সমসাময়িক ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে সমাজকাঠামোতে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট, কুরুচিপূর্ণ ভাষা এবং অনৈতিক প্রবণতার বিস্তার লক্ষ্যণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামি সমাজবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের মতে, অনৈতিকতায় লিপ্ত হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি গণমাধ্যমে বা সমাজে অশ্লীলতার প্রচার, প্রসার কিংবা সেটিকে স্বাভাবিক ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করাও ইসলামের আইনি ও নৈতিক বিধানে সমভাবে দণ্ডনীয়।
পবিত্র কোরআনে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অনৈতিকতার প্রসার রোধে অত্যন্ত কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক বিধানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন: "নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।" — সুরা আন-নূর, আয়াত: ১৯
পবিত্র কোরআনের তাফসির ও ব্যাখ্যামূলক গবেষণা অনুযায়ী, এই নির্দেশনা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগকে অন্তর্ভুক্ত করে যা সমাজমানসে অনৈতিক আচরণকে বৈধতা দেয় বা উৎসাহিত করে।
কোরআনিক তত্ত্বে নৈতিক অবক্ষয়ের ধারাবাহিক পর্যায়কে শয়তানের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: "হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে অবশ্যই অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে।" — সুরা আন-নূর, আয়াত: ২১
ইসলামি গবেষকদের মতে, সামাজিক অবক্ষয় রাতারাতি ঘটে না; বরং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সমাজে অনৈতিকতাকে প্রগতি বা আধুনিকতার নামে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। ফলে এক সময়ের সামাজিকভাবে নিন্দনীয় আচরণই কালক্রমে বিনোদনের ছদ্মাবরণে সমাজে স্বাভাবিক রূপ পরিগ্রহ করে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভার্চুয়াল ট্রাফিক ও জনপ্রিয়তা বা 'ভাইরাল' হওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে অনৈতিকতা বিস্তারের প্রধান অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী সচেতনতা বা দূরদর্শিতার অভাবে কুরুচিপূর্ণ কৌতুক, আপত্তিকর ভিডিও কিংবা বিভিন্ন ট্রেন্ড শেয়ার করছেন, যা পরোক্ষভাবে অনৈতিক কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।
ইসলামি আইনবিদদের সুচিন্তিত মতানুযায়ী, কোনো বিষয়ের সাময়িক জনপ্রিয়তা বা ট্রেন্ড কখনোই সেটির বৈধতার (Halal Status) মাপকাঠি হতে পারে না। একজন সচেতন নাগরিক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির জন্য প্রতিটি ডিজিটাল পোস্ট, মন্তব্য কিংবা কনটেন্ট শেয়ার করার পূর্বে সেটির সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা একান্ত জরুরি।
ইসলাম কেবল কাজের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মানুষের ভাষা ও আচরণের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সামাজিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মানদণ্ড নির্ধারণ করে বলেছেন: "মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী কিংবা কটুভাষী হয় না।" — সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭
এমনকি তীব্র মতবিরোধ বা গঠনমূলক বিতর্কের ক্ষেত্রেও ইসলাম কাদা-ছোড়াছুড়ি পরিহার করে মার্জিত ভাষা ব্যবহারের তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: "তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করো।" — সুরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫
ইসলামি আইনশাস্ত্রে ব্যক্তির নিজস্ব কর্মের পাশাপাশি তার কর্মের ফলে সমাজে সৃষ্ট সুদূরপ্রসারী প্রভাব বা 'চেইন রিঅ্যাকশন'-এর ওপর সমধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি মৌলিক নির্দেশনা হলো: "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ রীতির প্রচলন করবে, সে নিজের গুনাহ বহন করবে এবং যারা তা অনুসরণ করবে তাদের গুনাহের অংশও বহন করবে।" — সুনান নাসায়ি, হাদিস: ২৫৫৪
অতএব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোনো তথ্য, সংবাদ বা কনটেন্ট প্রচারের আগে সেটির সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রতিটি ব্যবহারকারীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে সমাজ ও পরিবারে শালীনতা, পবিত্রতা এবং উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব কেবল নিজে অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকা নয়, বরং সমষ্টিগতভাবে এমন প্রতিটি ডিজিটাল কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা থেকে বিরত থাকা যা সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত করতে পারে। কোরআন ও সুন্নাহর এই কালজয়ী শিক্ষাকে ধারণ করে ডিজিটাল ও বাস্তব জীবনে শালীনতা বজায় রাখাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রকে সামাজিক অবক্ষয় থেকে সুরক্ষার একমাত্র কার্যকর উপায়।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
সমসাময়িক ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে সমাজকাঠামোতে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট, কুরুচিপূর্ণ ভাষা এবং অনৈতিক প্রবণতার বিস্তার লক্ষ্যণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামি সমাজবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের মতে, অনৈতিকতায় লিপ্ত হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি গণমাধ্যমে বা সমাজে অশ্লীলতার প্রচার, প্রসার কিংবা সেটিকে স্বাভাবিক ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করাও ইসলামের আইনি ও নৈতিক বিধানে সমভাবে দণ্ডনীয়।
পবিত্র কোরআনে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অনৈতিকতার প্রসার রোধে অত্যন্ত কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক বিধানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন: "নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।" — সুরা আন-নূর, আয়াত: ১৯
পবিত্র কোরআনের তাফসির ও ব্যাখ্যামূলক গবেষণা অনুযায়ী, এই নির্দেশনা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগকে অন্তর্ভুক্ত করে যা সমাজমানসে অনৈতিক আচরণকে বৈধতা দেয় বা উৎসাহিত করে।
কোরআনিক তত্ত্বে নৈতিক অবক্ষয়ের ধারাবাহিক পর্যায়কে শয়তানের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: "হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে অবশ্যই অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে।" — সুরা আন-নূর, আয়াত: ২১
ইসলামি গবেষকদের মতে, সামাজিক অবক্ষয় রাতারাতি ঘটে না; বরং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সমাজে অনৈতিকতাকে প্রগতি বা আধুনিকতার নামে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। ফলে এক সময়ের সামাজিকভাবে নিন্দনীয় আচরণই কালক্রমে বিনোদনের ছদ্মাবরণে সমাজে স্বাভাবিক রূপ পরিগ্রহ করে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভার্চুয়াল ট্রাফিক ও জনপ্রিয়তা বা 'ভাইরাল' হওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে অনৈতিকতা বিস্তারের প্রধান অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী সচেতনতা বা দূরদর্শিতার অভাবে কুরুচিপূর্ণ কৌতুক, আপত্তিকর ভিডিও কিংবা বিভিন্ন ট্রেন্ড শেয়ার করছেন, যা পরোক্ষভাবে অনৈতিক কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।
ইসলামি আইনবিদদের সুচিন্তিত মতানুযায়ী, কোনো বিষয়ের সাময়িক জনপ্রিয়তা বা ট্রেন্ড কখনোই সেটির বৈধতার (Halal Status) মাপকাঠি হতে পারে না। একজন সচেতন নাগরিক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির জন্য প্রতিটি ডিজিটাল পোস্ট, মন্তব্য কিংবা কনটেন্ট শেয়ার করার পূর্বে সেটির সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা একান্ত জরুরি।
ইসলাম কেবল কাজের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মানুষের ভাষা ও আচরণের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সামাজিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মানদণ্ড নির্ধারণ করে বলেছেন: "মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী কিংবা কটুভাষী হয় না।" — সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭
এমনকি তীব্র মতবিরোধ বা গঠনমূলক বিতর্কের ক্ষেত্রেও ইসলাম কাদা-ছোড়াছুড়ি পরিহার করে মার্জিত ভাষা ব্যবহারের তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: "তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করো।" — সুরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫
ইসলামি আইনশাস্ত্রে ব্যক্তির নিজস্ব কর্মের পাশাপাশি তার কর্মের ফলে সমাজে সৃষ্ট সুদূরপ্রসারী প্রভাব বা 'চেইন রিঅ্যাকশন'-এর ওপর সমধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি মৌলিক নির্দেশনা হলো: "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ রীতির প্রচলন করবে, সে নিজের গুনাহ বহন করবে এবং যারা তা অনুসরণ করবে তাদের গুনাহের অংশও বহন করবে।" — সুনান নাসায়ি, হাদিস: ২৫৫৪
অতএব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোনো তথ্য, সংবাদ বা কনটেন্ট প্রচারের আগে সেটির সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রতিটি ব্যবহারকারীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে সমাজ ও পরিবারে শালীনতা, পবিত্রতা এবং উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব কেবল নিজে অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকা নয়, বরং সমষ্টিগতভাবে এমন প্রতিটি ডিজিটাল কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা থেকে বিরত থাকা যা সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত করতে পারে। কোরআন ও সুন্নাহর এই কালজয়ী শিক্ষাকে ধারণ করে ডিজিটাল ও বাস্তব জীবনে শালীনতা বজায় রাখাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রকে সামাজিক অবক্ষয় থেকে সুরক্ষার একমাত্র কার্যকর উপায়।

আপনার মতামত লিখুন