দিকপাল

ঢাকার পুরো ১ বছরের বৃষ্টি যেখানে ঝরে পড়ে মাত্র এক দিনে


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ | ০৪:০৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার পুরো ১ বছরের বৃষ্টি যেখানে ঝরে পড়ে মাত্র এক দিনে

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর রূপ হলো বৃষ্টিপাত। ঋতুভেদে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি হলেও এমন কিছু নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, যেখানে মেঘেদের স্থায়ী বসবাস এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অবস্থান ও বায়ুপ্রবাহের কারণে কিছু অঞ্চল বৈশ্বিক অতিবৃষ্টির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ সেইসব অঞ্চলের আবহাওয়ার খতিয়ান তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘আর্দ্র’ বা ‘ভেজা’ স্থান হিসেবে পরিচিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি গ্রাম ‘মৌসিনরাম’। খাসি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গ্রামে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৮৭১ মিলিমিটার (প্রায় ৩৯ ফুট)। বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা তীব্র জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু খাসি পাহাড়ের দেয়ালে বাধা পেয়ে দ্রুত ঘনীভূত হয় এবং এখানে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ে। এখানকার বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হলেই বাঁশ ও কলার পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের ছাতা (স্থানীয় ভাষায় ‘কনুপ’) ব্যবহার করেন।

বর্তমানে গড় বৃষ্টিপাতে মৌসিনরামের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও, আধুনিক আবহাওয়ার ইতিহাসে এক মাসে ও এক বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের সর্বকালের রেকর্ডটি চেরাপুঞ্জির দখলেই রয়েছে। ১৮৬০ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৮৬১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২ মাসে চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড ২৬ thousand ৪৭০ মিলিমিটার (৮৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি ১৮৬১ সালের জুলাই মাসে একক কোনো মাস হিসেবে এখানে সর্বোচ্চ ৯ thousand ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। বনায়ন হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চেরাপুঞ্জিতে এখন বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও ইতিহাসের পাতায় এর রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ন।

২৪ ঘণ্টায় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড দেখতে চোখ ফেরাতে হবে ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ফরাসি দ্বীপ রেউনিওঁ-র দিকে। ১৯৬৬ সালের ৭ থেকে ৮ জানুয়ারি এই দ্বীপে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘ডেনিস’। সেসময় দ্বীপের ফক-ফক নামক স্থানে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ thousand ৮২৫ মিলিমিটার (প্রায় ৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে ঘূর্ণিঝড় ‘হাইসিনথ’-এর প্রভাবে রেউনিওঁর কমরসন নামক স্থানে মাত্র ১৫ দিনে ৬ thousand ৪৩৩ মিলিমিটার (২১ ফুট) বৃষ্টি হয়েছিল, যা বিশ্ব আবহাওয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার চোকো ডিপার্টমেন্টের অন্তর্গত ললো ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের লোপেজ ডি মিকাই অঞ্চল দুটিকে মৌসিনরামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলা চলে। ললো অঞ্চলে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১২ thousand ৭১৮ মিলিমিটার (প্রায় ৪২ ফুট)। আন্দিজ পর্বতমালার আর্দ্র বায়ু প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাসকে আটকে দেওয়ার ফলে এখানে প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের পর বা রাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত কাউয়াই দ্বীপের একটি আগ্নেয় পর্বত হলো মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে। স্থানীয় ভাষায় ওয়ায়ালেয়ালে শব্দের অর্থ হলো ‘উতলে ওঠে পানি’। নামের সার্থকতা প্রমাণ করতেই যেন এই পাহাড়ি অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় ১১ thousand ৫০০ মিলিমিটার (প্রায় ৩৮ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৫০ দিনই এখানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়ে থাকে।

আমাদের চিরচেনা বাংলাদেশে বর্ষাকালে যখন টানা তিন-চারদিন বৃষ্টি হয়, তাতেই চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করে। অথচ বৈশ্বিক এই রেকর্ডগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের গড় বৃষ্টিপাত অনেক কম। বাংলাদেশে বছরে গড়ে বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ২ thousand ৩০০ মিলিমিটার। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা সিলেটের লালাখালে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৪ thousand ১৮০ মিলিমিটার (প্রায় ১৪ ফুট)। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চল মৌসিনরামের তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম। এমনকি রেউনিওঁ দ্বীপে মাত্র ১ দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি (১ thousand ৮২৫ মি.মি.) হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পুরো ১ বছরের গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় কাছাকাছি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬


ঢাকার পুরো ১ বছরের বৃষ্টি যেখানে ঝরে পড়ে মাত্র এক দিনে

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর রূপ হলো বৃষ্টিপাত। ঋতুভেদে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি হলেও এমন কিছু নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, যেখানে মেঘেদের স্থায়ী বসবাস এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অবস্থান ও বায়ুপ্রবাহের কারণে কিছু অঞ্চল বৈশ্বিক অতিবৃষ্টির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ সেইসব অঞ্চলের আবহাওয়ার খতিয়ান তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘আর্দ্র’ বা ‘ভেজা’ স্থান হিসেবে পরিচিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি গ্রাম ‘মৌসিনরাম’। খাসি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গ্রামে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৮৭১ মিলিমিটার (প্রায় ৩৯ ফুট)। বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা তীব্র জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু খাসি পাহাড়ের দেয়ালে বাধা পেয়ে দ্রুত ঘনীভূত হয় এবং এখানে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ে। এখানকার বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হলেই বাঁশ ও কলার পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের ছাতা (স্থানীয় ভাষায় ‘কনুপ’) ব্যবহার করেন।

বর্তমানে গড় বৃষ্টিপাতে মৌসিনরামের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও, আধুনিক আবহাওয়ার ইতিহাসে এক মাসে ও এক বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের সর্বকালের রেকর্ডটি চেরাপুঞ্জির দখলেই রয়েছে। ১৮৬০ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৮৬১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২ মাসে চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড ২৬ thousand ৪৭০ মিলিমিটার (৮৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি ১৮৬১ সালের জুলাই মাসে একক কোনো মাস হিসেবে এখানে সর্বোচ্চ ৯ thousand ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। বনায়ন হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চেরাপুঞ্জিতে এখন বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও ইতিহাসের পাতায় এর রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ন।

২৪ ঘণ্টায় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড দেখতে চোখ ফেরাতে হবে ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ফরাসি দ্বীপ রেউনিওঁ-র দিকে। ১৯৬৬ সালের ৭ থেকে ৮ জানুয়ারি এই দ্বীপে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘ডেনিস’। সেসময় দ্বীপের ফক-ফক নামক স্থানে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ thousand ৮২৫ মিলিমিটার (প্রায় ৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে ঘূর্ণিঝড় ‘হাইসিনথ’-এর প্রভাবে রেউনিওঁর কমরসন নামক স্থানে মাত্র ১৫ দিনে ৬ thousand ৪৩৩ মিলিমিটার (২১ ফুট) বৃষ্টি হয়েছিল, যা বিশ্ব আবহাওয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার চোকো ডিপার্টমেন্টের অন্তর্গত ললো ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের লোপেজ ডি মিকাই অঞ্চল দুটিকে মৌসিনরামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলা চলে। ললো অঞ্চলে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১২ thousand ৭১৮ মিলিমিটার (প্রায় ৪২ ফুট)। আন্দিজ পর্বতমালার আর্দ্র বায়ু প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাসকে আটকে দেওয়ার ফলে এখানে প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের পর বা রাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত কাউয়াই দ্বীপের একটি আগ্নেয় পর্বত হলো মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে। স্থানীয় ভাষায় ওয়ায়ালেয়ালে শব্দের অর্থ হলো ‘উতলে ওঠে পানি’। নামের সার্থকতা প্রমাণ করতেই যেন এই পাহাড়ি অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় ১১ thousand ৫০০ মিলিমিটার (প্রায় ৩৮ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৫০ দিনই এখানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়ে থাকে।

আমাদের চিরচেনা বাংলাদেশে বর্ষাকালে যখন টানা তিন-চারদিন বৃষ্টি হয়, তাতেই চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করে। অথচ বৈশ্বিক এই রেকর্ডগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের গড় বৃষ্টিপাত অনেক কম। বাংলাদেশে বছরে গড়ে বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ২ thousand ৩০০ মিলিমিটার। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা সিলেটের লালাখালে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৪ thousand ১৮০ মিলিমিটার (প্রায় ১৪ ফুট)। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চল মৌসিনরামের তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম। এমনকি রেউনিওঁ দ্বীপে মাত্র ১ দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি (১ thousand ৮২৫ মি.মি.) হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পুরো ১ বছরের গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় কাছাকাছি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল