উপরিউপরি সৌহার্দ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও একতরফা কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে নতুন করে তিক্ততা ও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে এ পর্যন্ত অন্তত ষাট জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া তথা পুশইন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাই-বাছাই করার নামে আরও অন্তত নব্বই জনকে স্থানীয় পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই গত কয়েক দশক ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসলেও সে দেশের জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে তারা নাগরিকত্ব কিংবা ভোটাধিকার পাননি। এখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন বহু বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনেককে আবার জিজ্ঞাসাবাদের নামে বিশেষ আটকে রাখার কেন্দ্রে বা হোল্ডিং সেন্টারে বন্দি করে চরম মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংবেদনশীল বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার পাশাপাশি দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। একদিকে যেমন এই প্রক্রিয়ায় চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জনমনেও ভারতের এমন আচরণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
ভারতের নীতিনির্ধারকরা অবশ্য অনেক আগে থেকেই তাদের দেশে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন, যেখানে পরোক্ষভাবে মূলত বাংলাদেশকেই ইঙ্গিত করা হতো। তবে এই পুশইন বিতর্কটি নতুন করে গতি পায় পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শুভেন্দু অধিকারী সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে জয়ী হওয়ার পরপরই। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, কথিত বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এখন সীমান্তে একের পর এক এমন কঠোর ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই পুশইন ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্কে ফাটল ধরার ও তিক্ততা বহুগুণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের জটিল সংকট নিরসনে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত কেবল আবেগ বা রাজনৈতিক স্বার্থ দিয়ে না দেখে, যুক্তি, আইনি বৈধতা ও মানবিকতার নিরিখে একটি টেকসই নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) মনে করেন, পুশইনের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত মূলত বাংলাদেশের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস, দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধুত্বের বদলে অসন্তুষ্টির দেয়াল আরও উঁচুই করবে।
অবশ্য ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সাম্প্রতিক একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, সীমান্ত অনুপ্রবেশের এই সংবেদনশীল ইস্যুটিকে যেন কোনো সস্তা রাজনৈতিক বা প্রতীকী ঘোষণা দিয়ে নয়, বরং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী উপায়ে সমাধান করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অমিত শাহ কর্মকর্তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধু প্রচারের উদ্দেশ্যে কোনো ‘অর্ধসমাপ্ত’ বা তাড়াহুড়ো করা অভিযান চালানো যাবে না। প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনিভাবে সম্পূর্ণ বৈধ, কূটনৈতিকভাবে সতর্ক এবং কার্যক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন, যেখানে যত্রতত্র জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেয়ে প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের নিখুঁতভাবে তথ্যচিত্রের মাধ্যমে শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অমিত শাহ কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক করেছেন যেন এমন কোনো অবিবেচকের মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হয় যা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিদ্যমান সুদৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় ফাটল ধরায়। কারণ অতীতে যথাযথ যৌথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কিংবা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না করে বিএসএফ কর্তৃক কথিত অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক করার কারণে ঢাকা অত্যন্ত তীব্র আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, যা দুই দেশের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।
নয়াদিল্লির বর্তমান কৌশলটি আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। তারা এখন এমন একটি আইনি প্রক্রিয়া চাইছে যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও নথিবদ্ধ করার পর আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে, যাতে কোনো আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক তৈরি না হয়। ভারতীয় কর্মকর্তারাও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কেবল একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে মানবিক, ভূরাজনৈতিক এবং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
কলকাতার একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যাদেরকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর তোড়জোড় চলছে, তাদের একটি বিশাল অংশই মুসলমান। মূলত নদীভাঙন, বন্যা এবং চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়ে জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতায় এখনো নাগরিকত্ব না পাওয়া এই বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী মুসলমানরাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সূত্রটি আরও সতর্ক করে বলেছে, এই বিশাল সংখ্যক কঠোর পরিশ্রমী মানুষ যদি ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন, তবে অদূর ভবিষ্যতে সে দেশে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে।
এই প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির আরও যোগ করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত করার এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বীকৃত কূটনৈতিক পদ্ধতি রয়েছে। সেটি মূলত দুই দেশের সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও উপাত্ত বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত। বর্ডার এলাকায় কোনো সমস্যা হলে দুই দেশের সীমান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী ফ্লাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে তার সমাধান করা যায়। বর্তমানে অনেককে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার যে খবর আসছে, সেখানে তাদের পূর্বপুরুষের নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে যদি তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমাণিত হন, তবে অবশ্যই বাংলাদেশ তাদের ফেরত নেবে। কিন্তু তাদের যদি ভারতীয় বা অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থেকে আলাদা করা না যায়, তবে বাংলাদেশ কেন তাদের দায় নেবে?
হাকিমপুরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে পুশইন বা বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার এই একতরফা প্রক্রিয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অবসরপ্রাপ্ত)। তার মতে, ভারত সরকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি বিভিন্ন সময়ে ইতিবাচক বার্তা দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। এমতাবস্থায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত দৃঢ় ও দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে এই পুশইন সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সীমান্তে সর্বোচ্চ কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬
উপরিউপরি সৌহার্দ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও একতরফা কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে নতুন করে তিক্ততা ও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে এ পর্যন্ত অন্তত ষাট জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া তথা পুশইন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাই-বাছাই করার নামে আরও অন্তত নব্বই জনকে স্থানীয় পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই গত কয়েক দশক ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসলেও সে দেশের জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে তারা নাগরিকত্ব কিংবা ভোটাধিকার পাননি। এখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন বহু বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনেককে আবার জিজ্ঞাসাবাদের নামে বিশেষ আটকে রাখার কেন্দ্রে বা হোল্ডিং সেন্টারে বন্দি করে চরম মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংবেদনশীল বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার পাশাপাশি দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। একদিকে যেমন এই প্রক্রিয়ায় চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জনমনেও ভারতের এমন আচরণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
ভারতের নীতিনির্ধারকরা অবশ্য অনেক আগে থেকেই তাদের দেশে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন, যেখানে পরোক্ষভাবে মূলত বাংলাদেশকেই ইঙ্গিত করা হতো। তবে এই পুশইন বিতর্কটি নতুন করে গতি পায় পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শুভেন্দু অধিকারী সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে জয়ী হওয়ার পরপরই। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, কথিত বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এখন সীমান্তে একের পর এক এমন কঠোর ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই পুশইন ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্কে ফাটল ধরার ও তিক্ততা বহুগুণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের জটিল সংকট নিরসনে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত কেবল আবেগ বা রাজনৈতিক স্বার্থ দিয়ে না দেখে, যুক্তি, আইনি বৈধতা ও মানবিকতার নিরিখে একটি টেকসই নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) মনে করেন, পুশইনের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত মূলত বাংলাদেশের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস, দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধুত্বের বদলে অসন্তুষ্টির দেয়াল আরও উঁচুই করবে।
অবশ্য ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সাম্প্রতিক একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, সীমান্ত অনুপ্রবেশের এই সংবেদনশীল ইস্যুটিকে যেন কোনো সস্তা রাজনৈতিক বা প্রতীকী ঘোষণা দিয়ে নয়, বরং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী উপায়ে সমাধান করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অমিত শাহ কর্মকর্তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধু প্রচারের উদ্দেশ্যে কোনো ‘অর্ধসমাপ্ত’ বা তাড়াহুড়ো করা অভিযান চালানো যাবে না। প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনিভাবে সম্পূর্ণ বৈধ, কূটনৈতিকভাবে সতর্ক এবং কার্যক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন, যেখানে যত্রতত্র জোরপূর্বক পুশব্যাক করার চেয়ে প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের নিখুঁতভাবে তথ্যচিত্রের মাধ্যমে শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অমিত শাহ কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক করেছেন যেন এমন কোনো অবিবেচকের মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হয় যা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিদ্যমান সুদৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় ফাটল ধরায়। কারণ অতীতে যথাযথ যৌথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কিংবা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না করে বিএসএফ কর্তৃক কথিত অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক করার কারণে ঢাকা অত্যন্ত তীব্র আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, যা দুই দেশের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।
নয়াদিল্লির বর্তমান কৌশলটি আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। তারা এখন এমন একটি আইনি প্রক্রিয়া চাইছে যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও নথিবদ্ধ করার পর আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে, যাতে কোনো আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক তৈরি না হয়। ভারতীয় কর্মকর্তারাও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কেবল একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে মানবিক, ভূরাজনৈতিক এবং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
কলকাতার একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যাদেরকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর তোড়জোড় চলছে, তাদের একটি বিশাল অংশই মুসলমান। মূলত নদীভাঙন, বন্যা এবং চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়ে জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতায় এখনো নাগরিকত্ব না পাওয়া এই বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী মুসলমানরাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সূত্রটি আরও সতর্ক করে বলেছে, এই বিশাল সংখ্যক কঠোর পরিশ্রমী মানুষ যদি ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন, তবে অদূর ভবিষ্যতে সে দেশে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে।
এই প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির আরও যোগ করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত করার এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বীকৃত কূটনৈতিক পদ্ধতি রয়েছে। সেটি মূলত দুই দেশের সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও উপাত্ত বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত। বর্ডার এলাকায় কোনো সমস্যা হলে দুই দেশের সীমান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী ফ্লাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে তার সমাধান করা যায়। বর্তমানে অনেককে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার যে খবর আসছে, সেখানে তাদের পূর্বপুরুষের নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে যদি তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমাণিত হন, তবে অবশ্যই বাংলাদেশ তাদের ফেরত নেবে। কিন্তু তাদের যদি ভারতীয় বা অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থেকে আলাদা করা না যায়, তবে বাংলাদেশ কেন তাদের দায় নেবে?
হাকিমপুরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে পুশইন বা বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার এই একতরফা প্রক্রিয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অবসরপ্রাপ্ত)। তার মতে, ভারত সরকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি বিভিন্ন সময়ে ইতিবাচক বার্তা দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। এমতাবস্থায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত দৃঢ় ও দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে এই পুশইন সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সীমান্তে সর্বোচ্চ কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন