দিকপাল

৪৪ ব্যাংকে বেড়েছে খেলাপি ঋণ চাপে ব্যাংক খাত


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬ | ০৪:৩৭ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

৪৪ ব্যাংকে বেড়েছে খেলাপি ঋণ চাপে ব্যাংক খাত

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী ও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান মন্দা পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আদায়ের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক দফায় দফায় নানা ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও নীতিগত ছাড় দিলেও তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) দেশের কার্যরত ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে খেলাপি ঋণ যুক্ত হয়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি বলে অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদন বর্তমানে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমে যাওয়ায় এবং বাজারে তারল্য সংকট থাকায় সময়মতো ঋণের কিস্তি বা টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া একটি বড় কারণ হলো, গত বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক কৃত্রিমভাবে বা হিসাবের মারপ্যাঁচে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করে তা কম দেখিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শক দল যখন ব্যাংকগুলোতে সরেজমিনে নিবিড় নিরীক্ষা চালায়, তখন লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ উন্মোচিত বা উদঘাটিত হয়। মূলত এই দুই কারণেই নতুন বছরের শুরুতেই খেলাপি ঋণের এই বিশাল বিস্ফোরণ ঘটেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা বিতরণ করা মোট ঋণের বিশাল এক অংশ অর্থাৎ ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ এর মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মাত্র ৯০ দিনের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফন দেশের আর্থিক খাতের দুর্বল চিত্রকে আরও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

এই সামগ্রিক পতনের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অবস্থাও চরম শোচনীয়। দেশের সরকারি ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে চারটিতেই এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়েছে। গত মার্চ শেষে এই ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১ লাখ Lauren ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। গত ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা ৭৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, যা মার্চে আরও ২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা বা ৭৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে। একই সময়ে রূপালী ব্যাংকের ৬৮৮ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৮৪ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ কোটি টাকা।

তবে এবারের প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে, যেখানে সাধারণ আমানতকারীদের বিপুল অর্থ গচ্ছিত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বেসরকারি খাতের ৪৩টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ fantasy ৮২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এই খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭graph কোটি টাকা বা ২৮ certification ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। এই খাতের মোট ৪৩টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যার মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ও প্রথম সারির ভালো ব্যাংকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেরুতে এক দশকে দশম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার খবরের মাঝেই দেশের ভেতরের এই আর্থিক খাতের অস্থিরতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিন মাসে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে আইএফআইসি ব্যাংকের। এই ব্যাংকের মার্চ প্রান্তিকে ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বেড়ে মোট খেলাপি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের সিংহভাগ অর্থাৎ ৬৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বেড়ে মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা দুর্বল এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ Bound ২৪ কোটি টাকা বা ৬৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এছাড়া ইউসিবি ব্যাংকের ২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭৪ কোটি টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকটে ভুগতে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এই তিন মাসে আরও ২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা বেড়েছে, যার ফলে বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা বা ৫৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। একই সময়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এছাড়াও আল-আরাফাহ্ ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং এনসিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

একই ধারাবাহিকতায় এনআরবিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথ বাংলা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক এবং উত্তরা ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কয়েক শত কোটি টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মূলত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যাওয়ার কারণেই ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ওপর। বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি মার্চ প্রান্তিকে দেশের বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে। তিন মাসে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ৩৯৬ কোটি টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে ৩৪ কোটি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১৯৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি দেশে কার্যরত বহুজাতিক ও বিদেশি ব্যাংক যেমন এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ারও খেলাপি ঋণ এই সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য মিলেছে, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


৪৪ ব্যাংকে বেড়েছে খেলাপি ঋণ চাপে ব্যাংক খাত

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬

featured Image

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী ও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান মন্দা পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আদায়ের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক দফায় দফায় নানা ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও নীতিগত ছাড় দিলেও তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) দেশের কার্যরত ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে খেলাপি ঋণ যুক্ত হয়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি বলে অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদন বর্তমানে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমে যাওয়ায় এবং বাজারে তারল্য সংকট থাকায় সময়মতো ঋণের কিস্তি বা টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া একটি বড় কারণ হলো, গত বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক কৃত্রিমভাবে বা হিসাবের মারপ্যাঁচে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করে তা কম দেখিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শক দল যখন ব্যাংকগুলোতে সরেজমিনে নিবিড় নিরীক্ষা চালায়, তখন লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ উন্মোচিত বা উদঘাটিত হয়। মূলত এই দুই কারণেই নতুন বছরের শুরুতেই খেলাপি ঋণের এই বিশাল বিস্ফোরণ ঘটেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা বিতরণ করা মোট ঋণের বিশাল এক অংশ অর্থাৎ ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ এর মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মাত্র ৯০ দিনের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফন দেশের আর্থিক খাতের দুর্বল চিত্রকে আরও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

এই সামগ্রিক পতনের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অবস্থাও চরম শোচনীয়। দেশের সরকারি ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে চারটিতেই এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়েছে। গত মার্চ শেষে এই ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১ লাখ Lauren ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। গত ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা ৭৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, যা মার্চে আরও ২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা বা ৭৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে। একই সময়ে রূপালী ব্যাংকের ৬৮৮ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৮৪ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ কোটি টাকা।

তবে এবারের প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে, যেখানে সাধারণ আমানতকারীদের বিপুল অর্থ গচ্ছিত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বেসরকারি খাতের ৪৩টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ fantasy ৮২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এই খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭graph কোটি টাকা বা ২৮ certification ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। এই খাতের মোট ৪৩টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যার মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ও প্রথম সারির ভালো ব্যাংকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেরুতে এক দশকে দশম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার খবরের মাঝেই দেশের ভেতরের এই আর্থিক খাতের অস্থিরতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিন মাসে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে আইএফআইসি ব্যাংকের। এই ব্যাংকের মার্চ প্রান্তিকে ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বেড়ে মোট খেলাপি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের সিংহভাগ অর্থাৎ ৬৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বেড়ে মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা দুর্বল এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ Bound ২৪ কোটি টাকা বা ৬৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এছাড়া ইউসিবি ব্যাংকের ২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭৪ কোটি টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকটে ভুগতে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এই তিন মাসে আরও ২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা বেড়েছে, যার ফলে বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা বা ৫৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। একই সময়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এছাড়াও আল-আরাফাহ্ ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং এনসিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

একই ধারাবাহিকতায় এনআরবিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথ বাংলা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক এবং উত্তরা ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কয়েক শত কোটি টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মূলত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যাওয়ার কারণেই ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ওপর। বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি মার্চ প্রান্তিকে দেশের বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে। তিন মাসে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ৩৯৬ কোটি টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে ৩৪ কোটি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১৯৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি দেশে কার্যরত বহুজাতিক ও বিদেশি ব্যাংক যেমন এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ারও খেলাপি ঋণ এই সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য মিলেছে, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল