দিকপাল

লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে জনদুর্ভোগ


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:০৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে পরপর দুবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তেলের পর বিদ্যুতের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে এক বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের খুচরা, পাইকারি এবং সঞ্চালন—তিনটি স্তরেই একযোগে এই দাম বাড়ানো হয়েছে, যা চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গণপরিবহন ও সেবামূলক খাতের খরচও অনেকটা বেড়ে যাবে।

নতুন এই মূল্য কাঠামো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ওপর সরাসরি বড় প্রভাব পড়বে। সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে যারা একেবারেই প্রান্তিক বা লাইফলাইন গ্রাহক, অর্থাৎ যারা শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে। এর ফলে এই শ্রেণির গ্রাহকদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে প্রায় ৩৫ টাকার মতো বেড়ে যাবে। অন্যদিকে, যারা তুলনামূলকভাবে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এবং যাদের মাসিক ব্যবহার ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত পৌঁছায়, তাদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিলের বোঝা এক ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ৬৪৪ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যুৎ বিলের এই মূল অঙ্কের সাথে আনুপাতিক হারে ভ্যাটের পরিমাণও বাড়বে, যা মাস শেষে সাধারণ মধ্যবিত্তের পকেটে বড় টান দেবে।

এই সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দেশের ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য এভাবে দফায় দফায় বাড়ানো হলে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব জনজীবনের ওপর পড়তে বাধ্য। এর আগে যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল, তখনই বাজারে এক ধরনের মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছিল এবং নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগেছিল। বিদ্যুৎ খাতের এই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করার আগে যখন গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন ভোক্তা অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাম না বাড়ানোর পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই গণশুনানির কোনো পরামর্শ বা জনমতের মূল্যায়ন করেনি। এবার একেবারে সর্বনিম্ন ৫০ ইউনিট থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬০০ ইউনিটের ওপর যেভাবে দাম বাড়ানো হলো, তার চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরেই দেখা যাবে। বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলে, সেগুলোর চার্জিং খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে যাতায়াত ভাড়াও বৃদ্ধি পাবে। আর পরিবহন ভাড়া বাড়লে তার প্রভাব আবার নতুন করে দ্রব্যমূল্যের ওপর গিয়ে পড়বে। সরকারের উচিত ছিল সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা না চাপিয়ে বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়, সেই জায়গাগুলোতে কঠোর হওয়া। সেখান থেকে অপচয় রোধ করতে পারলে এই বাড়তি মূল্যের বোঝা হয়তো জনগণকে বইতে হতো না।

একইভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারাও এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন শীর্ষনেতা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এই নতুন দামের কারণে পোশাক কারখানার উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে। পোশাক খাতের বড় সমস্যা হলো, বর্তমানে যে সমস্ত ক্রয়াদেশের কাজ কারখানায় চলছে, সেগুলোর চুক্তি বা দরদাম চূড়ান্ত হয়েছিল আজ থেকে অন্তত তিন মাস আগে। সেই সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ বিবেচনা করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন উৎপাদন চলাকালীন অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় পোশাক মালিকদের পকেট থেকে এই বাড়তি খরচ দিতে হবে, যার ফলে সামগ্রিক ব্যবসা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে এবং বিশ্ববাজারে দেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাইকারি, খুচরা এবং সঞ্চালন—সব পর্যায়েই দাম বাড়ানোর এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকার রমনায় অবস্থিত সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান এই নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশ করেন। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় খুচরা মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা scratch ৬৩ পয়সায়। আর পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের মূল্য ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। সঞ্চালন চার্জও প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় দশমিক ৩১৩৫ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দশমিক ৩৮৮৬ টাকা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনের প্রধান কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, এই দাম বাড়ানোর পেছনে তাদের ওপর সরাসরি কোনো বাহ্যিক চাপ ছিল না, বরং আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে দেশের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেলাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সমীক্ষা এখনো করা হয়নি।

নতুন খুচরা মূল্যহারের বিস্তারিত বিন্যাস অনুযায়ী, আবাসিক খাতে প্রথম ধাপে অর্থাৎ শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের দাম প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের জন্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ১০ পয়সা, চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটের জন্য ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। শুধু আবাসিক খাতই নয়, দেশের কৃষি এবং শিল্প খাতেও এর বড় প্রভাব পড়বে। সেচ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাম্পের জন্য নিম্নচাপে প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ও অফিসের ক্ষেত্রে সাধারণ সময়ে ইউনিটপ্রতি ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা, অফপিকে ১৩ টাকা ৮২ পয়সা এবং পিক আওয়ারে বা ব্যস্ত সময়ে ১৮ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৪৬ পয়সা, ক্ষুদ্রশিল্পের ক্ষেত্রে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং নির্মাণশিল্পে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৯ পয়সা করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের ক্ষেত্রেও দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকেও কিছুটা ব্যয়বহুল করে তুলবে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


লাগামহীন ব্যয়ে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬

featured Image

ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে পরপর দুবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তেলের পর বিদ্যুতের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে এক বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের খুচরা, পাইকারি এবং সঞ্চালন—তিনটি স্তরেই একযোগে এই দাম বাড়ানো হয়েছে, যা চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গণপরিবহন ও সেবামূলক খাতের খরচও অনেকটা বেড়ে যাবে।

নতুন এই মূল্য কাঠামো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ওপর সরাসরি বড় প্রভাব পড়বে। সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে যারা একেবারেই প্রান্তিক বা লাইফলাইন গ্রাহক, অর্থাৎ যারা শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে। এর ফলে এই শ্রেণির গ্রাহকদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে প্রায় ৩৫ টাকার মতো বেড়ে যাবে। অন্যদিকে, যারা তুলনামূলকভাবে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এবং যাদের মাসিক ব্যবহার ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত পৌঁছায়, তাদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিলের বোঝা এক ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ৬৪৪ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যুৎ বিলের এই মূল অঙ্কের সাথে আনুপাতিক হারে ভ্যাটের পরিমাণও বাড়বে, যা মাস শেষে সাধারণ মধ্যবিত্তের পকেটে বড় টান দেবে।

এই সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দেশের ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য এভাবে দফায় দফায় বাড়ানো হলে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব জনজীবনের ওপর পড়তে বাধ্য। এর আগে যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল, তখনই বাজারে এক ধরনের মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছিল এবং নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগেছিল। বিদ্যুৎ খাতের এই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করার আগে যখন গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন ভোক্তা অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাম না বাড়ানোর পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই গণশুনানির কোনো পরামর্শ বা জনমতের মূল্যায়ন করেনি। এবার একেবারে সর্বনিম্ন ৫০ ইউনিট থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬০০ ইউনিটের ওপর যেভাবে দাম বাড়ানো হলো, তার চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরেই দেখা যাবে। বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলে, সেগুলোর চার্জিং খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে যাতায়াত ভাড়াও বৃদ্ধি পাবে। আর পরিবহন ভাড়া বাড়লে তার প্রভাব আবার নতুন করে দ্রব্যমূল্যের ওপর গিয়ে পড়বে। সরকারের উচিত ছিল সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা না চাপিয়ে বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়, সেই জায়গাগুলোতে কঠোর হওয়া। সেখান থেকে অপচয় রোধ করতে পারলে এই বাড়তি মূল্যের বোঝা হয়তো জনগণকে বইতে হতো না।

একইভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারাও এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন শীর্ষনেতা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এই নতুন দামের কারণে পোশাক কারখানার উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে। পোশাক খাতের বড় সমস্যা হলো, বর্তমানে যে সমস্ত ক্রয়াদেশের কাজ কারখানায় চলছে, সেগুলোর চুক্তি বা দরদাম চূড়ান্ত হয়েছিল আজ থেকে অন্তত তিন মাস আগে। সেই সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ বিবেচনা করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন উৎপাদন চলাকালীন অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় পোশাক মালিকদের পকেট থেকে এই বাড়তি খরচ দিতে হবে, যার ফলে সামগ্রিক ব্যবসা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে এবং বিশ্ববাজারে দেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাইকারি, খুচরা এবং সঞ্চালন—সব পর্যায়েই দাম বাড়ানোর এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকার রমনায় অবস্থিত সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান এই নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশ করেন। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় খুচরা মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা scratch ৬৩ পয়সায়। আর পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের মূল্য ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। সঞ্চালন চার্জও প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় দশমিক ৩১৩৫ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দশমিক ৩৮৮৬ টাকা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনের প্রধান কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, এই দাম বাড়ানোর পেছনে তাদের ওপর সরাসরি কোনো বাহ্যিক চাপ ছিল না, বরং আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে দেশের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেলাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সমীক্ষা এখনো করা হয়নি।

নতুন খুচরা মূল্যহারের বিস্তারিত বিন্যাস অনুযায়ী, আবাসিক খাতে প্রথম ধাপে অর্থাৎ শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের দাম প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের জন্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ১০ পয়সা, চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটের জন্য ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। শুধু আবাসিক খাতই নয়, দেশের কৃষি এবং শিল্প খাতেও এর বড় প্রভাব পড়বে। সেচ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাম্পের জন্য নিম্নচাপে প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ও অফিসের ক্ষেত্রে সাধারণ সময়ে ইউনিটপ্রতি ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা, অফপিকে ১৩ টাকা ৮২ পয়সা এবং পিক আওয়ারে বা ব্যস্ত সময়ে ১৮ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৪৬ পয়সা, ক্ষুদ্রশিল্পের ক্ষেত্রে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং নির্মাণশিল্পে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৯ পয়সা করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের ক্ষেত্রেও দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকেও কিছুটা ব্যয়বহুল করে তুলবে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল