে করেন অতিরিক্ত সম্পদ মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু ইসলাম ধনসম্পদকে এ দুই চরম দৃষ্টিভঙ্গির কোনো একটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইসলামের শিক্ষা হলো—সম্পদ নিজে ভালোও নয়, মন্দও নয়; বরং এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের ব্যবহার, নিয়ত এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ধনসম্পদ আল্লাহর একটি নিয়ামত এবং একই সঙ্গে একটি পরীক্ষা। একজন মানুষের হাতে থাকা অর্থ, জমি, ব্যবসা বা অন্যান্য সম্পদ তার জন্য কল্যাণের মাধ্যমও হতে পারে, আবার ভুল ব্যবহারের কারণে তা আখিরাতে জবাবদিহির কারণও হতে পারে। তাই ইসলাম সম্পদকে লক্ষ্য নয়, বরং একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখতে শেখায়।

বিষয়টি একটি ধারালো তরবারির সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি তলোয়ার নিজে থেকে কোনো ভালো বা মন্দ বৈশিষ্ট্য বহন করে না। যখন এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য বা আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন তা প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে। আবার একই তলোয়ার যদি নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি বা জুলুমের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা নিন্দনীয়। সম্পদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সম্পদ মানুষের চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায়—যে যেমন ব্যবহার করে, তার ফলও তেমনই হয়।

ইসলাম মানুষকে বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের উৎসাহ দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রম, কৃষি কিংবা অন্যান্য হালাল পেশার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদকে সম্মানের চোখে দেখা হয়েছে। তবে সেই সম্পদ যেন অহংকার, অপচয় কিংবা অন্যের অধিকার হরণের কারণ না হয়, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। কারণ সম্পদের মালিকানা শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই, মানুষ কেবল তার আমানতদার।

এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)। তিনি বলেন, একবার মহানবী (সা.) তাকে একটি অভিযানে পাঠানোর সময় বলেন যে আল্লাহ তাকে নিরাপদ রাখবেন এবং প্রচুর সম্পদ দান করবেন। তখন আমর (রা.) বলেন, তিনি সম্পদের লোভে ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং ইসলামের প্রতি ভালোবাসা এবং রাসুলের (সা.) সাহচর্য লাভের আশায় মুসলিম হয়েছেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন, “সৎ মানুষের জন্য সৎ সম্পদ কতই না উত্তম!” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ২৯৯)

এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই ইসলামের সম্পদবিষয়ক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। ইসলাম সম্পদকে প্রত্যাখ্যান করে না, বরং এমন মানুষের হাতে সম্পদ দেখতে চায়, যারা তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করবে। একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষের হাতে সম্পদ সমাজের উন্নয়ন, দরিদ্রের সহায়তা, শিক্ষা বিস্তার এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

ইসলামি চিন্তাবিদ আবু জাফর আত-তাহাবি ব্যাখ্যা করেছেন, কোনো সম্পদ তখনই ‘কল্যাণময় সম্পদ’ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করা হয়। অর্থাৎ সম্পদের প্রকৃত মর্যাদা তার পরিমাণে নয়; বরং সেটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং কোথায় ব্যয় করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে।

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে ধনসম্পদ কখনোই মানুষের মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড নয়। প্রকৃত সফলতা হলো এমন সম্পদের মালিক হওয়া, যা হালাল উপায়ে অর্জিত, ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবহৃত এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয়িত হয়। তখন সম্পদ কেবল দুনিয়ার ভোগের উপকরণ নয়, বরং আখিরাতের সফলতারও পাথেয় হয়ে ওঠে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল