দিকপাল

বাজেট ঘোষণায় নয় জীবনযাত্রার খরচেই মানুষের নজর


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ | ০৩:১৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট ঘোষণায় নয় জীবনযাত্রার খরচেই মানুষের নজর

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছে। যদিও বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক ভোগ্যপণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়নি, তবুও দেশের বাজারে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যাঁতাকলে পিষ্ট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে বাজেট নিয়ে এখন আর বড় কোনো প্রত্যাশা অবশিষ্ট নেই। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, কেরানীগঞ্জের বউবাজার, হাতিরপুল ও নয়াবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে তাদের যে বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের আসল অর্থ হলো, পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে তাদের পকেট থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে কি না।

কারওয়ান বাজারের একজন মুদি ব্যবসায়ী জানান, বাজেটের জটিল হিসাব-নিকাশ সাধারণ মানুষের বোঝার সুযোগ নেই। বাস্তবতা হলো, বাজেটে নতুন কর আরোপ করা হোক বা না হোক, বাজারে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চলছে। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজেটের কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়ার সম্ভাবনা নেই। অন্য এক ব্যবসায়ী জানান, বাজেট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব এখন পাইকারি ও খুচরা—উভয় বাজারেই প্রবল। ব্যবসায়ী মহলের দাবি, পাইকারি আড়ত থেকেই দাম বাড়িয়ে রাখার কারণে তারা খুচরা বাজারে পণ্য কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না।

সাধারণ কর্মজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস এখন স্পষ্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বেসরকারি চাকরিজীবী জানালেন, বাজেট ঘোষণার পরপরই যেন নিত্যপণ্যের দাম নতুন করে ডানা মেলেছে। মাসিক সংসার খরচ মেলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা। নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ, বাসাভাড়া ও সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বহন করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেককেই সঞ্চয় ভেঙে বা ধারদেনা করে নিত্যদিনকার প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। তাদের ভাষায়, সরকার কত টাকার বাজেট দিল তাতে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই; তাদের মূল চাওয়া—চাল ও ডালের দাম যদি একটু সহনীয় পর্যায়ে আসে, তবেই তারা শান্তিতে দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদের আগের তুলনায় চালের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিনিকেট ও আটাশ চালের দাম কেজিতে কয়েক টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সাথে বেড়েছে পোলাওয়ের চাল, মাছ ও মুরগির দাম। তবে সবজির সরবরাহ বাড়ায় বাজারে এর দাম কিছুটা কমতির দিকে রয়েছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা মনে করেন, বাজেটের আগে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, এখন সরকার যেসব পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, তার সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের পকেট কাটার এক ধরনের বৈধতা পেয়ে গেছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নজরদারিই এখন সময়ের দাবি। বাজেটের সুফল সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারি পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


বাজেট ঘোষণায় নয় জীবনযাত্রার খরচেই মানুষের নজর

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

featured Image

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছে। যদিও বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক ভোগ্যপণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়নি, তবুও দেশের বাজারে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যাঁতাকলে পিষ্ট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে বাজেট নিয়ে এখন আর বড় কোনো প্রত্যাশা অবশিষ্ট নেই। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, কেরানীগঞ্জের বউবাজার, হাতিরপুল ও নয়াবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে তাদের যে বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের আসল অর্থ হলো, পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে তাদের পকেট থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে কি না।

কারওয়ান বাজারের একজন মুদি ব্যবসায়ী জানান, বাজেটের জটিল হিসাব-নিকাশ সাধারণ মানুষের বোঝার সুযোগ নেই। বাস্তবতা হলো, বাজেটে নতুন কর আরোপ করা হোক বা না হোক, বাজারে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চলছে। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজেটের কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়ার সম্ভাবনা নেই। অন্য এক ব্যবসায়ী জানান, বাজেট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব এখন পাইকারি ও খুচরা—উভয় বাজারেই প্রবল। ব্যবসায়ী মহলের দাবি, পাইকারি আড়ত থেকেই দাম বাড়িয়ে রাখার কারণে তারা খুচরা বাজারে পণ্য কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না।

সাধারণ কর্মজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস এখন স্পষ্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বেসরকারি চাকরিজীবী জানালেন, বাজেট ঘোষণার পরপরই যেন নিত্যপণ্যের দাম নতুন করে ডানা মেলেছে। মাসিক সংসার খরচ মেলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা। নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যে থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ, বাসাভাড়া ও সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বহন করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেককেই সঞ্চয় ভেঙে বা ধারদেনা করে নিত্যদিনকার প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। তাদের ভাষায়, সরকার কত টাকার বাজেট দিল তাতে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই; তাদের মূল চাওয়া—চাল ও ডালের দাম যদি একটু সহনীয় পর্যায়ে আসে, তবেই তারা শান্তিতে দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদের আগের তুলনায় চালের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিনিকেট ও আটাশ চালের দাম কেজিতে কয়েক টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সাথে বেড়েছে পোলাওয়ের চাল, মাছ ও মুরগির দাম। তবে সবজির সরবরাহ বাড়ায় বাজারে এর দাম কিছুটা কমতির দিকে রয়েছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা মনে করেন, বাজেটের আগে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, এখন সরকার যেসব পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, তার সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের পকেট কাটার এক ধরনের বৈধতা পেয়ে গেছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নজরদারিই এখন সময়ের দাবি। বাজেটের সুফল সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারি পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল