চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের উপকূলীয় পূর্ব পাশে অবস্থিত সমুদ্র চ্যানেলের তীরবর্তী অংশে সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই নদী ও সাগর মোহনার তীব্র ভাঙনের ফলে সন্দ্বীপের মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহের একমাত্র ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩৩ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন সৈয়দপুর-বাউরিয়া সাবমেরিন কেবলের একটি বড় অংশ মাটির নিচ থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশে পোতা শক্তিশালী বৈদ্যুতিক তার দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তামা বা মূল্যবান ধাতু চুরির বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সাথে উন্মুক্ত এই উচ্চ ভোল্টেজের লাইনের কারণে পুরো দ্বীপ জুড়েই এক মহাবিপর্যয় বা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নেওয়া প্রথম এই সাবমেরিন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি সংস্কার বা মেরামতের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা দেশীয় প্রকৌশলীদের না থাকায়, বর্তমান পরিস্থিতি সন্দ্বীপের সাধারণ গ্রাহক এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির কর্মকর্তাদের জন্য এক মস্ত বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নেওয়া এই ধরণের সাবমেরিন কেবল লাইনে হঠাৎ কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা বৈদ্যুতিক তার মাটি থেকে দৃশ্যমান হয়ে পড়লে ঝুঁকি এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় কী হতে পারে, সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা কারিগরি জ্ঞান নেই। এমনকি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এই ধরণের সংকটকালীন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, বিশেষ প্রশিক্ষণ কিংবা কারিগরি দক্ষতার কোনো বিনিময় করা হয়নি। পিডিবির আঞ্চলিক বিতরণ ও প্রকৌশল বিভাগও ভবিষ্যতে এই ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সংকট তৈরি হতে পারে—এমন ভাবনা থেকে কোনো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা বিকল্প প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি। ফলশ্রুতিতে, অত্যন্ত সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন সমুদ্র উপকূলের তীব্র ভাঙনে মূল বৈদ্যুতিক লাইনটি মাটি ফুঁড়ে সমুদ্রকূলে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তখন এই মহাবিপদ সমাধানের জন্য বিদ্যুৎ সংস্থার পক্ষ থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে কোনো তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে পিডিবি কর্তৃপক্ষ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবোর শরণাপন্ন হলেও সেখান থেকে কোনো আশাব্যঞ্জক প্রতিকার বা স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের নথিপত্র ও ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর সমুদ্র উপকূল থেকে মূল চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৩ কেভি ক্ষমতার দুটি শক্তিশালী কেবল সমুদ্রের তলদেশে স্থাপনের মাধ্যমে এই গ্রিড সংযোগের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে সন্দ্বীপের ভেতরে ১৬ কিলোমিটার এবং সীতাকুণ্ড অংশে ১০ কিলোমিটার ওভারহেড বা মাটির ওপর দিয়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছিল। শুরুর দিকে কেবল একটি লাইনের মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রাথমিক ব্যবস্থা করা হলেও, বর্তমানে দ্বীপের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক গ্রাহক প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তবে এই দুটি লাইনের মাধ্যমে আগামী ৫০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সর্বোচ্চ ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের বিশাল সক্ষমতা রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপে মূল জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য ১৪৪ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে চীনের বিখ্যাত কোম্পানি জেডটিটি এই বড় প্রকল্পের কাজ পেলেও, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সময় চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ‘চীনের এসবি সাবমেরিন সিস্টেমস কোম্পানি লিমিটেড’ নামের আরেকটি অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ কারিগরি সহযোগিতা নিয়েছিল।
সরেজমিনে জানা গেছে, সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নের সমুদ্র চ্যানেলের উপকূলে মাটির নিচ থেকে প্রায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য জুড়ে মূল দুটি বৈদ্যুতিক তার পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং ওই উপকূলীয় এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ইতিমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে পিডিবি। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে দেওয়া সেই চিঠিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপকূলের খাড়া অংশের মাটি ধসে যাওয়ার ফলে নিচ থেকে বের হয়ে আসা ৩৩ হাজার ভোল্টের সাবমেরিন কেবল দুটি বর্তমানে চরম অরক্ষিত ও বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তারগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় কৌতূহলী শিশু-কিশোর এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক সাধারণ মানুষও প্রতিদিন সেই তারের ওপর উঠে বসা, দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এবং দলবেঁধে ভিড় জমাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরণের বিপজ্জনক ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও বড় দুর্ঘটনা এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে। তবে সমুদ্র চ্যানেলের ওই নির্দিষ্ট খাড়া অংশে হুট করে বাঁধ দিয়ে কেবলগুলো মাটির নিচে পুনঃস্থাপন করার কোনো সুযোগ না থাকায়, সাময়িকভাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা লাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এবং লাল পতাকা উড়িয়ে ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও চলাচল বন্ধ রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিডিবি ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে, সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরবর্তী এলাকায় ৩৩ কেভির দুটি বৈদ্যুতিক তার দৃশ্যমান হওয়ার চাঞ্চল্যকর খবর এবং পিডিবির পাঠানো চিঠি পাওয়ার পর পাউবোর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রকৌশলী দল ঘটনাস্থল সশরীরে পরিদর্শন করেছেন। তবে পরিদর্শনের পর পাউবোর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সন্দ্বীপ রক্ষার জন্য নির্মিত মূল সরকারি বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার বাইরে সম্পূর্ণ ভাঙনকবলিত সমুদ্রের মূল চ্যানেলের ভেতরে কেবলগুলো দৃশ্যমান হওয়ায়, এই মুহূর্তে সেখানে নদী বা তীর সংরক্ষণের কোনো কাজ করার আইনি বা কারিগরি সুযোগ তাদের নেই। প্রাকৃতিক সামুদ্রিক উপকূলের এই তীব্র ভাঙনের মুখে কেবলগুলোর সুরক্ষায় বিশেষ কোনো আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা ছাড়া স্থানীয়ভাবে কোনো সাধারণ ব্লক বা বেড়িবাঁধ দিয়ে এটি রক্ষা করা অসম্ভব বলেই দাবি করেছেন পাউবোর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
উন্মুক্ত হয়ে পড়া সাবমেরিন কেবলের দৃশ্যমান অংশ সুরক্ষার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী-২ ডক্টর তানজির সাইফ আহমেদ জানান, পিডিবির চিঠি পাওয়ার পর পরই তাদের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। মূল বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার গভীর চ্যানেলের ভেতরে ভাঙন এলাকায় বৈদ্যুতিক তার মাটির ভেতর থেকে বের হয়ে আসায় সেখানে এই মুহূর্তে সাধারণ কোনো সংস্কার কাজ করার প্রযুক্তিগত সুযোগ নেই। তীব্র স্রোতপ্রবাহের কারণে ভাঙনকবলিত অংশে চ্যানেলের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে মাটি ভরাট করা কিংবা সিসি ব্লক বা জিওব্যাগ ফেলার সুযোগও নেই বললেই চলে। তারা খুব শীঘ্রই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের এই সীমাবদ্ধতা ও অপারগতার বিষয়টি পিডিবি কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেবেন।
বিদ্যুৎ ও ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণ সংক্রান্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, ৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিশাল বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতার এই মোটা তারগুলো এভাবে রোদে-পানিতে মাটির ওপর উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এর ওপরের সুরক্ষামূলক আস্তরণে ফাটল বা লিকেজ তৈরি হওয়ার মস্ত বড় ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় কেবল কেটে লোহা বা তামা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার যে সামাজিক ঝুঁকি রয়েছে, তা পুরো দ্বীপের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদি কোনো কারণে তারের ওপরের আস্তরণে সামান্যতম লিকেজ বা ফাটল তৈরি হয়, তবে ওই কেবলের সংস্পর্শে আসা বা আশপাশে থাকা যেকোনো মানুষ বা পশুপাখির তাৎক্ষণিক মৃত্যু অনিবার্য। শুধু তাই নয়, উন্মুক্ত এই কেবলের ওপর দিয়ে জোয়ার-ভাটার সময় কোনো নৌযান বা কার্গো জাহাজ চলাচল করলে, সেগুলোর ভারী নোঙর বা যেকোনো শক্ত ধাতব অংশের সাথে লেগে তারটি মাঝখান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনটা হলে সামুদ্রিক ওই অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট এলাকার পুরো পানি মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়তে পারে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য যেমন ধ্বংসাত্মক হবে, তেমনি সন্দ্বীপের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এক দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় সংকটের মধ্যে পড়বে বলে তারা গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এক্ষেত্রে কেবল স্থাপনকারী সেই মূল বিদেশী প্রতিষ্ঠান কিংবা এ-সংক্রান্ত উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন কোনো দক্ষ প্রকৌশল সংস্থার কারিগরি সাহায্য ছাড়া সন্দ্বীপের এই সাবমেরিন কেবলের সংকট এড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাবমেরিন কেবলের মূল সঞ্চালন লাইন সমুদ্র কিংবা সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরবর্তী এলাকায় এভাবে হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে যাওয়া তাদের দীর্ঘ চাকরি জীবনের জন্য সম্পূর্ণ একটি নতুন ও নজিরবিহীন ঘটনা। ফলে এই সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় কী হতে পারে, তা তারা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারেননি। তবে দৃশ্যমান উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী এই জাতীয় তারগুলোর বাহ্যিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, স্থানীয় অসচেতন সাধারণ মানুষকে কেবলের সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত রাখা এবং দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের হাজার হাজার মানুষের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো ধরণের চুরি বা নাশকতা এড়াতে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং উপজেলা প্রশাসনকেও সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক প্রবীণ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন যে, প্রকল্পটি চালু হওয়ার মাত্র সাত থেকে আট বছরের মধ্যেই সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরের ভাঙনে মূল বৈদ্যুতিক তার দৃশ্যমান হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সমস্যা সমাধানের আধুনিক কোনো প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি আপাতত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। তাই এই প্রকল্প গ্রহণের সময় সমুদ্রের তলদেশের মাটির প্রকৃতি ও সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিকভাবে করা হয়েছিল কিনা, কিংবা সংকটকালে কীভাবে এর থেকে উত্তরণ সম্ভব—সেই দূরদর্শী পরিকল্পনায় কোনো গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কিনা, সেটি এখন উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ভাঙন যদি আরও তীব্র আকার ধারণ করে, তবে তীরবর্তী এলাকায় চলাচলকারী বিভিন্ন মালবাহী নৌযানের নিচের অংশের আঘাতে কেবল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপে মূল গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ টেনে নিতে মোট ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশেষ বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবহার করা হয়েছে। এই সঞ্চালন লাইনটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড উপকূলীয় এলাকা থেকে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপের বাউরিয়া এলাকায় এসে সংযুক্ত হয়েছে। প্রকল্প শুরুর সময় রোবটিক প্রযুক্তির সাহায্যে বড় জাহাজ থেকে কেবল দুটি চ্যানেলের তলদেশের শক্ত মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরতা খুঁড়ে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বসানো হয়েছিল। তবে সমুদ্রের মূল অংশ পার হয়ে তীরবর্তী স্থলভাগের কাছাকাছি এলাকায় এসে কেবল দুটির ভূগর্ভস্থ গভীরতা ১০ ফুট থেকে কমে মাত্র পাঁচ ফুটে নেমে আসে। ঠিক এই কারণেই বাউরিয়া ইউনিয়ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক কারণে তীব্র ভাঙন সৃষ্টি হওয়ায় গভীরতা কম থাকায় বৈদ্যুতিক তার দুটি সহজেই মাটির ওপর দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও তীব্র হলে সাবমেরিন কেবলটি আরও দীর্ঘ অংশ জুড়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে, যা সন্দ্বীপের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিডিবির স্থানীয় প্রকৌশলীরা হতাশা প্রকাশ করে বলছেন যে, সাত-আট বছর আগে যখন রোবটিক প্রযুক্তিতে এই বৈদ্যুতিক তার বসানো হয়েছিল, তখন দেশীয় কোনো প্রকৌশলীকে এর রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এখন দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভূগর্ভস্থ উন্মুক্ত কেবল পুনরায় মাটির নিচে নিরাপদে পোতা বা ব্লক দেওয়া আপাতত অসম্ভব। তাই সেই পুরোনো চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জরুরি ভিত্তিতে কারিগরি সাহায্য ও উদ্ধারকারী জাহাজ চাওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে এই মহাকেন্দ্রীক সংকট সমাধানের আর কোনো সহজ উপায় তাদের সামনে খোলা নেই।
উল্লেখ্য যে, বিগত ২০১৮ সালের আগে সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষ জাতীয় গ্রিডের কোনো বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন না। তখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা সরকারি ভারী জেনারেটরের মাধ্যমে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ও চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। প্রতিদিন কেবল সন্ধ্যা ৬টা থেকে পৌর এলাকার মাত্র আড়াই হাজার গ্রাহককে রাত ১১টা পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া হতো। প্রায় চার লাখ জনসংখ্যার এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় দ্বীপটিতে বর্তমানে পিডিবির বৈধ বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ হাজারে। সন্দ্বীপে বর্তমানে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রসারের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। পিডিবি কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো দ্বীপকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে সন্দ্বীপে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে বিতরণ করার এক বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সাবমেরিন কেবলের এই আকস্মিক উন্মুক্ততা এখন দ্বীপের সেই আলোকিত ভবিষ্যৎকে এক মস্ত বড় অন্ধকারের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের উপকূলীয় পূর্ব পাশে অবস্থিত সমুদ্র চ্যানেলের তীরবর্তী অংশে সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই নদী ও সাগর মোহনার তীব্র ভাঙনের ফলে সন্দ্বীপের মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহের একমাত্র ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩৩ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন সৈয়দপুর-বাউরিয়া সাবমেরিন কেবলের একটি বড় অংশ মাটির নিচ থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশে পোতা শক্তিশালী বৈদ্যুতিক তার দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তামা বা মূল্যবান ধাতু চুরির বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সাথে উন্মুক্ত এই উচ্চ ভোল্টেজের লাইনের কারণে পুরো দ্বীপ জুড়েই এক মহাবিপর্যয় বা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নেওয়া প্রথম এই সাবমেরিন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি সংস্কার বা মেরামতের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা দেশীয় প্রকৌশলীদের না থাকায়, বর্তমান পরিস্থিতি সন্দ্বীপের সাধারণ গ্রাহক এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির কর্মকর্তাদের জন্য এক মস্ত বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নেওয়া এই ধরণের সাবমেরিন কেবল লাইনে হঠাৎ কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা বৈদ্যুতিক তার মাটি থেকে দৃশ্যমান হয়ে পড়লে ঝুঁকি এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় কী হতে পারে, সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা কারিগরি জ্ঞান নেই। এমনকি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এই ধরণের সংকটকালীন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, বিশেষ প্রশিক্ষণ কিংবা কারিগরি দক্ষতার কোনো বিনিময় করা হয়নি। পিডিবির আঞ্চলিক বিতরণ ও প্রকৌশল বিভাগও ভবিষ্যতে এই ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সংকট তৈরি হতে পারে—এমন ভাবনা থেকে কোনো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা বিকল্প প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি। ফলশ্রুতিতে, অত্যন্ত সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর যখন সমুদ্র উপকূলের তীব্র ভাঙনে মূল বৈদ্যুতিক লাইনটি মাটি ফুঁড়ে সমুদ্রকূলে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তখন এই মহাবিপদ সমাধানের জন্য বিদ্যুৎ সংস্থার পক্ষ থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে কোনো তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে পিডিবি কর্তৃপক্ষ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবোর শরণাপন্ন হলেও সেখান থেকে কোনো আশাব্যঞ্জক প্রতিকার বা স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের নথিপত্র ও ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর সমুদ্র উপকূল থেকে মূল চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৩ কেভি ক্ষমতার দুটি শক্তিশালী কেবল সমুদ্রের তলদেশে স্থাপনের মাধ্যমে এই গ্রিড সংযোগের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে সন্দ্বীপের ভেতরে ১৬ কিলোমিটার এবং সীতাকুণ্ড অংশে ১০ কিলোমিটার ওভারহেড বা মাটির ওপর দিয়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছিল। শুরুর দিকে কেবল একটি লাইনের মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রাথমিক ব্যবস্থা করা হলেও, বর্তমানে দ্বীপের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক গ্রাহক প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তবে এই দুটি লাইনের মাধ্যমে আগামী ৫০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সর্বোচ্চ ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের বিশাল সক্ষমতা রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপে মূল জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য ১৪৪ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে চীনের বিখ্যাত কোম্পানি জেডটিটি এই বড় প্রকল্পের কাজ পেলেও, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সময় চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ‘চীনের এসবি সাবমেরিন সিস্টেমস কোম্পানি লিমিটেড’ নামের আরেকটি অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ কারিগরি সহযোগিতা নিয়েছিল।
সরেজমিনে জানা গেছে, সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নের সমুদ্র চ্যানেলের উপকূলে মাটির নিচ থেকে প্রায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য জুড়ে মূল দুটি বৈদ্যুতিক তার পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং ওই উপকূলীয় এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ইতিমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে পিডিবি। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে দেওয়া সেই চিঠিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপকূলের খাড়া অংশের মাটি ধসে যাওয়ার ফলে নিচ থেকে বের হয়ে আসা ৩৩ হাজার ভোল্টের সাবমেরিন কেবল দুটি বর্তমানে চরম অরক্ষিত ও বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তারগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় কৌতূহলী শিশু-কিশোর এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক সাধারণ মানুষও প্রতিদিন সেই তারের ওপর উঠে বসা, দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এবং দলবেঁধে ভিড় জমাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরণের বিপজ্জনক ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও বড় দুর্ঘটনা এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে। তবে সমুদ্র চ্যানেলের ওই নির্দিষ্ট খাড়া অংশে হুট করে বাঁধ দিয়ে কেবলগুলো মাটির নিচে পুনঃস্থাপন করার কোনো সুযোগ না থাকায়, সাময়িকভাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা লাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এবং লাল পতাকা উড়িয়ে ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও চলাচল বন্ধ রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিডিবি ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে, সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরবর্তী এলাকায় ৩৩ কেভির দুটি বৈদ্যুতিক তার দৃশ্যমান হওয়ার চাঞ্চল্যকর খবর এবং পিডিবির পাঠানো চিঠি পাওয়ার পর পাউবোর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রকৌশলী দল ঘটনাস্থল সশরীরে পরিদর্শন করেছেন। তবে পরিদর্শনের পর পাউবোর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সন্দ্বীপ রক্ষার জন্য নির্মিত মূল সরকারি বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার বাইরে সম্পূর্ণ ভাঙনকবলিত সমুদ্রের মূল চ্যানেলের ভেতরে কেবলগুলো দৃশ্যমান হওয়ায়, এই মুহূর্তে সেখানে নদী বা তীর সংরক্ষণের কোনো কাজ করার আইনি বা কারিগরি সুযোগ তাদের নেই। প্রাকৃতিক সামুদ্রিক উপকূলের এই তীব্র ভাঙনের মুখে কেবলগুলোর সুরক্ষায় বিশেষ কোনো আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা ছাড়া স্থানীয়ভাবে কোনো সাধারণ ব্লক বা বেড়িবাঁধ দিয়ে এটি রক্ষা করা অসম্ভব বলেই দাবি করেছেন পাউবোর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
উন্মুক্ত হয়ে পড়া সাবমেরিন কেবলের দৃশ্যমান অংশ সুরক্ষার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী-২ ডক্টর তানজির সাইফ আহমেদ জানান, পিডিবির চিঠি পাওয়ার পর পরই তাদের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। মূল বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার গভীর চ্যানেলের ভেতরে ভাঙন এলাকায় বৈদ্যুতিক তার মাটির ভেতর থেকে বের হয়ে আসায় সেখানে এই মুহূর্তে সাধারণ কোনো সংস্কার কাজ করার প্রযুক্তিগত সুযোগ নেই। তীব্র স্রোতপ্রবাহের কারণে ভাঙনকবলিত অংশে চ্যানেলের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে মাটি ভরাট করা কিংবা সিসি ব্লক বা জিওব্যাগ ফেলার সুযোগও নেই বললেই চলে। তারা খুব শীঘ্রই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের এই সীমাবদ্ধতা ও অপারগতার বিষয়টি পিডিবি কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেবেন।
বিদ্যুৎ ও ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণ সংক্রান্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, ৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিশাল বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতার এই মোটা তারগুলো এভাবে রোদে-পানিতে মাটির ওপর উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এর ওপরের সুরক্ষামূলক আস্তরণে ফাটল বা লিকেজ তৈরি হওয়ার মস্ত বড় ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় কেবল কেটে লোহা বা তামা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার যে সামাজিক ঝুঁকি রয়েছে, তা পুরো দ্বীপের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদি কোনো কারণে তারের ওপরের আস্তরণে সামান্যতম লিকেজ বা ফাটল তৈরি হয়, তবে ওই কেবলের সংস্পর্শে আসা বা আশপাশে থাকা যেকোনো মানুষ বা পশুপাখির তাৎক্ষণিক মৃত্যু অনিবার্য। শুধু তাই নয়, উন্মুক্ত এই কেবলের ওপর দিয়ে জোয়ার-ভাটার সময় কোনো নৌযান বা কার্গো জাহাজ চলাচল করলে, সেগুলোর ভারী নোঙর বা যেকোনো শক্ত ধাতব অংশের সাথে লেগে তারটি মাঝখান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনটা হলে সামুদ্রিক ওই অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট এলাকার পুরো পানি মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়তে পারে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য যেমন ধ্বংসাত্মক হবে, তেমনি সন্দ্বীপের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এক দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় সংকটের মধ্যে পড়বে বলে তারা গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এক্ষেত্রে কেবল স্থাপনকারী সেই মূল বিদেশী প্রতিষ্ঠান কিংবা এ-সংক্রান্ত উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন কোনো দক্ষ প্রকৌশল সংস্থার কারিগরি সাহায্য ছাড়া সন্দ্বীপের এই সাবমেরিন কেবলের সংকট এড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাবমেরিন কেবলের মূল সঞ্চালন লাইন সমুদ্র কিংবা সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরবর্তী এলাকায় এভাবে হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে যাওয়া তাদের দীর্ঘ চাকরি জীবনের জন্য সম্পূর্ণ একটি নতুন ও নজিরবিহীন ঘটনা। ফলে এই সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় কী হতে পারে, তা তারা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারেননি। তবে দৃশ্যমান উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী এই জাতীয় তারগুলোর বাহ্যিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, স্থানীয় অসচেতন সাধারণ মানুষকে কেবলের সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত রাখা এবং দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের হাজার হাজার মানুষের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো ধরণের চুরি বা নাশকতা এড়াতে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং উপজেলা প্রশাসনকেও সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক প্রবীণ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন যে, প্রকল্পটি চালু হওয়ার মাত্র সাত থেকে আট বছরের মধ্যেই সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরের ভাঙনে মূল বৈদ্যুতিক তার দৃশ্যমান হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সমস্যা সমাধানের আধুনিক কোনো প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি আপাতত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। তাই এই প্রকল্প গ্রহণের সময় সমুদ্রের তলদেশের মাটির প্রকৃতি ও সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিকভাবে করা হয়েছিল কিনা, কিংবা সংকটকালে কীভাবে এর থেকে উত্তরণ সম্ভব—সেই দূরদর্শী পরিকল্পনায় কোনো গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কিনা, সেটি এখন উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ভাঙন যদি আরও তীব্র আকার ধারণ করে, তবে তীরবর্তী এলাকায় চলাচলকারী বিভিন্ন মালবাহী নৌযানের নিচের অংশের আঘাতে কেবল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপে মূল গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ টেনে নিতে মোট ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশেষ বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবহার করা হয়েছে। এই সঞ্চালন লাইনটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড উপকূলীয় এলাকা থেকে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সন্দ্বীপের বাউরিয়া এলাকায় এসে সংযুক্ত হয়েছে। প্রকল্প শুরুর সময় রোবটিক প্রযুক্তির সাহায্যে বড় জাহাজ থেকে কেবল দুটি চ্যানেলের তলদেশের শক্ত মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরতা খুঁড়ে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বসানো হয়েছিল। তবে সমুদ্রের মূল অংশ পার হয়ে তীরবর্তী স্থলভাগের কাছাকাছি এলাকায় এসে কেবল দুটির ভূগর্ভস্থ গভীরতা ১০ ফুট থেকে কমে মাত্র পাঁচ ফুটে নেমে আসে। ঠিক এই কারণেই বাউরিয়া ইউনিয়ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক কারণে তীব্র ভাঙন সৃষ্টি হওয়ায় গভীরতা কম থাকায় বৈদ্যুতিক তার দুটি সহজেই মাটির ওপর দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও তীব্র হলে সাবমেরিন কেবলটি আরও দীর্ঘ অংশ জুড়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে, যা সন্দ্বীপের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিডিবির স্থানীয় প্রকৌশলীরা হতাশা প্রকাশ করে বলছেন যে, সাত-আট বছর আগে যখন রোবটিক প্রযুক্তিতে এই বৈদ্যুতিক তার বসানো হয়েছিল, তখন দেশীয় কোনো প্রকৌশলীকে এর রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এখন দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভূগর্ভস্থ উন্মুক্ত কেবল পুনরায় মাটির নিচে নিরাপদে পোতা বা ব্লক দেওয়া আপাতত অসম্ভব। তাই সেই পুরোনো চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জরুরি ভিত্তিতে কারিগরি সাহায্য ও উদ্ধারকারী জাহাজ চাওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে এই মহাকেন্দ্রীক সংকট সমাধানের আর কোনো সহজ উপায় তাদের সামনে খোলা নেই।
উল্লেখ্য যে, বিগত ২০১৮ সালের আগে সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষ জাতীয় গ্রিডের কোনো বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন না। তখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা সরকারি ভারী জেনারেটরের মাধ্যমে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ও চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। প্রতিদিন কেবল সন্ধ্যা ৬টা থেকে পৌর এলাকার মাত্র আড়াই হাজার গ্রাহককে রাত ১১টা পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া হতো। প্রায় চার লাখ জনসংখ্যার এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় দ্বীপটিতে বর্তমানে পিডিবির বৈধ বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ হাজারে। সন্দ্বীপে বর্তমানে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রসারের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। পিডিবি কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো দ্বীপকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে সন্দ্বীপে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে বিতরণ করার এক বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সাবমেরিন কেবলের এই আকস্মিক উন্মুক্ততা এখন দ্বীপের সেই আলোকিত ভবিষ্যৎকে এক মস্ত বড় অন্ধকারের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন