দিকপাল

সাত রাস্তার মিলনস্থলে যে পার্ক বহন করছে সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতি


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৫:০৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

সাত রাস্তার মিলনস্থলে যে পার্ক বহন করছে সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতি

রাজধানী পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ৮৫ দশমিক ৩ কাঠার ছায়াসুনিবিড় বাহাদুর শাহ পার্ক কেবল একটি উন্মুক্ত উদ্যান নয়, বরং এটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ঢাকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। চার দিক থেকে বিস্তৃত সাতটি সড়ক যেখানে মিলিত হয়েছে—শাঁখারীবাজার, রায়সাহেব বাজার, লক্ষ্মীবাজার ও সদরঘাটের সেই মিলনস্থলে পার্কটি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ঢাকায় প্রভাবশালী আর্মেনীয়দের উদ্যোগে এখানে একটি ক্লাব ঘর নির্মাণ করা হয়। সেখানে বিলিয়ার্ড খেলার ডিম্বাকৃতির চীনা মাটির বলগুলোকে স্থানীয় ঢাকাইয়ারা 'আণ্ডা' বা 'আন্টা' নামে ডাকতেন; সেখান থেকেই স্থানটির নাম হয় 'আন্টাঘর ময়দান'। পরবর্তী সময়ে ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে শাসনভার হস্তান্তরের ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন এই পার্কে পাঠ করা হলে এর নাম রাখা হয় 'ভিক্টোরিয়া পার্ক'। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫৮ সালে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্তিতে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে পার্কটির নাম পুনর্নির্ধারণ করা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'।

১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা লালবাগ দুর্গের দেশীয় 'কালা সিপাহি'রা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই অসম যুদ্ধে বহু সিপাহি শাহাদাত বরণ করেন এবং গ্রেপ্তারকৃতদের ওপর চালানো হয় প্রহসনমূলক বিচার। ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ইংরেজ শাসকগণ ২৬ ও ২৮ নভেম্বরে কফুর খাঁ, দীন দয়াল মিশ্র ও হোসেন বক্সসহ বন্দী সিপাহিদের আন্টাঘর ময়দানের গাছে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়। জনমনে শিক্ষা দিতে মৃতদেহগুলো না নামিয়ে দীর্ঘদিন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

পার্কে শহীদ সিপাহিদের স্মরণে ১৯৫৮ সালে নির্মিত গম্বুজাকৃতির একটি চতুষ্কোণ স্মৃতিসৌধ রয়েছে। এছাড়া রানির স্মরণে নবাব পরিবারের নির্মিত একটি শ্বেতপাথরের উঁচু ওবেলিস্ক এবং ১৮৮৪ সালে প্রয়াত নবাবপুত্র খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত গ্রানাইট পাথরের স্মৃতিস্তম্ভটি আজও পার্কের ভেতরে দৃশ্যমান।

১৯২০-এর দশকে বিলাতি পণ্য বর্জন ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই পার্কটি রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক ২০২০ সালে আধুনিকায়নের পর পার্কটিতে দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ, অ্যাম্ফিথিয়েটার, সবুজ উদ্যান ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থী পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্যচর্চা ও অবসরের জন্য সমবেত হন।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সাত রাস্তার মিলনস্থলে যে পার্ক বহন করছে সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতি

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

রাজধানী পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ৮৫ দশমিক ৩ কাঠার ছায়াসুনিবিড় বাহাদুর শাহ পার্ক কেবল একটি উন্মুক্ত উদ্যান নয়, বরং এটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ঢাকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। চার দিক থেকে বিস্তৃত সাতটি সড়ক যেখানে মিলিত হয়েছে—শাঁখারীবাজার, রায়সাহেব বাজার, লক্ষ্মীবাজার ও সদরঘাটের সেই মিলনস্থলে পার্কটি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ঢাকায় প্রভাবশালী আর্মেনীয়দের উদ্যোগে এখানে একটি ক্লাব ঘর নির্মাণ করা হয়। সেখানে বিলিয়ার্ড খেলার ডিম্বাকৃতির চীনা মাটির বলগুলোকে স্থানীয় ঢাকাইয়ারা 'আণ্ডা' বা 'আন্টা' নামে ডাকতেন; সেখান থেকেই স্থানটির নাম হয় 'আন্টাঘর ময়দান'। পরবর্তী সময়ে ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে শাসনভার হস্তান্তরের ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন এই পার্কে পাঠ করা হলে এর নাম রাখা হয় 'ভিক্টোরিয়া পার্ক'। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫৮ সালে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্তিতে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে পার্কটির নাম পুনর্নির্ধারণ করা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'।

১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা লালবাগ দুর্গের দেশীয় 'কালা সিপাহি'রা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই অসম যুদ্ধে বহু সিপাহি শাহাদাত বরণ করেন এবং গ্রেপ্তারকৃতদের ওপর চালানো হয় প্রহসনমূলক বিচার। ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ইংরেজ শাসকগণ ২৬ ও ২৮ নভেম্বরে কফুর খাঁ, দীন দয়াল মিশ্র ও হোসেন বক্সসহ বন্দী সিপাহিদের আন্টাঘর ময়দানের গাছে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়। জনমনে শিক্ষা দিতে মৃতদেহগুলো না নামিয়ে দীর্ঘদিন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

পার্কে শহীদ সিপাহিদের স্মরণে ১৯৫৮ সালে নির্মিত গম্বুজাকৃতির একটি চতুষ্কোণ স্মৃতিসৌধ রয়েছে। এছাড়া রানির স্মরণে নবাব পরিবারের নির্মিত একটি শ্বেতপাথরের উঁচু ওবেলিস্ক এবং ১৮৮৪ সালে প্রয়াত নবাবপুত্র খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত গ্রানাইট পাথরের স্মৃতিস্তম্ভটি আজও পার্কের ভেতরে দৃশ্যমান।

১৯২০-এর দশকে বিলাতি পণ্য বর্জন ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই পার্কটি রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক ২০২০ সালে আধুনিকায়নের পর পার্কটিতে দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ, অ্যাম্ফিথিয়েটার, সবুজ উদ্যান ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থী পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্যচর্চা ও অবসরের জন্য সমবেত হন।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল