জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দেশে মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক চাপ আরও প্রকট ও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। এর ওপর গত বুধবার নতুন করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও ওপরে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের পারিবারিক খরচ চালানো এখন ওয়ান্টেড বা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এমন একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি : উত্তরণকালীন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নানা খুঁটিনাটি দিক ও সংকটগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে দেশের চলতি অর্থবছরের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও এর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত নানা দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন নেতিবাচক ধাক্কার কারণে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান মাথাব্যথার কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সরকারিভাবে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি দাবি করা হলেও, বাস্তবে জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৫ শতাংশ ছুঁয়েছে। মূলত জ্বালানি তেল, পরিবহন খাত এবং নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সেবা খাতের খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণেই বাজারে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারা তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের কিংবা চাকরিজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার অত্যন্ত ধীর ও কম। ফলে নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে বাধ্য করছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা এবং তদারকির অভাবকেও দেশের এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, দেশের পণ্য সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত স্তর বা সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কারণে উৎপাদক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে আসতে আসতে পণ্যের দাম ৭০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন যুক্তি দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত সংকটের কারণে হচ্ছে, এটি বাজারে চাহিদার অতিরিক্ত চাপের কারণে নয়। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ঠিক রাখা। এই সংকট কাটাতে সরকারের কৌশলগত খাদ্য মজুত বাড়ানো এবং বাজার তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদক তথা কৃষক এবং সাধারণ খুচরা ক্রেতার মধ্যকার দামের যে বিশাল ব্যবধান, তা কমাতে হলে সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা বা স্তর কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির সময়ে দেশের নিম্ন আয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানিসংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, তা হয়তো সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের একটি ধাক্কা দেবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ বা সংকুচিত করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, বৈশ্বিক মূল্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিদ্যুতের দাম কিছুটা সমন্বয় করার প্রয়োজন হয়তো ছিল। তবে এই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সাথে কঠোরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে সাধারণ গ্রাহকের ওপর অন্যায্য বোঝার সৃষ্টি না হয়।
সিপিডির সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় আরও জানানো হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে একটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে কিছুটা উন্নতি এসেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন কিছুটা হলেও ঠেকানো গেছে। তবে এই স্বস্তির খবরের মাঝেও রপ্তানি খাত এখনো বেশ চাপের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় ও বৈদেশিক বেসরকারি বিনিয়োগের চাহিদা এবং আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশ দুর্বল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা বৈদেশিক ঋণ ও তার সুদ পরিশোধের বিশাল চাপ, যা আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটে ফেলতে পারে। প্রবাসী আয় বাড়লেও কেন এত ঘন ঘন এর পরিমাণে ওঠানামা বা উত্থান-পতন হচ্ছে, তার মূল কারণ ও উৎস খুঁজে বের করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি আরও বলেন, দেশের রপ্তানিমুখী কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে এবং দেশীয় মূল্য সংযোজন বা উৎপাদনী খাতকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করতে হবে।
সবশেষে, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণের বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের মতো বড় ক্রেতাদের কাছ থেকে এই বিষয়ে নানা নেতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাই সময়মতো শ্রমিকদের মজুরি প্রদান, কারখানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের মতো আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডগুলোতে অবিলম্বে জোর দিতে হবে। দেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনের সময় যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়, সেখান থেকে কোনো সংস্থাকে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার কঠোর শর্ত যুক্ত করে দেওয়া উচিত বলে মনে করে সিপিডি, যা আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দেশে মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক চাপ আরও প্রকট ও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। এর ওপর গত বুধবার নতুন করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও ওপরে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের পারিবারিক খরচ চালানো এখন ওয়ান্টেড বা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এমন একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি : উত্তরণকালীন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নানা খুঁটিনাটি দিক ও সংকটগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে দেশের চলতি অর্থবছরের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও এর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত নানা দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন নেতিবাচক ধাক্কার কারণে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান মাথাব্যথার কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সরকারিভাবে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি দাবি করা হলেও, বাস্তবে জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৫ শতাংশ ছুঁয়েছে। মূলত জ্বালানি তেল, পরিবহন খাত এবং নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সেবা খাতের খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণেই বাজারে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারা তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের কিংবা চাকরিজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার অত্যন্ত ধীর ও কম। ফলে নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে বাধ্য করছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা এবং তদারকির অভাবকেও দেশের এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, দেশের পণ্য সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত স্তর বা সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কারণে উৎপাদক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে আসতে আসতে পণ্যের দাম ৭০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন যুক্তি দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত সংকটের কারণে হচ্ছে, এটি বাজারে চাহিদার অতিরিক্ত চাপের কারণে নয়। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ঠিক রাখা। এই সংকট কাটাতে সরকারের কৌশলগত খাদ্য মজুত বাড়ানো এবং বাজার তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদক তথা কৃষক এবং সাধারণ খুচরা ক্রেতার মধ্যকার দামের যে বিশাল ব্যবধান, তা কমাতে হলে সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা বা স্তর কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির সময়ে দেশের নিম্ন আয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানিসংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, তা হয়তো সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের একটি ধাক্কা দেবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ বা সংকুচিত করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, বৈশ্বিক মূল্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিদ্যুতের দাম কিছুটা সমন্বয় করার প্রয়োজন হয়তো ছিল। তবে এই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সাথে কঠোরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে সাধারণ গ্রাহকের ওপর অন্যায্য বোঝার সৃষ্টি না হয়।
সিপিডির সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় আরও জানানো হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে একটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে কিছুটা উন্নতি এসেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন কিছুটা হলেও ঠেকানো গেছে। তবে এই স্বস্তির খবরের মাঝেও রপ্তানি খাত এখনো বেশ চাপের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় ও বৈদেশিক বেসরকারি বিনিয়োগের চাহিদা এবং আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশ দুর্বল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা বৈদেশিক ঋণ ও তার সুদ পরিশোধের বিশাল চাপ, যা আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটে ফেলতে পারে। প্রবাসী আয় বাড়লেও কেন এত ঘন ঘন এর পরিমাণে ওঠানামা বা উত্থান-পতন হচ্ছে, তার মূল কারণ ও উৎস খুঁজে বের করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি আরও বলেন, দেশের রপ্তানিমুখী কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে এবং দেশীয় মূল্য সংযোজন বা উৎপাদনী খাতকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করতে হবে।
সবশেষে, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণের বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের মতো বড় ক্রেতাদের কাছ থেকে এই বিষয়ে নানা নেতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাই সময়মতো শ্রমিকদের মজুরি প্রদান, কারখানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের মতো আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডগুলোতে অবিলম্বে জোর দিতে হবে। দেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনের সময় যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়, সেখান থেকে কোনো সংস্থাকে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার কঠোর শর্ত যুক্ত করে দেওয়া উচিত বলে মনে করে সিপিডি, যা আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করবে।

আপনার মতামত লিখুন