এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা দেশের বিবেকবান ও সংবেদনশীল মানুষের জন্য কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে গভীর বেদনা আর শোকে। উৎসবের ঠিক আগের দিন রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ ও নির্বাক করে দিয়েছে। এই এক ঘটনাই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে শিশুদের জন্য এক অনিরাপদ জনপদে পরিণত হয়েছে। দেশের কোথাও যেন আজ শিশুরা সুরক্ষিত নয়। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে গৃহকোণ—সবখানেই শিশুরা অপহরণ ও নানামুখী নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যার গ্রাফ দিন দিন কেবল ঊর্ধ্বমুখী।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুদের দ্বিতীয় আশ্রয়স্থল মনে করা হয়, সেখানেও আজ তারা চরম অনিরাপদ ও নির্যাতিত। পিতৃতুল্য শিক্ষকের মুখোশধারী কিছু নরপিশাচের পাশবিক লালসার শিকার হয়ে বহু শিশুর সম্ভাবনাময় জীবন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অসুস্থ শিশুদের সুস্থ করার শেষ আশ্রয়স্থল হাসপাতালগুলোও আজ যেন অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে মরণফাঁদে রূপান্তরিত হয়েছে। ঢাকার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণে যে ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল, তা দেশের সাধারণ মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এ রাষ্ট্রে শিশুদের জীবন কতটা সস্তা, অসহায় ও মূল্যহীন। এই অমানবিক ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ, গভীর শোক ও ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক আখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, চিকিৎসায় অবহেলার এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা বা আপস করা হবে না এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে, অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন মৃত এক নবজাতকের পিতা হাবিবুর রহমান। মামলায় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সরাসরি আসামি করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় রয়েই গেছে। অতীতেও এমন বহু ঘটনা নিয়ে কিছুদিন শোরগোল হয়েছে, তারপর একসময় সবকিছু আড়ালে চলে গেছে। জনমানুষের মন থেকে শোকের দাগ মুছে গেছে এবং সমাজ আবার পুরনো অনিয়মকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু যে দুর্ভাগা মা-বাবা তাদের কলিজার টুকরো সন্তানকে হারিয়েছেন, তাদের এই বুকফাটা হাহাকার আর আজীবনের শূন্যতা কোনো সান্ত্বনা বা আইনি প্রক্রিয়া দিয়ে কি আদেও পূরণ করা সম্ভব?
এই নবজাতক মৃত্যুর শোকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় দেশজুড়ে চলা হামের প্রকোপে শিশুদের মৃত্যুর অন্তহীন মিছিল। ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছয়শত ছাড়িয়ে গেছে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার পর অন্তত একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস মিলেছে, যা সন্তানহারা পিতা-মাতাকে সাময়িক আইনি সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে যে শত শত শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের অসহায় অভিভাবকেরা কার কাছে গিয়ে সান্ত্বনা খুঁজবেন? একটি শিশুর অকাল প্রয়াণ মানে কেবল একটি পরিবারের চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা একজন মায়ের আজীবন শোকে পাথর হয়ে যাওয়া নয়; এটি একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আঁতুড়ঘরেই দাফন করার শামিল।
সমগ্র দেশে আজ যেন শিশুমৃত্যুর এক নীরব ও দীর্ঘ মিছিল চলছে, যা প্রতিদিন আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অথচ এই লোমহর্ষক ও ভয়াবহ পরিস্থিতিও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তেমন কোনো বড় আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারছে না। রোগ সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কোনো দূরদর্শী বা সর্বাত্মক জাতীয় উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের খতিয়ান দেখিয়েই যেন নিজেদের দায়িত্ব শেষ ভাবছে, আর সাধারণ মানুষও যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় মগ্ন। কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন শিশুটি বিনা চিকিৎসায় মারা গেল আর কোন মায়ের কোল খালি হলো, তা দেখার বা ভাবার সময় যেন আজ এই আত্মকেন্দ্রিক সমাজের কারও নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সভ্য সমাজ ধীরে ধীরে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া এই শিশুমৃত্যুকেও অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। অথচ প্রতিটি শিশুর অকালমৃত্যু আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যর্থতার একেকটি অকাট্য দলিল। কোনো বিবেকবান জাতি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই করুণ পরিণতিকে মুখ বুজে সয়ে নিতে পারে না। প্রশ্ন জাগে, এত বিপুল সংখ্যক শিশুর প্রাণহানির পরও কেন এখনো জাতীয় পর্যায়ে জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করা হলো না? কেন প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরের প্রধান হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ও আলাদা চিকিৎসা ইউনিট চালু করা সম্ভব হলো না? কেন প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে জরুরি নজরদারি, দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল না? স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের এই অভাব সত্যিই প্রশ্নবিদ্ধ।
দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বা সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার কারণেই হামের এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর দায় নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের অবহেলার ওপরই বর্তায়। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না, তখন সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্য আরেকটি বড় অপরাধের জন্ম দেয়। হামে শিশুদের মৃত্যুর জন্য যদি শুরুতেই দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা যেত, তবে হয়তো আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নবজাতকদের সুরক্ষায় এতটা উদাসীন থাকার সাহস পেত না। এমনকি চিকিৎসায় অবহেলার খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা করার মতো ধৃষ্টতাও তারা দেখাতে পারত না। এটাই হলো আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার অভাবের চরম নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ।
হাসপাতালের আঙিনা বাদ দিলে নিজের ঘর কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুরা আজ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। কিছু দিন আগেই দ্বিতীয় শ্রেণির এক নিষ্পাপ শিশু শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও সেই ঘটনার পর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং জনমতের চাপে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, কিন্তু অতীতে ঘটে যাওয়া এমন অসংখ্য লোমহর্ষক ঘটনার বিচার আজও ঝুলে রয়েছে। বছর তিনেক আগে ঢাকার পল্লবী এলাকায় এক শিশুকে কেয়ারটেকার কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, যার বিচারিক প্রক্রিয়া আজও শুরু করা যায়নি এবং আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। একইভাবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লার নাট্যকর্মী ও কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়নি। মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় আট বছরের এক শিশুকে অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনায় আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেও উচ্চ আদালতে আপিল ও শুনানির দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই রায় এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘমেয়াদী বিচারহীনতা ও আইনি জটিলতাই অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।
দেশের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় চার কোটি ঊননব্বই লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ। আর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু ধরলে এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। এই বিপুলসংখ্যক শিশু আজ চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সুরক্ষাহীনতার মধ্যে বড় হচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বছরের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু নৃশংস ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং পাশবিকতার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু শিশু।
আমাদের মনে রাখা দরকার, এই শিশুরা কোনো খাতা-কলমের পরিসংখ্যান বা সংখ্যা নয়। তারা এই রাষ্ট্রের আগামী দিনের কর্ণধার ও আমাদের মানবিক মূল্যবোধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাদের এই মৃত্যুর মিছিল যদি কোনোভাবেই রোধ করা না যায়, তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দৃশ্যমান উন্নয়ন কিংবা সমৃদ্ধির সব স্লোগানই সম্পূর্ণ অর্থহীন ও ফাঁপা বলে প্রমাণিত হবে। একটি সভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টের চকমকে আলোয় নয়, বরং রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিশুদের জীবন রক্ষায় এবং তাদের নিরাপদ বিকাশে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে। আজ প্রতিটি নাগরিকের নিজের বিবেকের কাছেই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে যে, আমরা কি সত্যিই একটি মানবিক সমাজ হিসেবে বেঁচে আছি, নাকি এক চরম নিষ্ঠুর ও অন্ধ উদাসীনতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি? আর কত নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ গেলে আমাদের এই ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হবে, সেই উত্তর আজ সমাজ ও রাষ্ট্রকে দিতেই হবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা দেশের বিবেকবান ও সংবেদনশীল মানুষের জন্য কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে গভীর বেদনা আর শোকে। উৎসবের ঠিক আগের দিন রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ ও নির্বাক করে দিয়েছে। এই এক ঘটনাই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে শিশুদের জন্য এক অনিরাপদ জনপদে পরিণত হয়েছে। দেশের কোথাও যেন আজ শিশুরা সুরক্ষিত নয়। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে গৃহকোণ—সবখানেই শিশুরা অপহরণ ও নানামুখী নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যার গ্রাফ দিন দিন কেবল ঊর্ধ্বমুখী।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুদের দ্বিতীয় আশ্রয়স্থল মনে করা হয়, সেখানেও আজ তারা চরম অনিরাপদ ও নির্যাতিত। পিতৃতুল্য শিক্ষকের মুখোশধারী কিছু নরপিশাচের পাশবিক লালসার শিকার হয়ে বহু শিশুর সম্ভাবনাময় জীবন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অসুস্থ শিশুদের সুস্থ করার শেষ আশ্রয়স্থল হাসপাতালগুলোও আজ যেন অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে মরণফাঁদে রূপান্তরিত হয়েছে। ঢাকার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণে যে ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল, তা দেশের সাধারণ মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এ রাষ্ট্রে শিশুদের জীবন কতটা সস্তা, অসহায় ও মূল্যহীন। এই অমানবিক ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ, গভীর শোক ও ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক আখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, চিকিৎসায় অবহেলার এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা বা আপস করা হবে না এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে, অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন মৃত এক নবজাতকের পিতা হাবিবুর রহমান। মামলায় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সরাসরি আসামি করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় রয়েই গেছে। অতীতেও এমন বহু ঘটনা নিয়ে কিছুদিন শোরগোল হয়েছে, তারপর একসময় সবকিছু আড়ালে চলে গেছে। জনমানুষের মন থেকে শোকের দাগ মুছে গেছে এবং সমাজ আবার পুরনো অনিয়মকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু যে দুর্ভাগা মা-বাবা তাদের কলিজার টুকরো সন্তানকে হারিয়েছেন, তাদের এই বুকফাটা হাহাকার আর আজীবনের শূন্যতা কোনো সান্ত্বনা বা আইনি প্রক্রিয়া দিয়ে কি আদেও পূরণ করা সম্ভব?
এই নবজাতক মৃত্যুর শোকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় দেশজুড়ে চলা হামের প্রকোপে শিশুদের মৃত্যুর অন্তহীন মিছিল। ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছয়শত ছাড়িয়ে গেছে। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার পর অন্তত একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস মিলেছে, যা সন্তানহারা পিতা-মাতাকে সাময়িক আইনি সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে যে শত শত শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের অসহায় অভিভাবকেরা কার কাছে গিয়ে সান্ত্বনা খুঁজবেন? একটি শিশুর অকাল প্রয়াণ মানে কেবল একটি পরিবারের চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা একজন মায়ের আজীবন শোকে পাথর হয়ে যাওয়া নয়; এটি একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আঁতুড়ঘরেই দাফন করার শামিল।
সমগ্র দেশে আজ যেন শিশুমৃত্যুর এক নীরব ও দীর্ঘ মিছিল চলছে, যা প্রতিদিন আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অথচ এই লোমহর্ষক ও ভয়াবহ পরিস্থিতিও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তেমন কোনো বড় আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারছে না। রোগ সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কোনো দূরদর্শী বা সর্বাত্মক জাতীয় উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের খতিয়ান দেখিয়েই যেন নিজেদের দায়িত্ব শেষ ভাবছে, আর সাধারণ মানুষও যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় মগ্ন। কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন শিশুটি বিনা চিকিৎসায় মারা গেল আর কোন মায়ের কোল খালি হলো, তা দেখার বা ভাবার সময় যেন আজ এই আত্মকেন্দ্রিক সমাজের কারও নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সভ্য সমাজ ধীরে ধীরে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া এই শিশুমৃত্যুকেও অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। অথচ প্রতিটি শিশুর অকালমৃত্যু আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যর্থতার একেকটি অকাট্য দলিল। কোনো বিবেকবান জাতি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই করুণ পরিণতিকে মুখ বুজে সয়ে নিতে পারে না। প্রশ্ন জাগে, এত বিপুল সংখ্যক শিশুর প্রাণহানির পরও কেন এখনো জাতীয় পর্যায়ে জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করা হলো না? কেন প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরের প্রধান হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ও আলাদা চিকিৎসা ইউনিট চালু করা সম্ভব হলো না? কেন প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে জরুরি নজরদারি, দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল না? স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের এই অভাব সত্যিই প্রশ্নবিদ্ধ।
দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বা সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার কারণেই হামের এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর দায় নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের অবহেলার ওপরই বর্তায়। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না, তখন সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্য আরেকটি বড় অপরাধের জন্ম দেয়। হামে শিশুদের মৃত্যুর জন্য যদি শুরুতেই দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা যেত, তবে হয়তো আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নবজাতকদের সুরক্ষায় এতটা উদাসীন থাকার সাহস পেত না। এমনকি চিকিৎসায় অবহেলার খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা করার মতো ধৃষ্টতাও তারা দেখাতে পারত না। এটাই হলো আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার অভাবের চরম নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ।
হাসপাতালের আঙিনা বাদ দিলে নিজের ঘর কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুরা আজ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। কিছু দিন আগেই দ্বিতীয় শ্রেণির এক নিষ্পাপ শিশু শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও সেই ঘটনার পর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং জনমতের চাপে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, কিন্তু অতীতে ঘটে যাওয়া এমন অসংখ্য লোমহর্ষক ঘটনার বিচার আজও ঝুলে রয়েছে। বছর তিনেক আগে ঢাকার পল্লবী এলাকায় এক শিশুকে কেয়ারটেকার কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, যার বিচারিক প্রক্রিয়া আজও শুরু করা যায়নি এবং আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। একইভাবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লার নাট্যকর্মী ও কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়নি। মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় আট বছরের এক শিশুকে অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনায় আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেও উচ্চ আদালতে আপিল ও শুনানির দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই রায় এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘমেয়াদী বিচারহীনতা ও আইনি জটিলতাই অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।
দেশের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় চার কোটি ঊননব্বই লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ। আর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু ধরলে এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। এই বিপুলসংখ্যক শিশু আজ চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সুরক্ষাহীনতার মধ্যে বড় হচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বছরের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু নৃশংস ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং পাশবিকতার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু শিশু।
আমাদের মনে রাখা দরকার, এই শিশুরা কোনো খাতা-কলমের পরিসংখ্যান বা সংখ্যা নয়। তারা এই রাষ্ট্রের আগামী দিনের কর্ণধার ও আমাদের মানবিক মূল্যবোধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাদের এই মৃত্যুর মিছিল যদি কোনোভাবেই রোধ করা না যায়, তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দৃশ্যমান উন্নয়ন কিংবা সমৃদ্ধির সব স্লোগানই সম্পূর্ণ অর্থহীন ও ফাঁপা বলে প্রমাণিত হবে। একটি সভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টের চকমকে আলোয় নয়, বরং রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিশুদের জীবন রক্ষায় এবং তাদের নিরাপদ বিকাশে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে। আজ প্রতিটি নাগরিকের নিজের বিবেকের কাছেই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে যে, আমরা কি সত্যিই একটি মানবিক সমাজ হিসেবে বেঁচে আছি, নাকি এক চরম নিষ্ঠুর ও অন্ধ উদাসীনতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি? আর কত নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ গেলে আমাদের এই ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হবে, সেই উত্তর আজ সমাজ ও রাষ্ট্রকে দিতেই হবে।

আপনার মতামত লিখুন