ইরানের সঙ্গে বিশ্বশক্তির যুদ্ধবিরতি এবং একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণার পর নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক সমঝোতা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা বলয় ও পররাষ্ট্রনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করার পর থেকেই তেল আবিবের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তির বিস্তারিত রূপরেখা খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্র উল্লেখ করে জানা গেছে, নতুন এই সমঝোতার অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ঐতিহাসিক চুক্তি ইসরায়েলের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে চিরশত্রু ও প্রধান হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়ে এতদিন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণ করেছিলেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নিজের রাজনৈতিক শক্তির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে জনগণের সামনে প্রদর্শন করতেন। কিন্তু এবার ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেহরানের সঙ্গে হাত মেলানোয় নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এখন খোদ নিজের দেশেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, নিজেকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নির্ভরযোগ্য মিত্র দাবি করা নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতানিয়াহুর চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত ও বিরোধে জড়ানো, অন্যথায় ইসরায়েলের কিছু প্রধান কৌশলগত স্বার্থে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী শরিকরা এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে সাফ জানিয়েছেন: "ট্রাম্পের এই চুক্তি মেনে চলতে আমরা বাধ্য নই। ইসরায়েল এমন কোনো চুক্তির অংশীদার হবে না, যা আমাদের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।"
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু খোলামেলা মন্তব্য। ট্রাম্প ইদানীংকালে নেতানিয়াহুর বেশ কিছু সামরিক সিদ্ধান্তের কঠোর ও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন, যা ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধীরা ট্রাম্পের এই অসন্তোষকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজা, লেবানন ও ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধংদেহী কৌশল শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গাজায় মাসের পর মাস ধরে ধ্বংসাত্মক সংঘাত চললেও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরান কিংবা তার প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোর প্রভাব কমাতেও ইসরায়েল সফল হয়নি।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ওয়াশিংটন ঠিক কী কারণে হুট করে তেহরানের সঙ্গে এই ধরনের সমঝোতায় গেল, তা এই মুহূর্তে অনুধাবন করা কঠিন। তবে এই চুক্তি যে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে এক বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনবে, তা নিশ্চিত।
একই সুরে ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচও মনে করেন, এই ঘটনা ইসরায়েলের চিরাচরিত ইরান-নীতি পুনর্বিবেচনা করার সময় এনেছে। এখন যদি তেল আবিব বাস্তবসম্মত ও সংযত কৌশল গ্রহণ না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে হবে।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। আর এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় একদিকে নিজের ভঙ্গুর প্রধানমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে চিরপ্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার এক অসম লড়াইয়ে লড়ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
ইরানের সঙ্গে বিশ্বশক্তির যুদ্ধবিরতি এবং একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণার পর নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক সমঝোতা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা বলয় ও পররাষ্ট্রনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করার পর থেকেই তেল আবিবের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তির বিস্তারিত রূপরেখা খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্র উল্লেখ করে জানা গেছে, নতুন এই সমঝোতার অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ঐতিহাসিক চুক্তি ইসরায়েলের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে চিরশত্রু ও প্রধান হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়ে এতদিন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণ করেছিলেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নিজের রাজনৈতিক শক্তির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে জনগণের সামনে প্রদর্শন করতেন। কিন্তু এবার ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেহরানের সঙ্গে হাত মেলানোয় নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এখন খোদ নিজের দেশেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, নিজেকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নির্ভরযোগ্য মিত্র দাবি করা নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতানিয়াহুর চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত ও বিরোধে জড়ানো, অন্যথায় ইসরায়েলের কিছু প্রধান কৌশলগত স্বার্থে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী শরিকরা এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে সাফ জানিয়েছেন: "ট্রাম্পের এই চুক্তি মেনে চলতে আমরা বাধ্য নই। ইসরায়েল এমন কোনো চুক্তির অংশীদার হবে না, যা আমাদের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।"
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু খোলামেলা মন্তব্য। ট্রাম্প ইদানীংকালে নেতানিয়াহুর বেশ কিছু সামরিক সিদ্ধান্তের কঠোর ও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন, যা ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধীরা ট্রাম্পের এই অসন্তোষকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজা, লেবানন ও ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধংদেহী কৌশল শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গাজায় মাসের পর মাস ধরে ধ্বংসাত্মক সংঘাত চললেও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরান কিংবা তার প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোর প্রভাব কমাতেও ইসরায়েল সফল হয়নি।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ওয়াশিংটন ঠিক কী কারণে হুট করে তেহরানের সঙ্গে এই ধরনের সমঝোতায় গেল, তা এই মুহূর্তে অনুধাবন করা কঠিন। তবে এই চুক্তি যে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে এক বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনবে, তা নিশ্চিত।
একই সুরে ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচও মনে করেন, এই ঘটনা ইসরায়েলের চিরাচরিত ইরান-নীতি পুনর্বিবেচনা করার সময় এনেছে। এখন যদি তেল আবিব বাস্তবসম্মত ও সংযত কৌশল গ্রহণ না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে হবে।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। আর এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় একদিকে নিজের ভঙ্গুর প্রধানমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে চিরপ্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার এক অসম লড়াইয়ে লড়ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

আপনার মতামত লিখুন