দিকপাল

ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের বাস্তব বাণিজ্যের মাঠে একচেটিয়া জিতল কোন দেশ


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ | ১২:৩৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের বাস্তব বাণিজ্যের মাঠে একচেটিয়া জিতল কোন দেশ

ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনায় দেশের প্রতিটি অলিগলি এখন লাতিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক ঘাঁটিতে পরিণত হলেও বাস্তব বাণিজ্যের ময়দানে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় এক চমকপ্রদ সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে। কর্মক্ষেত্রের আলোচনা কিংবা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আড্ডায় এখন আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ মন্দা বা সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট নিয়ে তেমন একটা কথা শোনা যাচ্ছে না; বরং তার জায়গা দখল করে নিয়েছে প্রিয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচন, মাঠের কৌশল আর আসন্ন আসরের নানা সমীকরণ। ফুটবল নিয়ে এমন আবেগপ্রবণ উন্মাদনার মাঝেও একটি বাস্তবমুখী প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবেই বড় হয়ে উঠেছে যে, মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বাস্তব বাণিজ্যের ময়দানে বাংলাদেশের বাজারে আসলে এগিয়ে আছে কে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সূচক এবং বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাণিজ্যের এই দৌড়ে আর্জেন্টিনা থেকে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল। বাংলাদেশ থেকে আমদানি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই ব্রাজিলের অবস্থান সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হওয়ায় আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার প্রায় তিনগুণ বেশি পণ্য আসে ব্রাজিল থেকে। রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান বেশ স্পষ্ট, কারণ আর্জেন্টিনার বাজারের তুলনায় ব্রাজিলে প্রায় আটগুণ বেশি পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল থেকে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা ব্রাজিলকে বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম আমদানি উৎসে পরিণত করেছে এবং বাংলাদেশের মোট আমদানিতে ল্যাটিন আমেরিকার এই বৃহত্তম অর্থনীতির অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় চার শতাংশ। মূলত দেশীয় পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে তুলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য চিনি ও সয়াবিন আমদানির ওপর বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে ব্রাজিলের ওপর নির্ভরশীল হলেও বিশ্বের ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মানচিত্রে আর্জেন্টিনা বেশ পিছিয়ে রয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশের মাত্র ১৭তম বৃহত্তম আমদানি উৎস ছিল, যেখান থেকে মূলত সয়াবিন তেল ও কিছু ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে এবং দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা বাংলাদেশের মোট আমদানির অনুপাতে অত্যন্ত নগণ্য। রপ্তানির বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দেখলে এই দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ব্যবধান আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, কারণ গত অর্থবছরে ব্রাজিলে প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যার একটি বড় অংশই ছিল তৈরি পোশাক খাতের জার্সি, পুলওভার এবং শার্ট। রপ্তানির গন্তব্য হিসেবে ব্রাজিল এখন বাংলাদেশের ২৭তম অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে দেশীয় পণ্যের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও একই সময়ে আর্জেন্টিনার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ২১ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা মোট রপ্তানি আয়ের অনুপাতে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ এবং তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ৬৫তম।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, ব্রাজিলের জিডিপির আকার বর্তমানে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যা তাদের বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং মূলত এই বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে ব্রাজিলের এই একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায়। ফুটবল মাঠে এই দুই দেশ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হলেও নিজেদের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ মজবুত ও স্থিতিশীল হওয়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা একে অপরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবেই কাজ করছে। গাড়ি, মোটরযানের যন্ত্রাংশ, ট্রাক এবং গমের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, যা দক্ষিণ আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ মূলত ফুটবল নিয়ে আবেগে আপ্লুত একটি দেশ হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি এবং লাতিন আমেরিকার এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে শুল্কায়ন জটিলতা দূর করা এবং নতুন কৌশলগত বাণিজ্যিক চুক্তি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের বাস্তব বাণিজ্যের মাঠে একচেটিয়া জিতল কোন দেশ

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬

featured Image

ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনায় দেশের প্রতিটি অলিগলি এখন লাতিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক ঘাঁটিতে পরিণত হলেও বাস্তব বাণিজ্যের ময়দানে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় এক চমকপ্রদ সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে। কর্মক্ষেত্রের আলোচনা কিংবা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আড্ডায় এখন আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ মন্দা বা সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট নিয়ে তেমন একটা কথা শোনা যাচ্ছে না; বরং তার জায়গা দখল করে নিয়েছে প্রিয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচন, মাঠের কৌশল আর আসন্ন আসরের নানা সমীকরণ। ফুটবল নিয়ে এমন আবেগপ্রবণ উন্মাদনার মাঝেও একটি বাস্তবমুখী প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবেই বড় হয়ে উঠেছে যে, মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বাস্তব বাণিজ্যের ময়দানে বাংলাদেশের বাজারে আসলে এগিয়ে আছে কে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সূচক এবং বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাণিজ্যের এই দৌড়ে আর্জেন্টিনা থেকে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল। বাংলাদেশ থেকে আমদানি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই ব্রাজিলের অবস্থান সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হওয়ায় আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার প্রায় তিনগুণ বেশি পণ্য আসে ব্রাজিল থেকে। রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান বেশ স্পষ্ট, কারণ আর্জেন্টিনার বাজারের তুলনায় ব্রাজিলে প্রায় আটগুণ বেশি পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল থেকে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা ব্রাজিলকে বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম আমদানি উৎসে পরিণত করেছে এবং বাংলাদেশের মোট আমদানিতে ল্যাটিন আমেরিকার এই বৃহত্তম অর্থনীতির অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় চার শতাংশ। মূলত দেশীয় পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে তুলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য চিনি ও সয়াবিন আমদানির ওপর বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে ব্রাজিলের ওপর নির্ভরশীল হলেও বিশ্বের ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মানচিত্রে আর্জেন্টিনা বেশ পিছিয়ে রয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশের মাত্র ১৭তম বৃহত্তম আমদানি উৎস ছিল, যেখান থেকে মূলত সয়াবিন তেল ও কিছু ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে এবং দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা বাংলাদেশের মোট আমদানির অনুপাতে অত্যন্ত নগণ্য। রপ্তানির বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দেখলে এই দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ব্যবধান আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, কারণ গত অর্থবছরে ব্রাজিলে প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যার একটি বড় অংশই ছিল তৈরি পোশাক খাতের জার্সি, পুলওভার এবং শার্ট। রপ্তানির গন্তব্য হিসেবে ব্রাজিল এখন বাংলাদেশের ২৭তম অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে দেশীয় পণ্যের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও একই সময়ে আর্জেন্টিনার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ২১ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা মোট রপ্তানি আয়ের অনুপাতে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ এবং তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ৬৫তম।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, ব্রাজিলের জিডিপির আকার বর্তমানে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যা তাদের বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং মূলত এই বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে ব্রাজিলের এই একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায়। ফুটবল মাঠে এই দুই দেশ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হলেও নিজেদের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ মজবুত ও স্থিতিশীল হওয়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা একে অপরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবেই কাজ করছে। গাড়ি, মোটরযানের যন্ত্রাংশ, ট্রাক এবং গমের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, যা দক্ষিণ আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ মূলত ফুটবল নিয়ে আবেগে আপ্লুত একটি দেশ হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি এবং লাতিন আমেরিকার এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে শুল্কায়ন জটিলতা দূর করা এবং নতুন কৌশলগত বাণিজ্যিক চুক্তি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল