দিকপাল

কাগুজে কোম্পানি-ঋণের জালে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দখল, অভিযুক্ত এস আলম


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ | ০২:২১ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

কাগুজে কোম্পানি-ঋণের জালে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দখল, অভিযুক্ত এস আলম

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দখল বা এর মালিকানা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পেছনে কোনো জাদুকরি ব্যবসায়িক কৌশল ছিল না, বরং ছিল এক অভিনব ও সুনির্দিষ্ট জালিয়াতিরBlueprint। এস আলম গ্রুপ নিজের পকেটের টাকায় এই ব্যাংক কেনেনি, বরং ব্যাংকটির নিজস্ব আমানতকারীদের জমানো টাকা ব্যবহার করেই কৌশলে এর সিংহভাগ মালিকানা নিজেদের কুক্ষিগত করেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির মূল পর্যবেক্ষণটি উঠে এসেছে। সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এই প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী মূলত ঋণের অর্থ ব্যবহার করেছে। আর এই ঋণের সিংহভাগই এসেছে খোদ ইসলামী ব্যাংক এবং পূর্বে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অন্যান্য দুর্বল বা সহযোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে।

তদন্তে উঠে আসা পুরো জালিয়াতি বা অর্থ চুরির প্রক্রিয়াটি ছিল যেমন সুনির্দিষ্ট, তেমনি অবিশ্বাস্য রকমের সহজ। শুরুতে একদল কাগুজে বা ভুয়া নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়, যাদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা বড় ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল না। এরপর এসব সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার ঋণ পাস করিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই ঋণের টাকা ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় বাহাত্তর শতাংশ শেয়ার কিনে নেওয়া হয় এবং রাতারাতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওপর পূর্ণ ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর একবার যখন ব্যাংকের চাবি তাদের হাতে চলে আসে, তখন অর্থের প্রবাহের পাইপলাইনটি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে চলতে শুরু করে। অর্থাৎ, ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা হাতে নিয়ে গ্রুপটি নিজেদের কাগুজে কোম্পানিগুলোর জন্য আরও ব্যাপক হারে ও সহজ শর্তে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা বরাদ্দ করতে থাকে। এভাবে সাধারণ মানুষের আমানতের অর্থ দিয়ে গঠিত পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তারের বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

বিএফআইইউ-র প্রতিবেদনে যে ভয়ঙ্কর চিত্রটি বর্ণনা করা হয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ করপোরেট অধিগ্রহণ বা শেয়ার ক্রয়ের ঘটনা নয়। এটি মূলত একটি দেশের আর্থিক খাতের নিয়ামক সংস্থাকে পুরোপুরি কবজা বা অকেজো করে ফেলার একটি ধ্রুপদী এবং ঐতিহাসিক উদাহরণ। যেখানে একটি চতুর ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিজস্ব মূলধন বা টাকা চুরির মাধ্যমে একটি ব্যাংক কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে সেই ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ অবাধে লুটপাট করে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় দেশের তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল অথবা ক্ষমতার প্রভাবে নিজেদের চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। বিএফআইইউ-র গভীর তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক এই প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী বাইশ জন প্রক্সি বা বেনামি শেয়ারহোল্ডার এবং সন্দেহভাজন বেশ কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

শেয়ার কেনার জন্য ব্যবহৃত অর্থের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। বিএফআইইউ নিশ্চিত করেছে যে, এই অর্থের একটি বিশাল অংশ ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া পূর্ববর্তী ঋণের মাধ্যমে জোগান দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, ব্যাংকের শেয়ার কেনা দুটি নামীদামি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের এক জটিল লেনদেনে এস আলম গ্রুপের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের সরাসরি জড়িত থাকার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারী দল। এই সব দালিলিক তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ তীব্রভাবে সন্দেহ করছে যে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ছদ্মবেশে শেয়ার কেনার পেছনেও এস আলমের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। যদি এই পুরো যোগসূত্রটি শতভাগ প্রমাণিত হয়, তবে ব্যাংকটিতে গ্রুপটির প্রকৃত মালিকানা দাঁড়াবে প্রায় একাশি দশমিক বিরানব্বই শতাংশ। তাই এস আলমের এই গোপন ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার পূর্ণ চিত্র উন্মোচনে আরও ব্যাপক, গভীর এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তদন্তের জোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ইতিমধ্যে এই সুনির্দিষ্ট জালিয়াতির ঘটনায় দেশের উচ্চ আদালত কঠোর রুল জারি করেছেন। আদালত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে জানতে চেয়েছেন যে, কীভাবে মাত্র চব্বিশটি ভুয়া ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা একাশি দশমিক বিরানব্বই শতাংশ শেয়ারকে আইনিভাবে বৈধ বলা যায় এবং কেন জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত এসব শেয়ার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হবে না। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ ক্রোক, তাদের সমস্ত ভোটাধিকার স্থগিত এবং জালিয়াতির সাথে জড়িত পরিচালকদের সব ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতে জমা দেওয়া বিএফআইইউ-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের শেয়ার কেনার সাথে সম্পর্কিত সমস্ত নথিপত্র, ভাউচার ও ডিজিটাল তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই তারা এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

এই বিশাল তদন্তে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ এবং নিউ এরা সিকিউরিটিজসহ বেশ কয়েকটি সহযোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত জমা ও ঋণ হিসাবের সমস্ত রেকর্ড, অনুমোদনের চিঠি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল তথ্য যাচাই করা হয়েছে। সংস্থাটির চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের বাহাত্তর দশমিক শূন্য সাত শতাংশ শেয়ারই সরাসরি এস আলম গ্রুপের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। শুরুর দিকে ব্যাংকটির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে এটি দখল বা একীভূত করার জন্য মূলত সাতটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার প্রতিটিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এস আলম গ্রুপের শীর্ষ কর্তাদের ইশারায় পরিচালিত হতো।

এর মধ্যে কেবল প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৭১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের ২ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার কেনে। তদন্ত অনুযায়ী, এই অর্থ প্রাথমিকভাবে এস আলম গ্রুপের একটি মূল সহযোগী প্রতিষ্ঠান– এস আলম সুপার এডিবল অয়েল-এর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের একটি অংশ মোমেন্টাম বিজনেস সেন্টার, এপিক অ্যাবল ট্রেডার্স, ইনভেনশন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আবদুল আউয়াল অ্যান্ড সন্স (পটিয়া), নবির ট্রেডিং এবং এক্সিস্টেন্স ট্রেড এজেন্সিসহ একাধিক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া ভুয়া ঋণের মাধ্যমে সমন্বয় বা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্ত অ্যাকাউন্ট ছিল এস আলমের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন প্রধান শাখায়। বিএফআইইউ এগুলোকে গ্রুপটির সহযোগী বা ভুয়া কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছে। তথ্য অনুযায়ী, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের ভাইস চেয়ারম্যান ও মনোনীত পরিচালক তানভীর আহমেদ সম্পর্কে এস আলমের আপন ভাগিনা।

প্রথম দিকে শেয়ার ধারণ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট— এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং-এর হিসাবের মাধ্যমে ৬ কোটি ৪৩ লাখ শেয়ার কেনে। এই লেনদেনের অর্থ সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে স্থানান্তর বা রাউটিং করা হয়। এক্সেল ডায়িংয়ের পরিচালক বদরুন্নেসা এবং ওয়াহিদুল আলম এস আলমের নিকটাত্মীয় হিসেবে সমাজ ও ব্যাংকিং খাতে চিহ্নিত হয়েছেন। অর্থ জোগান দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকটি আবার বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় লজ্জাজনকভাবে শীর্ষে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে একই ব্যাংকের জনগণের আমানতের ঋণ ব্যবহার করে সেই ব্যাংকেরই মালিকানা কেনা হয়েছিল। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে আর্মাডা স্পিনিং মিলসের হিসাবের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি ৩৭ লাখ শেয়ার ক্রয় করা হয়। এই অর্থ এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার থেকে অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি 'গ্রিন এক্সপোজ ট্রেডার্স' নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকেও বড় অংকের ঋণ নেওয়া হয়, যার পরিচালক জেসমিন আরশাদ হলেন এস আলমের শ্যালক মো. আরশাদের স্ত্রী।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের মাধ্যমে গ্র্যান্ড বিজনেস ৩ কোটি ২৫ লাখ শেয়ার কেনে, যার সমস্ত অর্থ এসেছিল এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে এবিসি ভেঞ্চারস কেনে ২ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার, যার অর্থায়ন করে এস আলমের আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান সোনালী ট্রেডার্স। একইভাবে প্লাটিনাম এনডেভারস ৩ কোটি ২২ লাখ শেয়ার কেনে এবং এই অর্থ এস আলম স্টিলস, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, জেনেসিস টেক্সটাইলস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস, এস আলম প্রপার্টিজ এবং এস আলম অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে রাউটিং করা হয়। অর্থের একটি অংশ প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের বিও অ্যাকাউন্ট থেকেও এসেছিল। এর পরিচালক মোস্তান বিল্লাহ আদিল হলেন এস আলমের ভাতিজা। প্রাথমিক পর্যায়ে শেয়ার ধারণ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান—ব্লু ইন্টারন্যাশনাল—ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে ৩ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে। এর অর্থ স্থানান্তর করা হয় সোনালী ট্রেডার্স, চেমন ইস্পাত, এস আলম স্টিলস, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, এস আলম প্রপার্টিজ এবং জেনেসিস টেক্সটাইলসের হিসাবের মাধ্যমে। যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ব্লু ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান এস আলমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং তার জামাতার মালিকানাধীন ইউনিটেক্স গ্রুপের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

তদন্তে আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ২০১৭ সালে একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ও চাপ সৃষ্টিকারী সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের পুরো নিয়ন্ত্রণ জোরপূর্বক কেড়ে নেয় এস আলম গ্রুপ। শুরুতে যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনা হয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে এমন কিছু কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়, যারা এই ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকে পরিণত হয়েছিল এবং ব্যাংকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এরমধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ ও গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাইফুল আলমের পাশাপাশি আছেন তার ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ। এছাড়া সাইফুল আলমের একাধিক ভাই এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসব কোম্পানির মালিকানায় থেকে ঋণ লুটপাটের মহোৎসবে মেতেছিলেন।

ব্যাংকের অফিশিয়াল তথ্যানুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে এবং বর্তমানে ব্যাংকটিতে এ প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণেও শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এই কোম্পানি থেকেও বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এরপর এস আলম রিফাইন্ড সুগারের খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি, সোনালী ট্রেডার্সের চার হাজার ৮৫৩ কোটি এবং এস আলমের মা চেমন আরার নামে করা কোম্পানি চেমন ইস্পাতের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি থেকেই শেয়ার ক্রয়ের সময় অবৈধভাবে অর্থ সরানো হয়েছিল। এছাড়া শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলসের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের এক হাজার ৭৮৩ কোটি এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের এক হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যেটি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয় আনসারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠী বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমতি ছাড়া সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ এবং অনুমতিসহ কোনোভাবেই সর্বোচ্চ দশ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। কিন্তু এস আলম গ্রুপ সমস্ত আইন ও রেগুলেশন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যাংকের বাহাত্তর শতাংশের বেশি শেয়ার নিজেদের দখলে নিয়েছে। উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত রিটের পেক্ষিতে এই অবৈধ শেয়ারগুলোর ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট ভুয়া শেয়ারহোল্ডারদের পরিচালনা পর্ষদে বসার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো, জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত এই শেয়ারগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে এই লুটেরা গ্রুপ থেকে ব্যাংকের পাওনা অর্থ উদ্ধার করা এবং সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয় ও দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


কাগুজে কোম্পানি-ঋণের জালে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দখল, অভিযুক্ত এস আলম

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দখল বা এর মালিকানা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পেছনে কোনো জাদুকরি ব্যবসায়িক কৌশল ছিল না, বরং ছিল এক অভিনব ও সুনির্দিষ্ট জালিয়াতিরBlueprint। এস আলম গ্রুপ নিজের পকেটের টাকায় এই ব্যাংক কেনেনি, বরং ব্যাংকটির নিজস্ব আমানতকারীদের জমানো টাকা ব্যবহার করেই কৌশলে এর সিংহভাগ মালিকানা নিজেদের কুক্ষিগত করেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির মূল পর্যবেক্ষণটি উঠে এসেছে। সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এই প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী মূলত ঋণের অর্থ ব্যবহার করেছে। আর এই ঋণের সিংহভাগই এসেছে খোদ ইসলামী ব্যাংক এবং পূর্বে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অন্যান্য দুর্বল বা সহযোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে।

তদন্তে উঠে আসা পুরো জালিয়াতি বা অর্থ চুরির প্রক্রিয়াটি ছিল যেমন সুনির্দিষ্ট, তেমনি অবিশ্বাস্য রকমের সহজ। শুরুতে একদল কাগুজে বা ভুয়া নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়, যাদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা বড় ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল না। এরপর এসব সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার ঋণ পাস করিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই ঋণের টাকা ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় বাহাত্তর শতাংশ শেয়ার কিনে নেওয়া হয় এবং রাতারাতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওপর পূর্ণ ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর একবার যখন ব্যাংকের চাবি তাদের হাতে চলে আসে, তখন অর্থের প্রবাহের পাইপলাইনটি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে চলতে শুরু করে। অর্থাৎ, ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা হাতে নিয়ে গ্রুপটি নিজেদের কাগুজে কোম্পানিগুলোর জন্য আরও ব্যাপক হারে ও সহজ শর্তে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা বরাদ্দ করতে থাকে। এভাবে সাধারণ মানুষের আমানতের অর্থ দিয়ে গঠিত পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তারের বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

বিএফআইইউ-র প্রতিবেদনে যে ভয়ঙ্কর চিত্রটি বর্ণনা করা হয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ করপোরেট অধিগ্রহণ বা শেয়ার ক্রয়ের ঘটনা নয়। এটি মূলত একটি দেশের আর্থিক খাতের নিয়ামক সংস্থাকে পুরোপুরি কবজা বা অকেজো করে ফেলার একটি ধ্রুপদী এবং ঐতিহাসিক উদাহরণ। যেখানে একটি চতুর ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিজস্ব মূলধন বা টাকা চুরির মাধ্যমে একটি ব্যাংক কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে সেই ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ অবাধে লুটপাট করে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় দেশের তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল অথবা ক্ষমতার প্রভাবে নিজেদের চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। বিএফআইইউ-র গভীর তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক এই প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী বাইশ জন প্রক্সি বা বেনামি শেয়ারহোল্ডার এবং সন্দেহভাজন বেশ কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

শেয়ার কেনার জন্য ব্যবহৃত অর্থের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। বিএফআইইউ নিশ্চিত করেছে যে, এই অর্থের একটি বিশাল অংশ ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া পূর্ববর্তী ঋণের মাধ্যমে জোগান দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, ব্যাংকের শেয়ার কেনা দুটি নামীদামি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের এক জটিল লেনদেনে এস আলম গ্রুপের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের সরাসরি জড়িত থাকার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারী দল। এই সব দালিলিক তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ তীব্রভাবে সন্দেহ করছে যে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ছদ্মবেশে শেয়ার কেনার পেছনেও এস আলমের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। যদি এই পুরো যোগসূত্রটি শতভাগ প্রমাণিত হয়, তবে ব্যাংকটিতে গ্রুপটির প্রকৃত মালিকানা দাঁড়াবে প্রায় একাশি দশমিক বিরানব্বই শতাংশ। তাই এস আলমের এই গোপন ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার পূর্ণ চিত্র উন্মোচনে আরও ব্যাপক, গভীর এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তদন্তের জোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ইতিমধ্যে এই সুনির্দিষ্ট জালিয়াতির ঘটনায় দেশের উচ্চ আদালত কঠোর রুল জারি করেছেন। আদালত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে জানতে চেয়েছেন যে, কীভাবে মাত্র চব্বিশটি ভুয়া ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা একাশি দশমিক বিরানব্বই শতাংশ শেয়ারকে আইনিভাবে বৈধ বলা যায় এবং কেন জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত এসব শেয়ার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হবে না। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ ক্রোক, তাদের সমস্ত ভোটাধিকার স্থগিত এবং জালিয়াতির সাথে জড়িত পরিচালকদের সব ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতে জমা দেওয়া বিএফআইইউ-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের শেয়ার কেনার সাথে সম্পর্কিত সমস্ত নথিপত্র, ভাউচার ও ডিজিটাল তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই তারা এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

এই বিশাল তদন্তে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ এবং নিউ এরা সিকিউরিটিজসহ বেশ কয়েকটি সহযোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত জমা ও ঋণ হিসাবের সমস্ত রেকর্ড, অনুমোদনের চিঠি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল তথ্য যাচাই করা হয়েছে। সংস্থাটির চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের বাহাত্তর দশমিক শূন্য সাত শতাংশ শেয়ারই সরাসরি এস আলম গ্রুপের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। শুরুর দিকে ব্যাংকটির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে এটি দখল বা একীভূত করার জন্য মূলত সাতটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার প্রতিটিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এস আলম গ্রুপের শীর্ষ কর্তাদের ইশারায় পরিচালিত হতো।

এর মধ্যে কেবল প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৭১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের ২ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার কেনে। তদন্ত অনুযায়ী, এই অর্থ প্রাথমিকভাবে এস আলম গ্রুপের একটি মূল সহযোগী প্রতিষ্ঠান– এস আলম সুপার এডিবল অয়েল-এর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের একটি অংশ মোমেন্টাম বিজনেস সেন্টার, এপিক অ্যাবল ট্রেডার্স, ইনভেনশন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আবদুল আউয়াল অ্যান্ড সন্স (পটিয়া), নবির ট্রেডিং এবং এক্সিস্টেন্স ট্রেড এজেন্সিসহ একাধিক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া ভুয়া ঋণের মাধ্যমে সমন্বয় বা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্ত অ্যাকাউন্ট ছিল এস আলমের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন প্রধান শাখায়। বিএফআইইউ এগুলোকে গ্রুপটির সহযোগী বা ভুয়া কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছে। তথ্য অনুযায়ী, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের ভাইস চেয়ারম্যান ও মনোনীত পরিচালক তানভীর আহমেদ সম্পর্কে এস আলমের আপন ভাগিনা।

প্রথম দিকে শেয়ার ধারণ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট— এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং-এর হিসাবের মাধ্যমে ৬ কোটি ৪৩ লাখ শেয়ার কেনে। এই লেনদেনের অর্থ সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে স্থানান্তর বা রাউটিং করা হয়। এক্সেল ডায়িংয়ের পরিচালক বদরুন্নেসা এবং ওয়াহিদুল আলম এস আলমের নিকটাত্মীয় হিসেবে সমাজ ও ব্যাংকিং খাতে চিহ্নিত হয়েছেন। অর্থ জোগান দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকটি আবার বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় লজ্জাজনকভাবে শীর্ষে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে একই ব্যাংকের জনগণের আমানতের ঋণ ব্যবহার করে সেই ব্যাংকেরই মালিকানা কেনা হয়েছিল। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে আর্মাডা স্পিনিং মিলসের হিসাবের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি ৩৭ লাখ শেয়ার ক্রয় করা হয়। এই অর্থ এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার থেকে অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি 'গ্রিন এক্সপোজ ট্রেডার্স' নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকেও বড় অংকের ঋণ নেওয়া হয়, যার পরিচালক জেসমিন আরশাদ হলেন এস আলমের শ্যালক মো. আরশাদের স্ত্রী।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের মাধ্যমে গ্র্যান্ড বিজনেস ৩ কোটি ২৫ লাখ শেয়ার কেনে, যার সমস্ত অর্থ এসেছিল এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে এবিসি ভেঞ্চারস কেনে ২ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার, যার অর্থায়ন করে এস আলমের আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান সোনালী ট্রেডার্স। একইভাবে প্লাটিনাম এনডেভারস ৩ কোটি ২২ লাখ শেয়ার কেনে এবং এই অর্থ এস আলম স্টিলস, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, জেনেসিস টেক্সটাইলস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস, এস আলম প্রপার্টিজ এবং এস আলম অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে রাউটিং করা হয়। অর্থের একটি অংশ প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের বিও অ্যাকাউন্ট থেকেও এসেছিল। এর পরিচালক মোস্তান বিল্লাহ আদিল হলেন এস আলমের ভাতিজা। প্রাথমিক পর্যায়ে শেয়ার ধারণ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান—ব্লু ইন্টারন্যাশনাল—ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে ৩ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে। এর অর্থ স্থানান্তর করা হয় সোনালী ট্রেডার্স, চেমন ইস্পাত, এস আলম স্টিলস, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, এস আলম প্রপার্টিজ এবং জেনেসিস টেক্সটাইলসের হিসাবের মাধ্যমে। যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ব্লু ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান এস আলমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং তার জামাতার মালিকানাধীন ইউনিটেক্স গ্রুপের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

তদন্তে আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ২০১৭ সালে একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ও চাপ সৃষ্টিকারী সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের পুরো নিয়ন্ত্রণ জোরপূর্বক কেড়ে নেয় এস আলম গ্রুপ। শুরুতে যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনা হয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে এমন কিছু কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়, যারা এই ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকে পরিণত হয়েছিল এবং ব্যাংকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এরমধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ ও গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাইফুল আলমের পাশাপাশি আছেন তার ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ। এছাড়া সাইফুল আলমের একাধিক ভাই এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসব কোম্পানির মালিকানায় থেকে ঋণ লুটপাটের মহোৎসবে মেতেছিলেন।

ব্যাংকের অফিশিয়াল তথ্যানুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে এবং বর্তমানে ব্যাংকটিতে এ প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণেও শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এই কোম্পানি থেকেও বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এরপর এস আলম রিফাইন্ড সুগারের খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি, সোনালী ট্রেডার্সের চার হাজার ৮৫৩ কোটি এবং এস আলমের মা চেমন আরার নামে করা কোম্পানি চেমন ইস্পাতের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি থেকেই শেয়ার ক্রয়ের সময় অবৈধভাবে অর্থ সরানো হয়েছিল। এছাড়া শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলসের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের এক হাজার ৭৮৩ কোটি এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের এক হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যেটি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয় আনসারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠী বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমতি ছাড়া সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ এবং অনুমতিসহ কোনোভাবেই সর্বোচ্চ দশ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। কিন্তু এস আলম গ্রুপ সমস্ত আইন ও রেগুলেশন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যাংকের বাহাত্তর শতাংশের বেশি শেয়ার নিজেদের দখলে নিয়েছে। উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত রিটের পেক্ষিতে এই অবৈধ শেয়ারগুলোর ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট ভুয়া শেয়ারহোল্ডারদের পরিচালনা পর্ষদে বসার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো, জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত এই শেয়ারগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে এই লুটেরা গ্রুপ থেকে ব্যাংকের পাওনা অর্থ উদ্ধার করা এবং সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয় ও দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল