দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত রপ্তানি আয়ে দীর্ঘদিনের চলমান মন্দাভাব কিছুতেই কাটছে না। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে এর একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববাজারের চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং কাঁচামালসহ সার্বিক উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক অর্ডারে এই ধস নেমেছে। দেশের প্রধানতম এই খাতের আয় কমে যাওয়ার ফলে আগের বছরের একই সময়ের মোট রপ্তানি আয়ের তুলনায় এবার সার্বিক আয় কমে গেছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের এই উদ্বেগজনক চিত্রটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে সব মিলিয়ে মোট ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ আগের বছরের ঠিক একই মাসে অর্থাৎ গত মে মাসে এই রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন বা ৪৭৩ কোটি ডলার। তবে দীর্ঘ মেয়াদে পতন ঘটলেও একটি সাময়িক স্বস্তির বিষয় হলো, মে মাসের এই আয়টি তার ঠিক আগের মাস অর্থাৎ এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। তবে একক মাসের এই সামান্য উত্থান বাদ দিলে সামগ্রিক অর্থবছরের হিসাবে রপ্তানি আয়ে এক বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা বা মন্দা লক্ষ্য করা গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (গত জুলাই থেকে মে পর্যন্ত) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের সার্বিক পণ্য রপ্তানি সামগ্রিকভাবে ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
ইপিবির প্রকাশিত তথ্যে খাতের ভেতরের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মে মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত এই ১১ মাসের হিসাবে তৈরি পোশাক খাতের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বার্ষিক হিসাবে প্রধান এই খাতের আয় কমেছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে টানা ৮ মাস ধরে ক্রমাগত পতনের পর গত এপ্রিল মাসে দেশের রপ্তানি খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু মে মাসে এসে পুনরায় রপ্তানি বড় আকারে কমে যাওয়ায় সেই ইতিবাচক বা প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
চলতি অর্থবছরের এই ১১ মাসে পোশাক খাতের অন্যতম স্তম্ভ নিটওয়্যার খাতে রপ্তানি হয়েছে ১৮ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। ফলে বার্ষিক হিসাবে নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। শুধু তাই নয়, গত বছরের মে মাসের একক তুলনার চেয়ে এবারের মে মাসে নিটওয়্যার খাতের রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম হতাশাজনক। জুলাই-মে সময়ে ওভেন পোশাকে রপ্তানি হয়েছে ১৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। বার্ষিক হিসাবে ওভেন খাতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং গত বছরের মে মাসের তুলনায় চলতি মে মাসে ওভেনের একক রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে তীব্র গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং বন্দর ও লজিস্টিক খাতের নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা সঠিক সময়ে কম খরচে পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ করতে পারছি না। এই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বিমুখী সংকটের দুষ্টচক্রে পড়ে তৈরি পোশাকের দুই প্রধান চালিকাশক্তি নিটওয়্যার ও ওভেন, কোনোটিই তাদের এই নেতিবাচক বা মন্দার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সরকারের বিশেষ নীতি সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত রপ্তানি আয়ে দীর্ঘদিনের চলমান মন্দাভাব কিছুতেই কাটছে না। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে এর একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববাজারের চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং কাঁচামালসহ সার্বিক উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক অর্ডারে এই ধস নেমেছে। দেশের প্রধানতম এই খাতের আয় কমে যাওয়ার ফলে আগের বছরের একই সময়ের মোট রপ্তানি আয়ের তুলনায় এবার সার্বিক আয় কমে গেছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের এই উদ্বেগজনক চিত্রটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে সব মিলিয়ে মোট ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ আগের বছরের ঠিক একই মাসে অর্থাৎ গত মে মাসে এই রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন বা ৪৭৩ কোটি ডলার। তবে দীর্ঘ মেয়াদে পতন ঘটলেও একটি সাময়িক স্বস্তির বিষয় হলো, মে মাসের এই আয়টি তার ঠিক আগের মাস অর্থাৎ এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। তবে একক মাসের এই সামান্য উত্থান বাদ দিলে সামগ্রিক অর্থবছরের হিসাবে রপ্তানি আয়ে এক বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা বা মন্দা লক্ষ্য করা গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (গত জুলাই থেকে মে পর্যন্ত) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের সার্বিক পণ্য রপ্তানি সামগ্রিকভাবে ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
ইপিবির প্রকাশিত তথ্যে খাতের ভেতরের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মে মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত এই ১১ মাসের হিসাবে তৈরি পোশাক খাতের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বার্ষিক হিসাবে প্রধান এই খাতের আয় কমেছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে টানা ৮ মাস ধরে ক্রমাগত পতনের পর গত এপ্রিল মাসে দেশের রপ্তানি খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু মে মাসে এসে পুনরায় রপ্তানি বড় আকারে কমে যাওয়ায় সেই ইতিবাচক বা প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
চলতি অর্থবছরের এই ১১ মাসে পোশাক খাতের অন্যতম স্তম্ভ নিটওয়্যার খাতে রপ্তানি হয়েছে ১৮ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। ফলে বার্ষিক হিসাবে নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। শুধু তাই নয়, গত বছরের মে মাসের একক তুলনার চেয়ে এবারের মে মাসে নিটওয়্যার খাতের রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম হতাশাজনক। জুলাই-মে সময়ে ওভেন পোশাকে রপ্তানি হয়েছে ১৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। বার্ষিক হিসাবে ওভেন খাতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং গত বছরের মে মাসের তুলনায় চলতি মে মাসে ওভেনের একক রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে তীব্র গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং বন্দর ও লজিস্টিক খাতের নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা সঠিক সময়ে কম খরচে পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ করতে পারছি না। এই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বিমুখী সংকটের দুষ্টচক্রে পড়ে তৈরি পোশাকের দুই প্রধান চালিকাশক্তি নিটওয়্যার ও ওভেন, কোনোটিই তাদের এই নেতিবাচক বা মন্দার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সরকারের বিশেষ নীতি সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন