দিকপাল

ঘরোয়া প্রবাসী: দেশের মাটিতেই প্রবাসজীবন, গার্মেন্টস কর্মীদের অন্য এক বাস্তবতা


মোঃ রফিকুল ইসলাম
মোঃ রফিকুল ইসলাম স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘরোয়া প্রবাসী: দেশের মাটিতেই প্রবাসজীবন, গার্মেন্টস কর্মীদের অন্য এক বাস্তবতা

প্রবাসে পাড়ি না জমিয়েও যাঁদের হাত ধরে দেশে আসে বৈদেশিক মুদ্রা, যাঁদের তৈরি পোশাক পৌঁছে যায় বিশ্ববাজারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মজীবন। তাঁদের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি পোশাক পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, আর সেই রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে থাকা মানুষগুলোর নিজেদের জীবন কতটা স্বচ্ছন্দ?

জীবিকার তাগিদে অনেক শ্রমিক নিজের গ্রাম, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া কিংবা নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে। ছোট্ট ভাড়া ঘরে বসবাস, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং মাস শেষে পরিবারের খরচ বহনের দায়িত্ব—এসব নিয়েই তাঁদের প্রতিদিনের জীবন।

তাঁরা বিদেশে যাননি, কিন্তু অনেকের জীবন যেন প্রবাসীদের মতো। পরিবার থাকে গ্রামের বাড়িতে, আর তাঁরা পড়ে থাকেন কর্মস্থলের শহরে। এই বাস্তবতা থেকেই তাঁদের পরিচয় দেওয়া যায়—ঘরোয়া প্রবাসী।

বাংলাদেশের পোশাক বিদেশের বাজারে পৌঁছালেও সেই পোশাক তৈরির কারিগরদের জীবন অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। প্রবাসীরা বিদেশে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, আর গার্মেন্টস কর্মীরা দেশের মাটিতে শ্রম দিয়ে রপ্তানি আয়ের পথ তৈরি করেন। অবদানের ধরন আলাদা হলেও দেশের অর্থনীতিতে উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে গার্মেন্টস কর্মীদের অন্যতম বড় সংকট হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য। ২০২৩ সালে নির্ধারিত সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই আয়ে সংসার চালানো অনেক শ্রমিকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

৬ নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আশুলিয়া ও সাভারের কিছু এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। অনেক কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও কিছু কারখানা সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

সরকার নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন কাঠামো কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে এবং জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন বেতন পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে নতুন সর্বনিম্ন বেতনের চূড়ান্ত অঙ্ক এখনো ঘোষণা হয়নি।

প্রতিটি শ্রমিকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, কিছু দায়িত্ব এবং অসংখ্য স্বপ্ন। কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চান, কেউ বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসার খরচ জোগান, আবার কেউ নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখেন।

দিনভর পরিশ্রমের পর ছোট্ট ভাড়া ঘরে ফিরে পরিবারের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলাই হয়তো তাঁদের দিনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত।

তাঁদের প্রয়োজন শুধু একটি চাকরি নয়; প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সময়মতো বেতন, চিকিৎসাসুবিধা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা।

আমরা প্রবাসীদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। একইভাবে দেশের মাটিতে থেকে বিদেশের বাজারের জন্য পোশাক তৈরি করা শ্রমিকদের অবদানও যথাযথ মর্যাদা পাওয়া উচিত।

তাঁরা বিদেশে যান না, কিন্তু তাঁদের শ্রম পৌঁছে যায় সারা বিশ্বে। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান পণ্য। অথচ সেই মানুষগুলোর নিজেদের জীবনেই রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রাম।

তাঁদের করুণা নয়, প্রয়োজন প্রাপ্য সম্মান। তাঁদের অবহেলা নয়, প্রয়োজন ন্যায্য অধিকার।

কারণ, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই উন্নয়নের কারিগররাও সম্মান ও স্বচ্ছলতার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।

তাঁরাই আমাদের ঘরোয়া প্রবাসী।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬


ঘরোয়া প্রবাসী: দেশের মাটিতেই প্রবাসজীবন, গার্মেন্টস কর্মীদের অন্য এক বাস্তবতা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

প্রবাসে পাড়ি না জমিয়েও যাঁদের হাত ধরে দেশে আসে বৈদেশিক মুদ্রা, যাঁদের তৈরি পোশাক পৌঁছে যায় বিশ্ববাজারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মজীবন। তাঁদের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি পোশাক পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, আর সেই রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে থাকা মানুষগুলোর নিজেদের জীবন কতটা স্বচ্ছন্দ?

জীবিকার তাগিদে অনেক শ্রমিক নিজের গ্রাম, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া কিংবা নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে। ছোট্ট ভাড়া ঘরে বসবাস, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং মাস শেষে পরিবারের খরচ বহনের দায়িত্ব—এসব নিয়েই তাঁদের প্রতিদিনের জীবন।

তাঁরা বিদেশে যাননি, কিন্তু অনেকের জীবন যেন প্রবাসীদের মতো। পরিবার থাকে গ্রামের বাড়িতে, আর তাঁরা পড়ে থাকেন কর্মস্থলের শহরে। এই বাস্তবতা থেকেই তাঁদের পরিচয় দেওয়া যায়—ঘরোয়া প্রবাসী।

বাংলাদেশের পোশাক বিদেশের বাজারে পৌঁছালেও সেই পোশাক তৈরির কারিগরদের জীবন অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। প্রবাসীরা বিদেশে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, আর গার্মেন্টস কর্মীরা দেশের মাটিতে শ্রম দিয়ে রপ্তানি আয়ের পথ তৈরি করেন। অবদানের ধরন আলাদা হলেও দেশের অর্থনীতিতে উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে গার্মেন্টস কর্মীদের অন্যতম বড় সংকট হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য। ২০২৩ সালে নির্ধারিত সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই আয়ে সংসার চালানো অনেক শ্রমিকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

৬ নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আশুলিয়া ও সাভারের কিছু এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। অনেক কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও কিছু কারখানা সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

সরকার নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন কাঠামো কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে এবং জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন বেতন পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে নতুন সর্বনিম্ন বেতনের চূড়ান্ত অঙ্ক এখনো ঘোষণা হয়নি।

প্রতিটি শ্রমিকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, কিছু দায়িত্ব এবং অসংখ্য স্বপ্ন। কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চান, কেউ বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসার খরচ জোগান, আবার কেউ নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখেন।

দিনভর পরিশ্রমের পর ছোট্ট ভাড়া ঘরে ফিরে পরিবারের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলাই হয়তো তাঁদের দিনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত।

তাঁদের প্রয়োজন শুধু একটি চাকরি নয়; প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সময়মতো বেতন, চিকিৎসাসুবিধা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা।

আমরা প্রবাসীদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। একইভাবে দেশের মাটিতে থেকে বিদেশের বাজারের জন্য পোশাক তৈরি করা শ্রমিকদের অবদানও যথাযথ মর্যাদা পাওয়া উচিত।

তাঁরা বিদেশে যান না, কিন্তু তাঁদের শ্রম পৌঁছে যায় সারা বিশ্বে। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান পণ্য। অথচ সেই মানুষগুলোর নিজেদের জীবনেই রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রাম।

তাঁদের করুণা নয়, প্রয়োজন প্রাপ্য সম্মান। তাঁদের অবহেলা নয়, প্রয়োজন ন্যায্য অধিকার।

কারণ, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই উন্নয়নের কারিগররাও সম্মান ও স্বচ্ছলতার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।

তাঁরাই আমাদের ঘরোয়া প্রবাসী।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল