কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।সকালের নাশতার টেবিল থেকে শুরু করে অফিস, হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কৃষকের মাঠ পর্যন্ত এর উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে এআই দিয়ে অ্যাসাইনমেন্টের খসড়া তৈরি করছে, বাবা অফিসের রিপোর্ট সংক্ষিপ্ত করছেন, মা নতুন রান্নার রেসিপি জানতে চাইছেন, আর স্কুলপড়ুয়া মেয়ে বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্য ছবি বানাচ্ছে—এভাবেই এআই আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও এআই ছিল প্রযুক্তিবিদদের গবেষণাগারের বিষয়, কিন্তু এখন এটি ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আমরা অনেকেই প্রতিদিন এআই ব্যবহার করছি, কখনো বুঝে, কখনো না বুঝেই। আগে আমরা গুগলে লিখতাম, 'ঢাকায় আজ বৃষ্টি হবে কি?' এখন এআইকে জিজ্ঞেস করি, 'আজ বিকেলে বের হলে ছাতা নেওয়া উচিত হবে?' আগে আমরা উত্তর খুঁজতাম, এখন আমরা কথোপকথন করি। পরিবর্তনটা এত দ্রুত হয়েছে যে আমরা বুঝে ওঠার আগেই এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
গত ঈদের আগে ঢাকার একটি শপিং মলে এক তরুণীকে দেখা গেল, যিনি এআই-কে জিজ্ঞেস করছিলেন কোন শাড়ির রংটা তাকে বেশি মানাবে। অন্যদিকে নীলফামারীর এক কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আজ ধান কাটবেন কি না। একই প্রযুক্তি কিন্তু ব্যবহারকারীরা একেবারে ভিন্ন—এটাই এআইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে এই নতুন অতিথিকে ঘরে জায়গা দেওয়ার আগে আমরা তাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করিনি। তিনি কে, কোথা থেকে এলেন, তাঁকে কতটা বিশ্বাস করা যায়—এই প্রশ্নগুলো আমরা করিনি।
এআই এখন শুধু আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, ধীরে ধীরে আমাদের সিদ্ধান্তেও অংশ নিতে শুরু করেছে। কোন বিজ্ঞাপনটি আমরা দেখব, কোন ভিডিওটি সামনে আসবে, অনলাইন দোকানে কোন পণ্যটি দেখানো হবে—এসবের পেছনেও অদৃশ্য কিছু সিদ্ধান্ত কাজ করছে। এগুলো হয়তো ছোট সিদ্ধান্ত, কিন্তু সব সিদ্ধান্ত ছোট থাকবে না। এআই একদিন মানুষের সব কাজ করে ফেলবে—এমন ধারণা থাকলেও ইতিহাস অন্য কথা বলে। ক্যালকুলেটর আসার পর গণিত শেষ হয়ে যায়নি, কম্পিউটার আসার পর অফিস বন্ধ হয়নি, ইন্টারনেট আসার পর বই হারিয়ে যায়নি। মানুষ নতুনভাবে কাজ করতে শিখেছে, আর এআই-ও সম্ভবত সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি অধ্যায়।
এখানে আসে এআইয়ের সুশাসনের প্রশ্ন। 'সুশাসন' শুনলে বিষয়টি ভারী মনে হতে পারে, কিন্তু ধারণাটি খুব সাধারণ। রাস্তায় গাড়ি চালানোর নিয়ম করি বলে আমরা গাড়ির বিরোধী হই না, বরং নিয়ম থাকলেই সবাই তুলনামূলক নিরাপদে চলতে পারি। এআইয়ের সুশাসনও তেমন—প্রযুক্তিকে থামানো নয়, বরং এমনভাবে এগোনো যাতে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। এআই সব সময় সঠিক নয়; অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল উত্তর দিতে পারে। আত্মবিশ্বাস আর সত্য এক জিনিস নয়। এআই মানুষের দেওয়া তথ্য থেকে শেখে, তাই তথ্য অসম্পূর্ণ বা পক্ষপাতমূলক হলে সিদ্ধান্তেও তা প্রতিফলিত হবে।
বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের প্রশ্ন শুধু 'আমরা কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করব' তা নয়, বরং 'সেই প্রযুক্তি আমাদের ভাষা, মানুষ ও বাস্তবতাকে কতটা বুঝবে'—সেটাই প্রধান। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও একটি বড় উদ্বেগ। এখন খুব সহজেই বিভিন্ন অ্যাপে নিজের ছবি, কণ্ঠস্বর, অবস্থান, পছন্দ-অপছন্দের তথ্য দিচ্ছি আমরা। কিন্তু সেই তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কত দিন থাকবে, অন্য কোনো কাজে ব্যবহার হবে কি না—এসব আমরা জানি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–নির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি ভুয়া ছবি বা ভিডিও নির্বাচন, দুর্ঘটনা কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়ে কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
শিক্ষার ক্ষেত্রে এআই অসাধারণ সহায়ক, কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু উত্তর পাওয়া নয়, উত্তর খুঁজে বের করার ক্ষমতা তৈরি করা। একজন শিক্ষার্থী যদি এআইয়ের উত্তর জমা দেওয়ার আগে প্রশ্ন করতে শেখে—'উত্তরটি কি ঠিক? কেন ঠিক?'—তাহলেই প্রযুক্তি তার শেখার শক্তি বাড়াবে। স্বাস্থ্যসেবায় এআই চিকিৎসকের শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে, কিন্তু রোগীর পারিবারিক ইতিহাস, আর্থিক বাস্তবতা, ভয়-উদ্বেগ—এসব দেখার ক্ষমতা নেই এআইয়ের। তাই এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়, সহযোগী মাত্র।
বাংলাদেশের সামনে এআই নিয়ে বড় সুযোগ রয়েছে—কৃষিতে ফসলের রোগ আগাম শনাক্ত করা, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, যানজট বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিল্প উৎপাদনে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে এআই। তবে এআই শুধু প্রযুক্তির প্রকল্প নয়, এটি সমাজেরও প্রকল্প। প্রযুক্তিতে যারা আমাদের আগে এগিয়েছে, তারা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, মানুষের আচরণ বিশ্লেষণে অনেক ভুল করেছে—অন্যদের ভুল থেকে শেখা পিছিয়ে থাকা নয়, বুদ্ধিমানের মতো এগোনো।
আমাদের তাই এআই ব্যবহারের পাশাপাশি এআই সাক্ষরতাও বাড়াতে হবে। কখন প্রযুক্তিকে বিশ্বাস করব, কখন প্রশ্ন করব, আর কখন মানুষের সিদ্ধান্ত চাইব—এটা জানতে হবে। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবার—সবার এই দায়িত্ব। হয়তো আগামী দিনে একটি শিশুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল শিক্ষা হবে—'এআই উত্তর দিয়েছে, এবার তুমি ভেবে দেখো উত্তরটি ঠিক কি না'। কয়েক বছর পর আমাদের সন্তানরা জিজ্ঞেস করবে, 'তোমাদের সময়ে এআই এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তোমরা কী করেছিলে?' আমরা যেন বলতে পারি—আমরা প্রযুক্তিকে ভয় পাইনি, আবার অন্ধভাবে বিশ্বাসও করিনি। আমরা প্রশ্ন করেছি, শিখেছি, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি এবং মানুষকে কেন্দ্র করেই প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছি। কারণ, ভবিষ্যতের সবচেয়ে উন্নত সমাজ সেই সমাজ নয় যেখানে সবচেয়ে বুদ্ধিমান যন্ত্র আছে, বরং সেই সমাজ, যেখানে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও মানবিকতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির নাম—মানুষ।
ড. তাহসিনা ফারাহ সনম, অধ্যাপক ও এআই গবেষক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি, বুয়েট-এর এই মতামত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে।

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।সকালের নাশতার টেবিল থেকে শুরু করে অফিস, হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কৃষকের মাঠ পর্যন্ত এর উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে এআই দিয়ে অ্যাসাইনমেন্টের খসড়া তৈরি করছে, বাবা অফিসের রিপোর্ট সংক্ষিপ্ত করছেন, মা নতুন রান্নার রেসিপি জানতে চাইছেন, আর স্কুলপড়ুয়া মেয়ে বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্য ছবি বানাচ্ছে—এভাবেই এআই আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও এআই ছিল প্রযুক্তিবিদদের গবেষণাগারের বিষয়, কিন্তু এখন এটি ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আমরা অনেকেই প্রতিদিন এআই ব্যবহার করছি, কখনো বুঝে, কখনো না বুঝেই। আগে আমরা গুগলে লিখতাম, 'ঢাকায় আজ বৃষ্টি হবে কি?' এখন এআইকে জিজ্ঞেস করি, 'আজ বিকেলে বের হলে ছাতা নেওয়া উচিত হবে?' আগে আমরা উত্তর খুঁজতাম, এখন আমরা কথোপকথন করি। পরিবর্তনটা এত দ্রুত হয়েছে যে আমরা বুঝে ওঠার আগেই এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
গত ঈদের আগে ঢাকার একটি শপিং মলে এক তরুণীকে দেখা গেল, যিনি এআই-কে জিজ্ঞেস করছিলেন কোন শাড়ির রংটা তাকে বেশি মানাবে। অন্যদিকে নীলফামারীর এক কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আজ ধান কাটবেন কি না। একই প্রযুক্তি কিন্তু ব্যবহারকারীরা একেবারে ভিন্ন—এটাই এআইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে এই নতুন অতিথিকে ঘরে জায়গা দেওয়ার আগে আমরা তাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করিনি। তিনি কে, কোথা থেকে এলেন, তাঁকে কতটা বিশ্বাস করা যায়—এই প্রশ্নগুলো আমরা করিনি।
এআই এখন শুধু আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, ধীরে ধীরে আমাদের সিদ্ধান্তেও অংশ নিতে শুরু করেছে। কোন বিজ্ঞাপনটি আমরা দেখব, কোন ভিডিওটি সামনে আসবে, অনলাইন দোকানে কোন পণ্যটি দেখানো হবে—এসবের পেছনেও অদৃশ্য কিছু সিদ্ধান্ত কাজ করছে। এগুলো হয়তো ছোট সিদ্ধান্ত, কিন্তু সব সিদ্ধান্ত ছোট থাকবে না। এআই একদিন মানুষের সব কাজ করে ফেলবে—এমন ধারণা থাকলেও ইতিহাস অন্য কথা বলে। ক্যালকুলেটর আসার পর গণিত শেষ হয়ে যায়নি, কম্পিউটার আসার পর অফিস বন্ধ হয়নি, ইন্টারনেট আসার পর বই হারিয়ে যায়নি। মানুষ নতুনভাবে কাজ করতে শিখেছে, আর এআই-ও সম্ভবত সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি অধ্যায়।
এখানে আসে এআইয়ের সুশাসনের প্রশ্ন। 'সুশাসন' শুনলে বিষয়টি ভারী মনে হতে পারে, কিন্তু ধারণাটি খুব সাধারণ। রাস্তায় গাড়ি চালানোর নিয়ম করি বলে আমরা গাড়ির বিরোধী হই না, বরং নিয়ম থাকলেই সবাই তুলনামূলক নিরাপদে চলতে পারি। এআইয়ের সুশাসনও তেমন—প্রযুক্তিকে থামানো নয়, বরং এমনভাবে এগোনো যাতে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। এআই সব সময় সঠিক নয়; অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল উত্তর দিতে পারে। আত্মবিশ্বাস আর সত্য এক জিনিস নয়। এআই মানুষের দেওয়া তথ্য থেকে শেখে, তাই তথ্য অসম্পূর্ণ বা পক্ষপাতমূলক হলে সিদ্ধান্তেও তা প্রতিফলিত হবে।
বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের প্রশ্ন শুধু 'আমরা কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করব' তা নয়, বরং 'সেই প্রযুক্তি আমাদের ভাষা, মানুষ ও বাস্তবতাকে কতটা বুঝবে'—সেটাই প্রধান। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও একটি বড় উদ্বেগ। এখন খুব সহজেই বিভিন্ন অ্যাপে নিজের ছবি, কণ্ঠস্বর, অবস্থান, পছন্দ-অপছন্দের তথ্য দিচ্ছি আমরা। কিন্তু সেই তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কত দিন থাকবে, অন্য কোনো কাজে ব্যবহার হবে কি না—এসব আমরা জানি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–নির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি ভুয়া ছবি বা ভিডিও নির্বাচন, দুর্ঘটনা কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়ে কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
শিক্ষার ক্ষেত্রে এআই অসাধারণ সহায়ক, কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু উত্তর পাওয়া নয়, উত্তর খুঁজে বের করার ক্ষমতা তৈরি করা। একজন শিক্ষার্থী যদি এআইয়ের উত্তর জমা দেওয়ার আগে প্রশ্ন করতে শেখে—'উত্তরটি কি ঠিক? কেন ঠিক?'—তাহলেই প্রযুক্তি তার শেখার শক্তি বাড়াবে। স্বাস্থ্যসেবায় এআই চিকিৎসকের শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে, কিন্তু রোগীর পারিবারিক ইতিহাস, আর্থিক বাস্তবতা, ভয়-উদ্বেগ—এসব দেখার ক্ষমতা নেই এআইয়ের। তাই এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়, সহযোগী মাত্র।
বাংলাদেশের সামনে এআই নিয়ে বড় সুযোগ রয়েছে—কৃষিতে ফসলের রোগ আগাম শনাক্ত করা, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, যানজট বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিল্প উৎপাদনে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে এআই। তবে এআই শুধু প্রযুক্তির প্রকল্প নয়, এটি সমাজেরও প্রকল্প। প্রযুক্তিতে যারা আমাদের আগে এগিয়েছে, তারা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, মানুষের আচরণ বিশ্লেষণে অনেক ভুল করেছে—অন্যদের ভুল থেকে শেখা পিছিয়ে থাকা নয়, বুদ্ধিমানের মতো এগোনো।
আমাদের তাই এআই ব্যবহারের পাশাপাশি এআই সাক্ষরতাও বাড়াতে হবে। কখন প্রযুক্তিকে বিশ্বাস করব, কখন প্রশ্ন করব, আর কখন মানুষের সিদ্ধান্ত চাইব—এটা জানতে হবে। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবার—সবার এই দায়িত্ব। হয়তো আগামী দিনে একটি শিশুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল শিক্ষা হবে—'এআই উত্তর দিয়েছে, এবার তুমি ভেবে দেখো উত্তরটি ঠিক কি না'। কয়েক বছর পর আমাদের সন্তানরা জিজ্ঞেস করবে, 'তোমাদের সময়ে এআই এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তোমরা কী করেছিলে?' আমরা যেন বলতে পারি—আমরা প্রযুক্তিকে ভয় পাইনি, আবার অন্ধভাবে বিশ্বাসও করিনি। আমরা প্রশ্ন করেছি, শিখেছি, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি এবং মানুষকে কেন্দ্র করেই প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছি। কারণ, ভবিষ্যতের সবচেয়ে উন্নত সমাজ সেই সমাজ নয় যেখানে সবচেয়ে বুদ্ধিমান যন্ত্র আছে, বরং সেই সমাজ, যেখানে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও মানবিকতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির নাম—মানুষ।
ড. তাহসিনা ফারাহ সনম, অধ্যাপক ও এআই গবেষক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি, বুয়েট-এর এই মতামত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন