দিকপাল

যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় সই ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় সই ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আর সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের শীর্ষ নেতারা সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে এই গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প, যা বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি নিশ্চিত করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন, যেখানে ট্রাম্পের স্বাক্ষরের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ইরানও এই চুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের সম্মতির মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এখন এটি বাস্তবায়নের পালা।


আগ্রহের বিষয় হলো, দুই দেশের নেতা শারীরিকভাবে একই স্থানে না থেকেও ইলেকট্রনিক পদ্ধতির মাধ্যমে দূর থেকেই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর আগে সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন হ্রদের তীরে একটি উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা থাকলেও, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তা একদিন আগেই সম্পন্ন করা হয়েছে। এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি দ্রুত এই চুক্তির কার্যকারিতার ওপর জোর দিয়েছেন। মূলত, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে স্বাক্ষরিত এই নথি এখন আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দলিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন চুক্তির ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই তা লঙ্ঘন করতে না পারে।


যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই চুক্তির চৌদ্দটি ধারা প্রকাশ করা হয়েছে, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রথমত, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল প্রান্ত থেকে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং উভয় দেশই একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগামী ষাট দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এছাড়া, ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনশ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের অঙ্গীকারও করা হয়েছে, যার বিস্তারিত পরিকল্পনা শিগগিরই চূড়ান্ত হবে।


চুক্তির অন্যতম বড় অংশ হলো পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি। ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটবে না, বরং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। বিনিময়ে, চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সকল ধরনের আন্তর্জাতিক ও একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নেবে। আপাতত, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে না যাওয়া পর্যন্ত ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির বিশেষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ কাঠামো গঠন করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। সব মিলিয়ে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।

মূল সূত্র: আল-জাজিরা, সিএনএন

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় সই ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬

featured Image

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আর সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের শীর্ষ নেতারা সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে এই গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প, যা বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি নিশ্চিত করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন, যেখানে ট্রাম্পের স্বাক্ষরের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ইরানও এই চুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের সম্মতির মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এখন এটি বাস্তবায়নের পালা।


আগ্রহের বিষয় হলো, দুই দেশের নেতা শারীরিকভাবে একই স্থানে না থেকেও ইলেকট্রনিক পদ্ধতির মাধ্যমে দূর থেকেই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর আগে সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন হ্রদের তীরে একটি উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা থাকলেও, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তা একদিন আগেই সম্পন্ন করা হয়েছে। এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি দ্রুত এই চুক্তির কার্যকারিতার ওপর জোর দিয়েছেন। মূলত, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে স্বাক্ষরিত এই নথি এখন আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দলিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন চুক্তির ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই তা লঙ্ঘন করতে না পারে।


যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই চুক্তির চৌদ্দটি ধারা প্রকাশ করা হয়েছে, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রথমত, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল প্রান্ত থেকে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং উভয় দেশই একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগামী ষাট দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এছাড়া, ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনশ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের অঙ্গীকারও করা হয়েছে, যার বিস্তারিত পরিকল্পনা শিগগিরই চূড়ান্ত হবে।


চুক্তির অন্যতম বড় অংশ হলো পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি। ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটবে না, বরং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। বিনিময়ে, চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সকল ধরনের আন্তর্জাতিক ও একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নেবে। আপাতত, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে না যাওয়া পর্যন্ত ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির বিশেষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ কাঠামো গঠন করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। সব মিলিয়ে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।

মূল সূত্র: আল-জাজিরা, সিএনএন


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল