দিকপাল

স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার পথে সরকারের নতুন পদক্ষেপ


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ | ০১:২৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার পথে সরকারের নতুন পদক্ষেপ

কক্সবাজারের বাসিন্দা সরওয়ার কামাল তার এগারো মাস বয়সী ফুটফুটে সন্তান তুবা মনিকে বাঁচাতে এক বুক আশা নিয়ে ছুটে এসেছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হামে আক্রান্ত সন্তানকে বাঁচানোর আকুলতায় তিনি শহরের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাগলের মতো ছুটে বেড়ান। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের একটি শয্যার খোঁজে অন্তত দশটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দুয়ারে কড়া নাড়লেও কোথাও কোনো খালি শয্যা মেলেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর চরম অনিশ্চয়তার পর শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা সম্ভব হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শিশু তুবা। কান্নাভেজা কণ্ঠে তার বাবা ক্ষোভ আর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা অপেক্ষা করেছি। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে যখন শয্যা পাওয়া গেল, তখন আমার মেয়ে আর আমাদের মাঝে নেই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তুবা মনির এই করুণ পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বর্তমানে দেশের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের তীব্র সংকট এক ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়কর রূপ ধারণ করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জরুরি শয্যা না পেয়ে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে এই বিশেষায়িত শয্যাগুলো যেন সাধারণ মানুষের কাছে সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন রোগীকে এই ইউনিটে ভর্তি করতে হলে স্বজনদের চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হয় অন্য কোনো রোগীর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়, অথবা অত্যন্ত নির্মমভাবে কারও মৃত্যুর মাধ্যমে শয্যা খালি হওয়ার করুণ মুহূর্তের দিকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে সাকুল্যে এক হাজার ছশো বিশটি নিবিড় পরিচর্যা শয্যা রয়েছে, যার মধ্যে আবার প্রায় দশ শতাংশই পুরোপুরি অকেজো ও অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ১৯টি জেলা সদর হাসপাতালে এই অত্যন্ত জরুরি চিকিৎসাসেবাটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। করোনা মহামারির চরম ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের দশটি বিভাগীয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং তেতাল্লিশটি জেলা সদর হাসপাতালে যে আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছিল, তার সিংহভাগই এখন রক্ষণাবেক্ষণ ও সদিচ্ছার অভাবে অকেজো হয়ে রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহামারি চলাকালীন সময়ে এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানের সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু চরম প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই বিশাল প্রকল্পের বরাদ্দের একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ফেরত চলে যায়। অর্থ ফেরত যাওয়ার কারণে অনেক হাসপাতালেই পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনা বা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রে আবার অবকাঠামো নির্মাণ এবং কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনাকাটা সম্পন্ন হলেও তা বছরের পর বছর ধরে তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। আবার যেখানে এই সেবাটি কোনোমতে সচল রয়েছে, সেখানকার সেবার মান ও কারিগরি মান নিয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ড ও নিয়ম অনুযায়ী, যে কোনো সরকারি হাসপাতালের মোট শয্যা সংখ্যার অন্তত ১০ শতাংশ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ থাকা বাধ্যতামূলক। অতীতে করোনার সময়ে দেশজুড়ে এই সেবার জন্য সাধারণ মানুষের হাহাকার আমরা দেখেছি। পরবর্তীতে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারের সময়েও এই সেবার চরম ঘাটতি দেশের মানুষ আবারও হাড়েমাসে টের পেয়েছে। আর বর্তমানে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির পর এই সংকট নতুন করে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, দেশের সামগ্রিক নিবিড় পরিচর্যা সেবার সিংহভাগই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক, যা প্রান্তিক মানুষের নাগালের বাইরে।

অন্য দিকে, দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রকৃতপক্ষে কতটি এই ধরনের শয্যা সচল রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট ও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান রাষ্ট্রীয় এই স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে নেই। ধারণা করা হয়, দেশে বেসরকারি খাতের বড় হাসপাতালের সংখ্যা আটশো থেকে নয়শোর কাছাকাছি। তবে বেসরকারি পর্যায়ে এই সেবার ব্যয় এতটাই আকাশচুম্বী যে, তা দরিদ্র, নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সামর্থ্যের সম্পূর্ণ বাইরে। ফলে বাধ্য হয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ সরকারি হাসপাতালের ওপরই ভরসা করেন, যেখানে একটি শয্যা পাওয়ার লড়াই রীতিমতো যুদ্ধের রূপ নেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল অবকাঠামোগত বা যন্ত্রপাতির অভাবের নয়; এটি মূলত সুদূরপ্রসারী সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতারই একটি প্রতিচ্ছবি।

সরকারি তথ্যের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে ১৯টি জেলা সদরের হাসপাতালে এই নিবিড় পরিচর্যা সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতাল, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, হবিগঞ্জ, ঝালকাঠি, কিশোরগঞ্জ, পিরোজপুর, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, নড়াইল, নরসিংদী, নীলফামারী, নেত্রকোনা, পঞ্চগড়, বরগুনা, বান্দরবান এবং মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল। এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিভাগীয় শহর বা রাজধানীতে আসতে হয়, যার ফলে পথিমধ্যেই অনেকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।

ব্যয় কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই বিশেষায়িত সেবার জন্য আলাদা করে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফি বা টাকা দিতে হয় না। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় দামি ওষুধপত্রের প্রায় পুরোটাই রোগীকে বাইরে থেকে চড়া মূল্যে কিনতে হয়। অপর দিকে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে এই সেবার ভাড়া একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম এবং প্রতিষ্ঠানের নাম ও জৌলুস যত বেশি, ভাড়ার পরিমাণও ততটাই লাগামহীন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নামী-দামি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা ভাড়া ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা ক্ষেত্রবিশেষে দৈনিক এক লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। কিছু মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠানে দৈনিক ভাড়া ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হলেও সেখানে মানসম্মত সেবা না দেওয়ার ভুরিভুরি অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্লিনিকের একক কেবিনের দৈনিক ভাড়া ৭ হাজার থেকে ২৫ হাজার এবং যৌথ কেবিনের ভাড়া ৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনা মহামারির সময়ে দেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা রাতারাতি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ জরুরি সাড়াদান ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ছিল বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উন্নত ল্যাব সুবিধা চালু করা। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফায় সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ছয় হাজার ৩৮৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

প্রকল্পের আওতায় ৫০টি জেলা হাসপাতালে বিশেষ শয্যা ও আইসোলেশন ইউনিট চালুর কথা থাকলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের চূড়ান্ত মূল্যায়নে এক চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং কাজের ধীরগতির কারণে বিশ্বব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় ফেরত চলে যায়। ফলে সিংহভাগ অবকাঠামোই এখন মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। লক্ষ্যমাত্রার ৫০টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৩টিতে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে আবার ৩টি হাসপাতালে সেবা চালু করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালসহ ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা থাকলেও একটির কাজও শেষ হয়নি। ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালুর অগ্রগতির হারও সম্পূর্ণ শূন্য।

এই স্থবিরতার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতাও কম দায়ী নয়। প্রকল্প নথি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমস্ত যন্ত্রপাতি কেনার মূল দায়িত্বে ছিল প্রকল্প কার্যালয়, আর হাসপাতালের মূল ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু দুই দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও নির্মাণকাজে চরম ধীরগতির কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যায়। সময় ফুরিয়ে আসায় একাধিক দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করতে হয়, যার ফলে অনেক হাসপাতালে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও আজ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছায়নি। যশোর জেনারেল হাসপাতালের মতো অনেক বড় চিকিৎসাকেন্দ্রে আধুনিক ভবন বা কক্ষ বছরের পর বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে থেকে ভুতুড়ে ঘরে পরিণত হয়েছে।

প্রকল্পের সাথে যুক্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন যে, শুরু থেকেই কেনাকাটার ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় পুরো কার্যক্রমের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বিল সংক্রান্ত জটিলতা এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবশ্য চিকিৎসকের অভাবের কথা বলছেন। তাদের মতে, শুধু যন্ত্রপাতি কিনলেই হয় না, তা পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ অ্যানেসথেসিয়া ও জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন শাখার চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং দক্ষ টেকনিশিয়ান প্রয়োজন, যার তীব্র ঘাটতি দেশে রয়েছে। যথাযথ জনবল নিয়োগ না দেওয়ায় কোটি কোটি টাকার ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট মনিটরগুলো বাক্সবন্দী অবস্থায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে এই সংকটের কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান জানান, এই সমস্যা রাতারাতি সমাধানের নয়, সরকার এটি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে এবং অচিরেই বন্ধ থাকা ইউনিটগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বর্তমান সময়ে হামের প্রকোপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শত শত অসুস্থ শিশুকে নিয়ে আসছেন অভিভাবকেরা। কিন্তু ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি হওয়ায় এবং আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় চিকিৎসকেরা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডের ৪৪টি শয্যার একটিও খালি নেই, যার ভেতরে থাকা ১৬ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের অবস্থা আরও করুণ। এই ১৬টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন মুমূর্ষু শিশুর স্বজনেরা আকুল আবেদন নিয়ে অপেক্ষা করেন।

সেখানকার বাস্তব চিত্র এতটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, অধিকাংশ আক্রান্ত শিশুর বয়স এক বছরেরও কম, যাদের পুরো শরীর লালচে ফুসকুড়িতে ঢেকে গেছে। কারও নাকে নল, কারও মুখে কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্ক; প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে শিশুরা অনবরত কেঁদেই চলেছে। সন্তানের এই বুকফাটা আর্তনাদ দেখে মা-বাবার চোখের জল যেন থামতেই চায় না। শয্যা না পেয়ে অনেক অসহায় অভিভাবককে তাদের মুমূর্ষু সন্তানকে কোলে নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে।

এই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আমাদের এখানে চাহিদার তুলনায় শয্যা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। হামের জটিলতার পাশাপাশি বেশিরভাগ শিশুই মূলত নিউমোনিয়া এবং তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ঢাকার বাইরে থেকে যখন রোগীরা এখানে আসে, তখন তাদের অবস্থা এমনিতেই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক থাকে। পথিমধ্যে সময়মতো কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা বা লাইফ সাপোর্ট না পাওয়ায় তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলায় তিনি অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কেবল শিশুদের জন্যই কেন্দ্রীয়ভাবে চারশো বা পাঁচশো শয্যার একটি বৃহৎ ও সুসজ্জিত বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা হাসপাতাল গড়ে তোলার তাগিদ দেন।

এই জাতীয় সংকটের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শুধু কোটি কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক ভবন বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করলেই সংকটের সমাধান হবে না, তা সার্বক্ষণিকভাবে সচল রাখার মতো পেশাদার ও দক্ষ সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে, যা বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অনুপস্থিত। করোনার সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এবং বেশ কিছু স্থানে ল্যাব চালু করা হলেও, দূরদর্শিতার অভাবে প্রকল্পটির অকাল সমাপ্তি ঘটে এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের টাকা ফেরত যায়। নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভেবেছিলেন এমন মহামারি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে শিশুদের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে আজও অবহেলায় বহু নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। তার মতে, যে কোনো জনস্বাস্থ্য সংকট বা মহামারি মোকাবিলায় হাসপাতালের ভেতর ও বাইরের চিকিৎসাব্যবস্থাকে সমানভাবে শক্তিশালী করা জরুরি, যা আমাদের দেশে আজও সুদূর পরাহত।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার পথে সরকারের নতুন পদক্ষেপ

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

কক্সবাজারের বাসিন্দা সরওয়ার কামাল তার এগারো মাস বয়সী ফুটফুটে সন্তান তুবা মনিকে বাঁচাতে এক বুক আশা নিয়ে ছুটে এসেছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হামে আক্রান্ত সন্তানকে বাঁচানোর আকুলতায় তিনি শহরের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাগলের মতো ছুটে বেড়ান। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের একটি শয্যার খোঁজে অন্তত দশটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দুয়ারে কড়া নাড়লেও কোথাও কোনো খালি শয্যা মেলেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর চরম অনিশ্চয়তার পর শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা সম্ভব হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শিশু তুবা। কান্নাভেজা কণ্ঠে তার বাবা ক্ষোভ আর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা অপেক্ষা করেছি। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে যখন শয্যা পাওয়া গেল, তখন আমার মেয়ে আর আমাদের মাঝে নেই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তুবা মনির এই করুণ পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বর্তমানে দেশের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের তীব্র সংকট এক ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়কর রূপ ধারণ করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জরুরি শয্যা না পেয়ে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে এই বিশেষায়িত শয্যাগুলো যেন সাধারণ মানুষের কাছে সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন রোগীকে এই ইউনিটে ভর্তি করতে হলে স্বজনদের চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হয় অন্য কোনো রোগীর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়, অথবা অত্যন্ত নির্মমভাবে কারও মৃত্যুর মাধ্যমে শয্যা খালি হওয়ার করুণ মুহূর্তের দিকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে সাকুল্যে এক হাজার ছশো বিশটি নিবিড় পরিচর্যা শয্যা রয়েছে, যার মধ্যে আবার প্রায় দশ শতাংশই পুরোপুরি অকেজো ও অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ১৯টি জেলা সদর হাসপাতালে এই অত্যন্ত জরুরি চিকিৎসাসেবাটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। করোনা মহামারির চরম ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের দশটি বিভাগীয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং তেতাল্লিশটি জেলা সদর হাসপাতালে যে আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছিল, তার সিংহভাগই এখন রক্ষণাবেক্ষণ ও সদিচ্ছার অভাবে অকেজো হয়ে রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহামারি চলাকালীন সময়ে এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানের সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু চরম প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই বিশাল প্রকল্পের বরাদ্দের একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ফেরত চলে যায়। অর্থ ফেরত যাওয়ার কারণে অনেক হাসপাতালেই পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনা বা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রে আবার অবকাঠামো নির্মাণ এবং কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনাকাটা সম্পন্ন হলেও তা বছরের পর বছর ধরে তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। আবার যেখানে এই সেবাটি কোনোমতে সচল রয়েছে, সেখানকার সেবার মান ও কারিগরি মান নিয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ড ও নিয়ম অনুযায়ী, যে কোনো সরকারি হাসপাতালের মোট শয্যা সংখ্যার অন্তত ১০ শতাংশ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ থাকা বাধ্যতামূলক। অতীতে করোনার সময়ে দেশজুড়ে এই সেবার জন্য সাধারণ মানুষের হাহাকার আমরা দেখেছি। পরবর্তীতে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারের সময়েও এই সেবার চরম ঘাটতি দেশের মানুষ আবারও হাড়েমাসে টের পেয়েছে। আর বর্তমানে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির পর এই সংকট নতুন করে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, দেশের সামগ্রিক নিবিড় পরিচর্যা সেবার সিংহভাগই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক, যা প্রান্তিক মানুষের নাগালের বাইরে।

অন্য দিকে, দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রকৃতপক্ষে কতটি এই ধরনের শয্যা সচল রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট ও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান রাষ্ট্রীয় এই স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে নেই। ধারণা করা হয়, দেশে বেসরকারি খাতের বড় হাসপাতালের সংখ্যা আটশো থেকে নয়শোর কাছাকাছি। তবে বেসরকারি পর্যায়ে এই সেবার ব্যয় এতটাই আকাশচুম্বী যে, তা দরিদ্র, নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সামর্থ্যের সম্পূর্ণ বাইরে। ফলে বাধ্য হয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ সরকারি হাসপাতালের ওপরই ভরসা করেন, যেখানে একটি শয্যা পাওয়ার লড়াই রীতিমতো যুদ্ধের রূপ নেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল অবকাঠামোগত বা যন্ত্রপাতির অভাবের নয়; এটি মূলত সুদূরপ্রসারী সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতারই একটি প্রতিচ্ছবি।

সরকারি তথ্যের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে ১৯টি জেলা সদরের হাসপাতালে এই নিবিড় পরিচর্যা সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতাল, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, হবিগঞ্জ, ঝালকাঠি, কিশোরগঞ্জ, পিরোজপুর, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, নড়াইল, নরসিংদী, নীলফামারী, নেত্রকোনা, পঞ্চগড়, বরগুনা, বান্দরবান এবং মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল। এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিভাগীয় শহর বা রাজধানীতে আসতে হয়, যার ফলে পথিমধ্যেই অনেকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।

ব্যয় কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই বিশেষায়িত সেবার জন্য আলাদা করে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফি বা টাকা দিতে হয় না। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় দামি ওষুধপত্রের প্রায় পুরোটাই রোগীকে বাইরে থেকে চড়া মূল্যে কিনতে হয়। অপর দিকে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে এই সেবার ভাড়া একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম এবং প্রতিষ্ঠানের নাম ও জৌলুস যত বেশি, ভাড়ার পরিমাণও ততটাই লাগামহীন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নামী-দামি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা ভাড়া ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা ক্ষেত্রবিশেষে দৈনিক এক লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। কিছু মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠানে দৈনিক ভাড়া ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হলেও সেখানে মানসম্মত সেবা না দেওয়ার ভুরিভুরি অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্লিনিকের একক কেবিনের দৈনিক ভাড়া ৭ হাজার থেকে ২৫ হাজার এবং যৌথ কেবিনের ভাড়া ৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনা মহামারির সময়ে দেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা রাতারাতি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ জরুরি সাড়াদান ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ছিল বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উন্নত ল্যাব সুবিধা চালু করা। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফায় সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ছয় হাজার ৩৮৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

প্রকল্পের আওতায় ৫০টি জেলা হাসপাতালে বিশেষ শয্যা ও আইসোলেশন ইউনিট চালুর কথা থাকলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের চূড়ান্ত মূল্যায়নে এক চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং কাজের ধীরগতির কারণে বিশ্বব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় ফেরত চলে যায়। ফলে সিংহভাগ অবকাঠামোই এখন মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। লক্ষ্যমাত্রার ৫০টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৩টিতে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে আবার ৩টি হাসপাতালে সেবা চালু করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালসহ ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা থাকলেও একটির কাজও শেষ হয়নি। ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালুর অগ্রগতির হারও সম্পূর্ণ শূন্য।

এই স্থবিরতার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতাও কম দায়ী নয়। প্রকল্প নথি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমস্ত যন্ত্রপাতি কেনার মূল দায়িত্বে ছিল প্রকল্প কার্যালয়, আর হাসপাতালের মূল ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু দুই দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও নির্মাণকাজে চরম ধীরগতির কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যায়। সময় ফুরিয়ে আসায় একাধিক দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করতে হয়, যার ফলে অনেক হাসপাতালে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও আজ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছায়নি। যশোর জেনারেল হাসপাতালের মতো অনেক বড় চিকিৎসাকেন্দ্রে আধুনিক ভবন বা কক্ষ বছরের পর বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে থেকে ভুতুড়ে ঘরে পরিণত হয়েছে।

প্রকল্পের সাথে যুক্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন যে, শুরু থেকেই কেনাকাটার ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় পুরো কার্যক্রমের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বিল সংক্রান্ত জটিলতা এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবশ্য চিকিৎসকের অভাবের কথা বলছেন। তাদের মতে, শুধু যন্ত্রপাতি কিনলেই হয় না, তা পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ অ্যানেসথেসিয়া ও জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন শাখার চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং দক্ষ টেকনিশিয়ান প্রয়োজন, যার তীব্র ঘাটতি দেশে রয়েছে। যথাযথ জনবল নিয়োগ না দেওয়ায় কোটি কোটি টাকার ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট মনিটরগুলো বাক্সবন্দী অবস্থায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে এই সংকটের কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান জানান, এই সমস্যা রাতারাতি সমাধানের নয়, সরকার এটি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে এবং অচিরেই বন্ধ থাকা ইউনিটগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বর্তমান সময়ে হামের প্রকোপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শত শত অসুস্থ শিশুকে নিয়ে আসছেন অভিভাবকেরা। কিন্তু ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি হওয়ায় এবং আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় চিকিৎসকেরা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডের ৪৪টি শয্যার একটিও খালি নেই, যার ভেতরে থাকা ১৬ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের অবস্থা আরও করুণ। এই ১৬টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন মুমূর্ষু শিশুর স্বজনেরা আকুল আবেদন নিয়ে অপেক্ষা করেন।

সেখানকার বাস্তব চিত্র এতটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, অধিকাংশ আক্রান্ত শিশুর বয়স এক বছরেরও কম, যাদের পুরো শরীর লালচে ফুসকুড়িতে ঢেকে গেছে। কারও নাকে নল, কারও মুখে কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্ক; প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে শিশুরা অনবরত কেঁদেই চলেছে। সন্তানের এই বুকফাটা আর্তনাদ দেখে মা-বাবার চোখের জল যেন থামতেই চায় না। শয্যা না পেয়ে অনেক অসহায় অভিভাবককে তাদের মুমূর্ষু সন্তানকে কোলে নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে।

এই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আমাদের এখানে চাহিদার তুলনায় শয্যা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। হামের জটিলতার পাশাপাশি বেশিরভাগ শিশুই মূলত নিউমোনিয়া এবং তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ঢাকার বাইরে থেকে যখন রোগীরা এখানে আসে, তখন তাদের অবস্থা এমনিতেই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক থাকে। পথিমধ্যে সময়মতো কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা বা লাইফ সাপোর্ট না পাওয়ায় তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলায় তিনি অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কেবল শিশুদের জন্যই কেন্দ্রীয়ভাবে চারশো বা পাঁচশো শয্যার একটি বৃহৎ ও সুসজ্জিত বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা হাসপাতাল গড়ে তোলার তাগিদ দেন।

এই জাতীয় সংকটের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শুধু কোটি কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক ভবন বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করলেই সংকটের সমাধান হবে না, তা সার্বক্ষণিকভাবে সচল রাখার মতো পেশাদার ও দক্ষ সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে, যা বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অনুপস্থিত। করোনার সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এবং বেশ কিছু স্থানে ল্যাব চালু করা হলেও, দূরদর্শিতার অভাবে প্রকল্পটির অকাল সমাপ্তি ঘটে এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের টাকা ফেরত যায়। নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভেবেছিলেন এমন মহামারি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে শিশুদের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে আজও অবহেলায় বহু নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। তার মতে, যে কোনো জনস্বাস্থ্য সংকট বা মহামারি মোকাবিলায় হাসপাতালের ভেতর ও বাইরের চিকিৎসাব্যবস্থাকে সমানভাবে শক্তিশালী করা জরুরি, যা আমাদের দেশে আজও সুদূর পরাহত।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল