দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে সরকার। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো বিভিন্ন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের বিপুল সংখ্যক ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার দেশে নিয়ে আসেন, আগামী নতুন অর্থবছর থেকে তার ওপর কোনো ধরনের উৎসে কর কাটা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি বিশেষ দিকনির্দেশনায় ইতিমধ্যেই এই কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিদ্যমান আয়কর আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে বাজেট বক্তৃতার মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেশবাসীর সামনে পেশ করবেন। তবে এই বিশেষ সুবিধার পাশাপাশি একটি শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দেশের ভেতরের অন্য কোনো উৎস থেকে অর্জিত আয়ের ওপর দেশের সাধারণ ও নিয়মিত করদাতাদের মতোই নির্ধারিত হারে প্রচলিত আয়কর প্রদান করতে হবে। বর্তমান বা বিদ্যমান আয়কর আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, যদি কোনো পেশাজীবী ব্যক্তি দেশের ভেতরে অবস্থান করে সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে বিদেশি কোনো নামী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কোনো ডিজিটাল সেবা কিংবা পণ্যের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে তা ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে নিয়ে আসতেন, তবে আইনগত মারপ্যাঁচে সেই উপার্জনকে সরাসরি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের মতো রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য করা হতো না। আর এই আইনি জটিলতার কারণেই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্রিল্যান্সার বা ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কষ্টার্জিত সেই মোট আয়ের ওপর সাড়ে সাত শতাংশ হারে মোটা অঙ্কের উৎসে কর কেটে রেখে সরকারি কোষাগারে জমা দিত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিক প্রবাসে বা বিদেশে অবস্থান করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বৈধ উপায়ে দেশে যে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন, সেটিকে শতভাগ রেমিট্যান্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে প্রবাসীদের পাঠানো সেই অর্থের ওপর কোনো ধরনের উৎসে কর কাটার বিধান নেই। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিল্যান্সাররা দাবি করে আসছিলেন যে, তারাও দেশের মাটিতে বসে সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবান ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত করছেন, তাই তাদের আয়ের ওপর কর আরোপ করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে গত ১ জুন বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ ‘চিত্ত মিডিয়া’র তরুণ প্রতিষ্ঠাতা ও সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর জুয়েল রানা এক বিশেষ ও জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত গুরুত্ববহ এই বৈঠকে জুয়েল রানা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর আরোপের ফলে তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশা ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। তরুণদের এই যৌক্তিক দাবির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ এই বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি উচ্চসূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাজনৈতিক দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া তরুণদের কর্মসংস্থানমুখী প্রতিশ্রুতি এবং প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই ফ্রিল্যান্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দেশে আনা বৈশ্বিক আয়ের ওপর থেকে এই বিতর্কিত উৎসে কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আসন্ন নতুন অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ও রূপরেখা তুলে ধরা হবে। শুধু তাই নয়, দেশের প্রচলিত মূল আয়কর আইনে প্রথমবারের মতো 'কনটেন্ট ক্রিয়েটর' শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা ও পরিধি যুক্ত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই পেশাজীবীদের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির মুখোমুখি হতে না হয়। অবশ্য এই তরুণরা যদি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দেশীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড প্রমোশন, ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন বা স্পনসরশিপের মাধ্যমে অন্য কোনো উপায়ে দেশীয় মুদ্রায় অর্থ উপার্জন করেন, তবে সেই আয়ের বিপরীতে দেশের প্রচলিত সাধারণ করদাতাদের মতোই প্রদেয় হারে নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করতে হবে।
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা এবং সাধারণ ফ্রিল্যান্সাররা মনে করছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী ও ইতিবাচক নির্দেশনার কারণে দেশের বিকাশমান আইটি এবং ফ্রিল্যান্সিং খাত আরও এক ধাপ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বৈদেশিক আয়ের ওপর এই সাড়ে সাত শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা ও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে উল্লেখ্য যে, যারা বিভিন্ন আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বিভিন্ন তথ্যবহুল, শিক্ষণীয় কিংবা বিনোদনমূলক ছবি, নিখুঁত অডিও ও শিক্ষণীয় ভিডিও কনটেন্ট নিয়মিত তৈরি ও আপলোড করেন, তাদেরই মূলত সহজ ভাষায় ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ বলা হয়ে থাকে। তারা মূলত ইউটিউব অ্যাডসেন্স, ফেসবুক মনিটাইজেশন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড প্রমোশন কিংবা স্পনসরশিপের মাধ্যমে বিদেশ থেকে সরাসরি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ উপার্জন করে থাকেন।
উল্লেখ্য যে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনি ইশতেহারে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট উন্নত প্রযুক্তি খাতে দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মাধ্যমে দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য আরও আট লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির আলোকেই দেশে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপন, সহজ লেনদেনের জন্য আন্তর্জাতিক ই-ওয়ালেট চালু, এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য টানা ১০ বছরের বিশেষ কর মওকুফ সুবিধা এবং নতুন স্টার্টআপ বা ব্যবসা শুরুর জন্য ভর্তুকিযুক্ত সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ তহবিল গঠনের মতো বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারের এই ইতিবাচক মনোভাবের পরপরই দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ও সর্ববৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড নিজেদের ফেসবুকের ভেরিফাইড অফিশিয়াল পেজে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর থেকে উৎসে কর কর্তন পুরোপুরি স্থগিত করার আনুষ্ঠানিক ও আইনি ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত সততার সাথে জানিয়েছে যে, সরকারের নির্দেশনা আসার ঠিক আগমুহূর্তে যেসব ফ্রিল্যান্সারের অ্যাকাউন্ট বা হিসাব থেকে নিয়ম অনুযায়ী কর কেটে নেওয়া হয়েছিল, সেই কেটে নেওয়া অর্থও অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের এই জনবান্ধব কর নীতি কেবল আইটি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর আগে দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপিত উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার একটি খসড়া উদ্যোগ নেওয়া হলেও, দেশের সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে জনস্বার্থে সরকার পরবর্তীতে তা সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে। এছাড়া দেশের বিশাল মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সুবিধার্থে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর প্রস্তাবিত বাড়তি কর বাতিল, সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর আদায়ের বিতর্কিত উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি সরে আসা, রপ্তানি প্রণোদনার ওপর বাড়তি কর আরোপের পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে ইউটার্ন বা ফিরে এসে তা কমিয়ে সরাসরি অর্ধেক করা এবং ব্যাংকে টাকা রাখার ক্ষেত্রে আবগারি শুল্কের সর্বনিম্ন সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করার মতো একাধিক ইতিবাচক ও গণমুখী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে সরকার। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো বিভিন্ন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের বিপুল সংখ্যক ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার দেশে নিয়ে আসেন, আগামী নতুন অর্থবছর থেকে তার ওপর কোনো ধরনের উৎসে কর কাটা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি বিশেষ দিকনির্দেশনায় ইতিমধ্যেই এই কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিদ্যমান আয়কর আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে বাজেট বক্তৃতার মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেশবাসীর সামনে পেশ করবেন। তবে এই বিশেষ সুবিধার পাশাপাশি একটি শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দেশের ভেতরের অন্য কোনো উৎস থেকে অর্জিত আয়ের ওপর দেশের সাধারণ ও নিয়মিত করদাতাদের মতোই নির্ধারিত হারে প্রচলিত আয়কর প্রদান করতে হবে। বর্তমান বা বিদ্যমান আয়কর আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, যদি কোনো পেশাজীবী ব্যক্তি দেশের ভেতরে অবস্থান করে সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে বিদেশি কোনো নামী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কোনো ডিজিটাল সেবা কিংবা পণ্যের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে তা ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে নিয়ে আসতেন, তবে আইনগত মারপ্যাঁচে সেই উপার্জনকে সরাসরি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের মতো রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য করা হতো না। আর এই আইনি জটিলতার কারণেই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্রিল্যান্সার বা ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কষ্টার্জিত সেই মোট আয়ের ওপর সাড়ে সাত শতাংশ হারে মোটা অঙ্কের উৎসে কর কেটে রেখে সরকারি কোষাগারে জমা দিত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিক প্রবাসে বা বিদেশে অবস্থান করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বৈধ উপায়ে দেশে যে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন, সেটিকে শতভাগ রেমিট্যান্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে প্রবাসীদের পাঠানো সেই অর্থের ওপর কোনো ধরনের উৎসে কর কাটার বিধান নেই। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিল্যান্সাররা দাবি করে আসছিলেন যে, তারাও দেশের মাটিতে বসে সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবান ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত করছেন, তাই তাদের আয়ের ওপর কর আরোপ করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে গত ১ জুন বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ ‘চিত্ত মিডিয়া’র তরুণ প্রতিষ্ঠাতা ও সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর জুয়েল রানা এক বিশেষ ও জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত গুরুত্ববহ এই বৈঠকে জুয়েল রানা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর আরোপের ফলে তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশা ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। তরুণদের এই যৌক্তিক দাবির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ এই বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি উচ্চসূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাজনৈতিক দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া তরুণদের কর্মসংস্থানমুখী প্রতিশ্রুতি এবং প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই ফ্রিল্যান্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দেশে আনা বৈশ্বিক আয়ের ওপর থেকে এই বিতর্কিত উৎসে কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আসন্ন নতুন অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ও রূপরেখা তুলে ধরা হবে। শুধু তাই নয়, দেশের প্রচলিত মূল আয়কর আইনে প্রথমবারের মতো 'কনটেন্ট ক্রিয়েটর' শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা ও পরিধি যুক্ত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই পেশাজীবীদের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির মুখোমুখি হতে না হয়। অবশ্য এই তরুণরা যদি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দেশীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড প্রমোশন, ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন বা স্পনসরশিপের মাধ্যমে অন্য কোনো উপায়ে দেশীয় মুদ্রায় অর্থ উপার্জন করেন, তবে সেই আয়ের বিপরীতে দেশের প্রচলিত সাধারণ করদাতাদের মতোই প্রদেয় হারে নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করতে হবে।
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা এবং সাধারণ ফ্রিল্যান্সাররা মনে করছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী ও ইতিবাচক নির্দেশনার কারণে দেশের বিকাশমান আইটি এবং ফ্রিল্যান্সিং খাত আরও এক ধাপ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বৈদেশিক আয়ের ওপর এই সাড়ে সাত শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা ও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে উল্লেখ্য যে, যারা বিভিন্ন আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বিভিন্ন তথ্যবহুল, শিক্ষণীয় কিংবা বিনোদনমূলক ছবি, নিখুঁত অডিও ও শিক্ষণীয় ভিডিও কনটেন্ট নিয়মিত তৈরি ও আপলোড করেন, তাদেরই মূলত সহজ ভাষায় ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ বলা হয়ে থাকে। তারা মূলত ইউটিউব অ্যাডসেন্স, ফেসবুক মনিটাইজেশন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড প্রমোশন কিংবা স্পনসরশিপের মাধ্যমে বিদেশ থেকে সরাসরি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ উপার্জন করে থাকেন।
উল্লেখ্য যে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনি ইশতেহারে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট উন্নত প্রযুক্তি খাতে দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মাধ্যমে দেশের বেকার যুবসমাজের জন্য আরও আট লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির আলোকেই দেশে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপন, সহজ লেনদেনের জন্য আন্তর্জাতিক ই-ওয়ালেট চালু, এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য টানা ১০ বছরের বিশেষ কর মওকুফ সুবিধা এবং নতুন স্টার্টআপ বা ব্যবসা শুরুর জন্য ভর্তুকিযুক্ত সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ তহবিল গঠনের মতো বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারের এই ইতিবাচক মনোভাবের পরপরই দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ও সর্ববৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড নিজেদের ফেসবুকের ভেরিফাইড অফিশিয়াল পেজে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর থেকে উৎসে কর কর্তন পুরোপুরি স্থগিত করার আনুষ্ঠানিক ও আইনি ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত সততার সাথে জানিয়েছে যে, সরকারের নির্দেশনা আসার ঠিক আগমুহূর্তে যেসব ফ্রিল্যান্সারের অ্যাকাউন্ট বা হিসাব থেকে নিয়ম অনুযায়ী কর কেটে নেওয়া হয়েছিল, সেই কেটে নেওয়া অর্থও অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের এই জনবান্ধব কর নীতি কেবল আইটি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর আগে দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপিত উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার একটি খসড়া উদ্যোগ নেওয়া হলেও, দেশের সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে জনস্বার্থে সরকার পরবর্তীতে তা সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে। এছাড়া দেশের বিশাল মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সুবিধার্থে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর প্রস্তাবিত বাড়তি কর বাতিল, সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর আদায়ের বিতর্কিত উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি সরে আসা, রপ্তানি প্রণোদনার ওপর বাড়তি কর আরোপের পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে ইউটার্ন বা ফিরে এসে তা কমিয়ে সরাসরি অর্ধেক করা এবং ব্যাংকে টাকা রাখার ক্ষেত্রে আবগারি শুল্কের সর্বনিম্ন সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করার মতো একাধিক ইতিবাচক ও গণমুখী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন