দিকপাল

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালকদের নিয়োগ বাতিল


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ | ১০:৫১ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালকদের নিয়োগ বাতিল

আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যাংকের শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনস্বার্থে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ পর্ষদের সকল পরিচালকের নিয়োগ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করাই এই নতুন নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য।

এই পরিস্থিতির পেছনের সংকট মোকাবিলায় বিশেষ তারল্য সহায়তা হিসেবে ইসলামী ব্যাংককে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রদান করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, যার ফলে আমানতকারীরা বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। এই অস্বাভাবিক উত্তোলনের চাপে ব্যাংকটি তীব্র তারল্য সংকটের মুখোমুখি হয়, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের নিজস্ব চলতি হিসাবে প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় চেক নিষ্পত্তিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্রাহকদের উদ্বেগ নিরসনে এবং ব্যাংকের লেনদেন ব্যবস্থা সচল রাখতে এই বিশেষ ধার দেওয়া হয়েছে, যার বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের প্রতিশ্রুতি নোট জমা দিয়েছে। এই অর্থ সহায়তা পাওয়ার পর চেক নিষ্পত্তি পুনরায় শুরু হয়েছে এবং গ্রাহকসেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় অনেক গ্রাহক সময়মতো ব্যাংকিং সেবা পাননি, যার জন্য কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে দুঃখিত। বর্তমানে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা উত্তোলনের চাপ থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতায় এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। শীঘ্রই ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসহ প্রযুক্তিগত সকল সংকট নিরসন করে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, এই অস্থিরতার সূচনা হয় মূলত গত মে মাসের শেষে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে। সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও গ্রাহক পর্যায়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের আন্দোলনের মুখে ব্যাংকটিতে আমানত উত্তোলনের হিড়িক পড়ে যায়, যা ব্যাংকটিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। সংকট নিরসনে ব্যাংকটি এর আগে ১০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা চেয়েছিল। বর্তমানে শাখাগুলোতে টাকা উত্তোলনের চাপ কিছুটা কমলেও স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা পুরোপুরি ফিরে আসতে এখনো বেশ সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশদ আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপ কতটুকু সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালকদের নিয়োগ বাতিল

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

featured Image

আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যাংকের শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনস্বার্থে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ পর্ষদের সকল পরিচালকের নিয়োগ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করাই এই নতুন নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য।

এই পরিস্থিতির পেছনের সংকট মোকাবিলায় বিশেষ তারল্য সহায়তা হিসেবে ইসলামী ব্যাংককে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রদান করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, যার ফলে আমানতকারীরা বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। এই অস্বাভাবিক উত্তোলনের চাপে ব্যাংকটি তীব্র তারল্য সংকটের মুখোমুখি হয়, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের নিজস্ব চলতি হিসাবে প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় চেক নিষ্পত্তিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্রাহকদের উদ্বেগ নিরসনে এবং ব্যাংকের লেনদেন ব্যবস্থা সচল রাখতে এই বিশেষ ধার দেওয়া হয়েছে, যার বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের প্রতিশ্রুতি নোট জমা দিয়েছে। এই অর্থ সহায়তা পাওয়ার পর চেক নিষ্পত্তি পুনরায় শুরু হয়েছে এবং গ্রাহকসেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় অনেক গ্রাহক সময়মতো ব্যাংকিং সেবা পাননি, যার জন্য কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে দুঃখিত। বর্তমানে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা উত্তোলনের চাপ থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতায় এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। শীঘ্রই ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসহ প্রযুক্তিগত সকল সংকট নিরসন করে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, এই অস্থিরতার সূচনা হয় মূলত গত মে মাসের শেষে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে। সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও গ্রাহক পর্যায়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের আন্দোলনের মুখে ব্যাংকটিতে আমানত উত্তোলনের হিড়িক পড়ে যায়, যা ব্যাংকটিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। সংকট নিরসনে ব্যাংকটি এর আগে ১০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা চেয়েছিল। বর্তমানে শাখাগুলোতে টাকা উত্তোলনের চাপ কিছুটা কমলেও স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা পুরোপুরি ফিরে আসতে এখনো বেশ সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশদ আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপ কতটুকু সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল