খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ মুনাফা বা লাভ করার অন্ধ আশায় নিজের জীবনের কষ্টার্জিত জমানো সঞ্চয়ের পুরো টাকাটাই লগ্নি করেছিলেন একটি বিশেষ অনলাইন বিনিয়োগ মাধ্যমে, যার নাম ছিল ‘গ্লোবাল ক্রিপ্টো ইনভেস্ট’। কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তনের সেই আশায় গুড়েবালি দিয়ে মাত্র তিন দিনের মাথায় ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে সেই চক্রের মূল ওয়েবসাইটটি। শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি প্রতারকেরা, ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগের সব মাধ্যম ও তথ্য মুছে ফেলার জন্য তাদের দলগত চ্যাটিং গ্রুপটিও নিমেষেই ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে সর্বস্ব হারিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর নিজের জীবনের চরম দুর্দশার করুণ গল্প শোনালেন তরুণ উদ্যোক্তা জমির উদ্দিন। বর্তমানে শুধু জমির উদ্দিনই নন, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ পুরো দেশ জুড়েই একই অভিনব কায়দায় প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষ নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অবাস্তব ভার্চুয়াল মুদ্রার মায়াবী ফাঁদে পা দিয়ে। সাইবার দুনিয়ায় এক বিশাল ও অদৃশ্য প্রতারণার জাল বিছিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে দেউলিয়া করে চলেছে।
গণমাধ্যমের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই আধুনিক যুগের ডিজিটাল ডাকাতির পেছনে থাকা একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়ানক তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বা সন্ত্রাস দমন ইউনিটের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এই সংকটের গভীরতা নিশ্চিত করে জানান যে, সাইবার অপরাধ ও ইন্টারনেটে প্রতারণা সংক্রান্ত নানা ধরনের অভিযোগ তাদের দপ্তরে প্রতিনিয়ত জমা পড়ছে। এর মধ্যে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং আর্থিক লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। যেকোনো ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর পরই তারা অপরাধীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ইন্টারনেট ভিত্তিক এই ধরণের অপরাধের মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সাধারণ মানুষকে দ্রুত সেবা দিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিশেষ সাইবার সহায়তা কেন্দ্র বা সাপোর্ট সেন্টার চালু করতে যাচ্ছে।
অন্য দিকে, দেশের প্রখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ড. ফয়সাল কামাল চৌধুরী এই বিষয়ের আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশে এই ধরনের ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি বৈধতা না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েও পরবর্তীতে যথাযথ আইনি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে মস্ত বড় বাধার সম্মুখীন হন। ডিজিটাল দুনিয়ায় একবার অর্থ হাতছাড়া বা চুরি হয়ে গেলে বর্তমান আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় তা উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো বিশ্বজুড়ে যে ভয়ংকর ও শক্তিশালী ডিজিটাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তা সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিতে হলে দেশের পুরো সাইবার নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে হবে এবং একই সাথে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ইন্টারনেট দুনিয়ায় এক বিশাল অদৃশ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করে চালানো হচ্ছে এই আধুনিক ‘ভার্চুয়াল ডাকাতি’। এই অভিনব ডাকাতির জন্য সাইবার অপরাধী ও স্ক্যামারদের প্রধান চারণভূমি হলো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বার্তা আদান-প্রদানের জনপ্রিয় অ্যাপগুলো। বিশেষ করে টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ডিসকর্ডের মতো বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলোতে হাজার হাজার ভুয়া বিনিয়োগ গ্রুপ বা চ্যানেল তৈরি করে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের নিঃস্ব করা হচ্ছে। এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক বা ডেটিং অ্যাপগুলোকেও তারা শিকার ধরার প্রাথমিক ফাদ বা হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্যবহার করছে। অপরাধীরা হুবহু আসল ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মতো দেখতে অত্যন্ত নিখুঁত ও ভুয়া অ্যাপ তৈরি করে গুগলের প্লে স্টোর বা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরেও আপলোড করে রাখে, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল চেনা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই আন্তর্জাতিক প্রতারণার নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত সুসংগঠিত দেশি ও বিদেশী অপরাধী চক্রের এক বিশাল সিন্ডিকেট। এই বিশাল অপরাধের নেটওয়ার্কটি মূলত পরিচালিত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস এবং ফিলিপাইনের অত্যন্ত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠা আধুনিক ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ড’ বা সাইবার অপরাধের দুর্গ থেকে বসে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভেতরের কোনো সাধারণ আবাসিক বাসার রুমে বসেও দেশীয় এজেন্টরা এই চক্র পরিচালনা করছে। এদের প্রধান লক্ষ্য বা টার্গেট হচ্ছে সমাজে যারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে খাটাখাটনি ছাড়া বেশি টাকা আয় করতে চান, এমন শ্রেণির মানুষ। এই তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকার ও তরুণ সমাজ, অবসরে যাওয়া বয়স্ক সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ব্যবসায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
এই অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো ক্রিপ্টো প্রতারণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত ‘পিগ বুচারিং’ বা শূকর মোটাতাজাকরণ নীতি অনুসরণ করে থাকে। ঠিক যেভাবে কোনো পশুকে জবাই করার আগে অনেক দিন ধরে ভালো ভালো খাবার খাইয়ে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, এই প্রতারকেরাও ঠিক একইভাবে প্রথমে ভুক্তভোগীকে বিশ্বাসে নেয় এবং প্রথম দিকে ছোট ছোট বিনিয়োগের বিপরীতে কিছু লাভ দিয়ে তাদের লোভ বাড়িয়ে দেয়। যখন ভুক্তভোগী অন্ধ বিশ্বাসে তার জীবনের সব সঞ্চয় একসাথে বড় আকারে বিনিয়োগ করে, তখনই তাকে এক ঝটকায় জবাই বা সর্বস্বান্ত করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া নতুন কয়েন বা ডিজিটাল মুদ্রার দাম কৃত্রিমভাবে ইন্টারনেট বাজারে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়, যাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কৌশল বলা হয়। পরবর্তীতে চড়া দামে নিজেদের সমস্ত কয়েন সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে দিয়ে চক্রটি রাতারাতি উধাও হয়ে যায়।
এ ছাড়া ইন্টারনেটে ক্ষতিকারক ফিশিং লিংক বা বার্তা পাঠিয়ে সরাসরি মানুষের ডিজিটাল ওয়ালেটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও এখন অহরহ ঘটছে। কোনো টার্গেট বা ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়ার পর সেই ডিজিটাল মুদ্রাগুলো যেন কেউ ট্র্যাক বা সনাক্ত করতে না পারে, সেজন্য তারা বিশেষ মিক্সার সার্ভিসের মাধ্যমে শত শত অজ্ঞাত ও ভুয়া ওয়ালেটে টাকাগুলো টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলে। এরপর পিয়ার-টু-পিয়ার বা পিটুপি নামের সরাসরি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সেই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মার্কিন ডলারে বা স্থানীয় নগদ টাকায় রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা মূলত হুন্ডি নেটওয়ার্ক বা বিভিন্ন নামী মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ মুনাফা বা লাভ করার অন্ধ আশায় নিজের জীবনের কষ্টার্জিত জমানো সঞ্চয়ের পুরো টাকাটাই লগ্নি করেছিলেন একটি বিশেষ অনলাইন বিনিয়োগ মাধ্যমে, যার নাম ছিল ‘গ্লোবাল ক্রিপ্টো ইনভেস্ট’। কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তনের সেই আশায় গুড়েবালি দিয়ে মাত্র তিন দিনের মাথায় ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে সেই চক্রের মূল ওয়েবসাইটটি। শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি প্রতারকেরা, ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগের সব মাধ্যম ও তথ্য মুছে ফেলার জন্য তাদের দলগত চ্যাটিং গ্রুপটিও নিমেষেই ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে সর্বস্ব হারিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর নিজের জীবনের চরম দুর্দশার করুণ গল্প শোনালেন তরুণ উদ্যোক্তা জমির উদ্দিন। বর্তমানে শুধু জমির উদ্দিনই নন, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ পুরো দেশ জুড়েই একই অভিনব কায়দায় প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষ নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অবাস্তব ভার্চুয়াল মুদ্রার মায়াবী ফাঁদে পা দিয়ে। সাইবার দুনিয়ায় এক বিশাল ও অদৃশ্য প্রতারণার জাল বিছিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে দেউলিয়া করে চলেছে।
গণমাধ্যমের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই আধুনিক যুগের ডিজিটাল ডাকাতির পেছনে থাকা একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়ানক তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বা সন্ত্রাস দমন ইউনিটের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এই সংকটের গভীরতা নিশ্চিত করে জানান যে, সাইবার অপরাধ ও ইন্টারনেটে প্রতারণা সংক্রান্ত নানা ধরনের অভিযোগ তাদের দপ্তরে প্রতিনিয়ত জমা পড়ছে। এর মধ্যে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং আর্থিক লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। যেকোনো ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর পরই তারা অপরাধীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ইন্টারনেট ভিত্তিক এই ধরণের অপরাধের মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সাধারণ মানুষকে দ্রুত সেবা দিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিশেষ সাইবার সহায়তা কেন্দ্র বা সাপোর্ট সেন্টার চালু করতে যাচ্ছে।
অন্য দিকে, দেশের প্রখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ড. ফয়সাল কামাল চৌধুরী এই বিষয়ের আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশে এই ধরনের ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি বৈধতা না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েও পরবর্তীতে যথাযথ আইনি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে মস্ত বড় বাধার সম্মুখীন হন। ডিজিটাল দুনিয়ায় একবার অর্থ হাতছাড়া বা চুরি হয়ে গেলে বর্তমান আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় তা উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো বিশ্বজুড়ে যে ভয়ংকর ও শক্তিশালী ডিজিটাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তা সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিতে হলে দেশের পুরো সাইবার নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে হবে এবং একই সাথে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ইন্টারনেট দুনিয়ায় এক বিশাল অদৃশ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করে চালানো হচ্ছে এই আধুনিক ‘ভার্চুয়াল ডাকাতি’। এই অভিনব ডাকাতির জন্য সাইবার অপরাধী ও স্ক্যামারদের প্রধান চারণভূমি হলো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বার্তা আদান-প্রদানের জনপ্রিয় অ্যাপগুলো। বিশেষ করে টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ডিসকর্ডের মতো বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলোতে হাজার হাজার ভুয়া বিনিয়োগ গ্রুপ বা চ্যানেল তৈরি করে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের নিঃস্ব করা হচ্ছে। এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক বা ডেটিং অ্যাপগুলোকেও তারা শিকার ধরার প্রাথমিক ফাদ বা হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্যবহার করছে। অপরাধীরা হুবহু আসল ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মতো দেখতে অত্যন্ত নিখুঁত ও ভুয়া অ্যাপ তৈরি করে গুগলের প্লে স্টোর বা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরেও আপলোড করে রাখে, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল চেনা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই আন্তর্জাতিক প্রতারণার নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত সুসংগঠিত দেশি ও বিদেশী অপরাধী চক্রের এক বিশাল সিন্ডিকেট। এই বিশাল অপরাধের নেটওয়ার্কটি মূলত পরিচালিত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস এবং ফিলিপাইনের অত্যন্ত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠা আধুনিক ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ড’ বা সাইবার অপরাধের দুর্গ থেকে বসে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভেতরের কোনো সাধারণ আবাসিক বাসার রুমে বসেও দেশীয় এজেন্টরা এই চক্র পরিচালনা করছে। এদের প্রধান লক্ষ্য বা টার্গেট হচ্ছে সমাজে যারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে খাটাখাটনি ছাড়া বেশি টাকা আয় করতে চান, এমন শ্রেণির মানুষ। এই তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকার ও তরুণ সমাজ, অবসরে যাওয়া বয়স্ক সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ব্যবসায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
এই অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো ক্রিপ্টো প্রতারণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত ‘পিগ বুচারিং’ বা শূকর মোটাতাজাকরণ নীতি অনুসরণ করে থাকে। ঠিক যেভাবে কোনো পশুকে জবাই করার আগে অনেক দিন ধরে ভালো ভালো খাবার খাইয়ে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, এই প্রতারকেরাও ঠিক একইভাবে প্রথমে ভুক্তভোগীকে বিশ্বাসে নেয় এবং প্রথম দিকে ছোট ছোট বিনিয়োগের বিপরীতে কিছু লাভ দিয়ে তাদের লোভ বাড়িয়ে দেয়। যখন ভুক্তভোগী অন্ধ বিশ্বাসে তার জীবনের সব সঞ্চয় একসাথে বড় আকারে বিনিয়োগ করে, তখনই তাকে এক ঝটকায় জবাই বা সর্বস্বান্ত করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া নতুন কয়েন বা ডিজিটাল মুদ্রার দাম কৃত্রিমভাবে ইন্টারনেট বাজারে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়, যাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কৌশল বলা হয়। পরবর্তীতে চড়া দামে নিজেদের সমস্ত কয়েন সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে দিয়ে চক্রটি রাতারাতি উধাও হয়ে যায়।
এ ছাড়া ইন্টারনেটে ক্ষতিকারক ফিশিং লিংক বা বার্তা পাঠিয়ে সরাসরি মানুষের ডিজিটাল ওয়ালেটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও এখন অহরহ ঘটছে। কোনো টার্গেট বা ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়ার পর সেই ডিজিটাল মুদ্রাগুলো যেন কেউ ট্র্যাক বা সনাক্ত করতে না পারে, সেজন্য তারা বিশেষ মিক্সার সার্ভিসের মাধ্যমে শত শত অজ্ঞাত ও ভুয়া ওয়ালেটে টাকাগুলো টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলে। এরপর পিয়ার-টু-পিয়ার বা পিটুপি নামের সরাসরি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সেই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মার্কিন ডলারে বা স্থানীয় নগদ টাকায় রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা মূলত হুন্ডি নেটওয়ার্ক বা বিভিন্ন নামী মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন