দিকপাল

আল জাজিরার অনুসন্ধান : মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে মৃতদেহ বিক্রির অভিযোগ


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ | ০২:৩৪ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

 আল জাজিরার অনুসন্ধান : মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে মৃতদেহ বিক্রির অভিযোগ

শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো মহৎ উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের দান করা মৃতদেহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসা দলের যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ অনুসন্ধানধর্মী ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘ডাইরেক্ট ফ্রম’-এর একটি প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথিপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় কর্মরত একজন মেডিকেল কেস ম্যানেজার মিরিয়াম ভলপিন বিগত ২০২৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার এক ছাত্র সাংবাদিকের কাছ থেকে একটি বার্তা পাওয়ার পর তীব্র মানসিক ধাক্কা খান এবং গভীর উদ্বেগে পড়েন। তার মা জিনেট ভলপিন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন বীর ফ্লাইট নার্স হিসেবে মানবসেবায় নিয়োজিত ছিলেন, মৃত্যুর আগে নিজের দেহটি চিকিৎসা শাস্ত্রের শিক্ষা ও গবেষণার কল্যাণে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল বিভাগে দান করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ১০১ বছর বয়সে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তবে সাম্প্রতিক এই অনুসন্ধানের পর মিরিয়াম ভলপিন আশঙ্কা করছেন যে, তার মায়ের পবিত্র দেহটি হয়তো কোনো গবেষণায় নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ ক্ষত ও অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে ইসরাইলের গাজা অভিযানের মতো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চিকিৎসার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে।


ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর ছাত্র সাংবাদিকদের একটি যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এই নামী দুটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলি সামরিক সার্জিক্যাল টিমের জটিল প্রশিক্ষণের জন্য নিয়মিত মানুষের মৃতদেহ সরবরাহ করে আসছিল। হাতে আসা দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, বিগত ২০১৮ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া অন্তত ৮৯টি একদম তাজা বা বিশেষভাবে সংরক্ষিত মৃতদেহ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে, যা মূলত মার্কিন নৌবাহিনী ও ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসা দলের মধ্যকার একটি গোপন যৌথ প্রশিক্ষণ চুক্তির অংশ ছিল।


বিগত ২০২০ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কিন নৌবাহিনীর প্রশিক্ষকদের যৌথভাবে প্রকাশিত একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রে চার দিনব্যাপী একটি বিশেষ সামরিক ট্রমা সার্জারি কোর্সের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এই কোর্সটি মূলত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক বিশেষ অগ্রবর্তী দলের জন্য পরিচালনা করা হয়েছিল, যারা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রের একদম কাছাকাছি ফ্রন্টলাইনে অবস্থান করে জরুরি চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। এই প্রশিক্ষণের সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় ছিল যে, সেখানে মৃতদেহগুলোকে কৃত্রিম উপায়ে রক্তসঞ্চালন করানোর এক বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে জীবন্ত মানুষের মতো সচল করে তোলা হতো। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে তীব্রভাবে আহত সৈনিকদের শরীর থেকে যেভাবে ফিনকি দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়, ঠিক সেই রকম একটি বাস্তবসম্মত ও কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হতো। গবেষণাপত্রে বর্ণিত সেই অনুশীলনে মৃতদেহের বুকে ও পায়ে গুলি করা, মুখমণ্ডল ও শরীরে শক্তিশালী বিস্ফোরণের আঘাত তৈরি করাসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধকালীন মারাত্মক জখম তৈরি করে তা নিরাময়ের নিষ্ঠুর প্র্যাকটিস করা হতো।


এই তীব্র বিতর্কের মুখে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া আল জাজিরার একাধিক প্রশ্নের জবাবে নির্দিষ্ট করে জানায়নি যে, তারা মৃতদেহে ঠিক কী ধরনের কৃত্রিম আঘাত সৃষ্টি করেছিল বা কীভাবে সেই প্রশিক্ষণগুলো পরিচালিত হয়েছিল। তবে ধোঁয়াশা তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি সাধারণ শিক্ষামূলক কার্যক্রম ছিল এবং যেখানে অংশগ্রহণকারী ইসরাইলি চিকিৎসাকর্মীরা মূলত বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের অভিজ্ঞ সার্জনরা অস্ত্রোপচারের বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে জটিল সব আঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা যুদ্ধের বাস্তবসম্মত পরিবেশে নিজেদের দক্ষতা নিখুঁতভাবে ঝালিয়ে নিতে পারেন।


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, এই বিশাল সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ মৃতদেহের প্রয়োজন হতো, তা এককভাবে সরবরাহ করতে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া একসময় হিমশিম খাচ্ছিল। ফলে তারা অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর আনুষ্ঠানিক সহায়তা নেয়। ছাত্র সাংবাদিকদের সেই প্রতিবেদনে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত সান ডিয়েগোর প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১২৪টি দানকৃত মৃতদেহ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে সান ডিয়েগো কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায় এড়াতে দাবি করেছে যে, তাদের দানকৃত পবিত্র মৃতদেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা প্রকৃত পরিস্থিতিকে আংশিক ও ভুলভাবে উপস্থাপন করছে।


বিশ্ববিদ্যালয় দুটির কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পর তাদের দেহ কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে আগে থেকে কোনো শর্ত জুড়ে দিতে পারেন না। একইভাবে মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদেরও সেই দেহ কোথায় বা কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা জানার আইনগত কোনো সুযোগ রাখা হয় না। এই নিয়মটির সুযোগ নিয়েই এমন কাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই ভয়ানক তথ্য জানার পর দাতা ও তাদের পরিবারের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেক পরিবার এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন যে, যদি তারা আগে থেকেই জানতেন যে বিজ্ঞান ও শিক্ষার নামে দান করা তাদের প্রিয় মানুষের দেহটি শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ ও বোমার আঘাতের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হবে, তবে কি তারা কখনোই এমন দেহদানের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতেন? আল জাজিরার এই চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানটি বিশ্বজুড়ে মানবদেহ দানের নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং দাতাদের পারিবারিক সম্মতির সীমারেখা নিয়ে নতুন করে এক বিশাল আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


আল জাজিরার অনুসন্ধান : মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে মৃতদেহ বিক্রির অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

featured Image

শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো মহৎ উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের দান করা মৃতদেহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসা দলের যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ অনুসন্ধানধর্মী ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘ডাইরেক্ট ফ্রম’-এর একটি প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথিপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় কর্মরত একজন মেডিকেল কেস ম্যানেজার মিরিয়াম ভলপিন বিগত ২০২৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার এক ছাত্র সাংবাদিকের কাছ থেকে একটি বার্তা পাওয়ার পর তীব্র মানসিক ধাক্কা খান এবং গভীর উদ্বেগে পড়েন। তার মা জিনেট ভলপিন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন বীর ফ্লাইট নার্স হিসেবে মানবসেবায় নিয়োজিত ছিলেন, মৃত্যুর আগে নিজের দেহটি চিকিৎসা শাস্ত্রের শিক্ষা ও গবেষণার কল্যাণে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল বিভাগে দান করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ১০১ বছর বয়সে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তবে সাম্প্রতিক এই অনুসন্ধানের পর মিরিয়াম ভলপিন আশঙ্কা করছেন যে, তার মায়ের পবিত্র দেহটি হয়তো কোনো গবেষণায় নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ ক্ষত ও অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে ইসরাইলের গাজা অভিযানের মতো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চিকিৎসার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে।


ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর ছাত্র সাংবাদিকদের একটি যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এই নামী দুটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলি সামরিক সার্জিক্যাল টিমের জটিল প্রশিক্ষণের জন্য নিয়মিত মানুষের মৃতদেহ সরবরাহ করে আসছিল। হাতে আসা দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, বিগত ২০১৮ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া অন্তত ৮৯টি একদম তাজা বা বিশেষভাবে সংরক্ষিত মৃতদেহ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে, যা মূলত মার্কিন নৌবাহিনী ও ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসা দলের মধ্যকার একটি গোপন যৌথ প্রশিক্ষণ চুক্তির অংশ ছিল।


বিগত ২০২০ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কিন নৌবাহিনীর প্রশিক্ষকদের যৌথভাবে প্রকাশিত একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রে চার দিনব্যাপী একটি বিশেষ সামরিক ট্রমা সার্জারি কোর্সের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এই কোর্সটি মূলত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক বিশেষ অগ্রবর্তী দলের জন্য পরিচালনা করা হয়েছিল, যারা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রের একদম কাছাকাছি ফ্রন্টলাইনে অবস্থান করে জরুরি চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। এই প্রশিক্ষণের সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় ছিল যে, সেখানে মৃতদেহগুলোকে কৃত্রিম উপায়ে রক্তসঞ্চালন করানোর এক বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে জীবন্ত মানুষের মতো সচল করে তোলা হতো। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে তীব্রভাবে আহত সৈনিকদের শরীর থেকে যেভাবে ফিনকি দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়, ঠিক সেই রকম একটি বাস্তবসম্মত ও কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হতো। গবেষণাপত্রে বর্ণিত সেই অনুশীলনে মৃতদেহের বুকে ও পায়ে গুলি করা, মুখমণ্ডল ও শরীরে শক্তিশালী বিস্ফোরণের আঘাত তৈরি করাসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধকালীন মারাত্মক জখম তৈরি করে তা নিরাময়ের নিষ্ঠুর প্র্যাকটিস করা হতো।


এই তীব্র বিতর্কের মুখে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া আল জাজিরার একাধিক প্রশ্নের জবাবে নির্দিষ্ট করে জানায়নি যে, তারা মৃতদেহে ঠিক কী ধরনের কৃত্রিম আঘাত সৃষ্টি করেছিল বা কীভাবে সেই প্রশিক্ষণগুলো পরিচালিত হয়েছিল। তবে ধোঁয়াশা তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি সাধারণ শিক্ষামূলক কার্যক্রম ছিল এবং যেখানে অংশগ্রহণকারী ইসরাইলি চিকিৎসাকর্মীরা মূলত বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের অভিজ্ঞ সার্জনরা অস্ত্রোপচারের বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে জটিল সব আঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা যুদ্ধের বাস্তবসম্মত পরিবেশে নিজেদের দক্ষতা নিখুঁতভাবে ঝালিয়ে নিতে পারেন।


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, এই বিশাল সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ মৃতদেহের প্রয়োজন হতো, তা এককভাবে সরবরাহ করতে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া একসময় হিমশিম খাচ্ছিল। ফলে তারা অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর আনুষ্ঠানিক সহায়তা নেয়। ছাত্র সাংবাদিকদের সেই প্রতিবেদনে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত সান ডিয়েগোর প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১২৪টি দানকৃত মৃতদেহ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে সান ডিয়েগো কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায় এড়াতে দাবি করেছে যে, তাদের দানকৃত পবিত্র মৃতদেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা প্রকৃত পরিস্থিতিকে আংশিক ও ভুলভাবে উপস্থাপন করছে।


বিশ্ববিদ্যালয় দুটির কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পর তাদের দেহ কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে আগে থেকে কোনো শর্ত জুড়ে দিতে পারেন না। একইভাবে মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদেরও সেই দেহ কোথায় বা কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা জানার আইনগত কোনো সুযোগ রাখা হয় না। এই নিয়মটির সুযোগ নিয়েই এমন কাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই ভয়ানক তথ্য জানার পর দাতা ও তাদের পরিবারের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেক পরিবার এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন যে, যদি তারা আগে থেকেই জানতেন যে বিজ্ঞান ও শিক্ষার নামে দান করা তাদের প্রিয় মানুষের দেহটি শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ ও বোমার আঘাতের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হবে, তবে কি তারা কখনোই এমন দেহদানের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতেন? আল জাজিরার এই চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানটি বিশ্বজুড়ে মানবদেহ দানের নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং দাতাদের পারিবারিক সম্মতির সীমারেখা নিয়ে নতুন করে এক বিশাল আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল