ঈদের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে বিষাদে পরিণত হয়েছে দেশের ১০টি জেলায়। উৎসবের দিনে সড়ক যেন রক্তক্ষয়ী মরণফাঁদে রূপ নেয়, যার বলি হতে হয়েছে ২০টি তাজা প্রাণকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটেছে গোপালগঞ্জে, যেখানে একই পরিবারের তিন সদস্যসহ মোট ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া নাটোর ও চট্টগ্রামে তিনজন করে, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, ফরিদপুর ও টাঙ্গাইলে দুজন করে এবং গাইবান্ধা ও নারায়ণগঞ্জে একজন করে মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার নির্মম শিকার হয়েছেন। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন না মানার চেনা প্রবণতাই এই উৎসবের দিনটিকে অসংখ্য পরিবারের জন্য আজীবনের কান্নায় পরিণত করেছে।
গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম এলাকায় ঈদের সবচেয়ে বড় এবং হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পিরোজপুরগামী দোলা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি মোটরসাইকেলকে সজোরে ধাক্কা দেয় এবং উল্টে যায়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা দুই বন্ধু ও বাসের যাত্রীসহ একই পরিবারের দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় জনতা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে আহতদের হাসপাতালে পাঠালে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট বছরের এক শিশুও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চালকের অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই এই গণমৃত্যু ঘটেছে। ঘটনার পর প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বৃষ্টির মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ থেকে ভাদুড়িয়ার দিকে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে একটি দ্রুতগামী ট্রাক ধাক্কা দিলে নারী ও শিশুসহ চারজন গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে দুই নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়। এদিকে নাটোরে ঈদের দিন পৃথক পাঁচটি দুর্ঘটনায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। নাটোরের গুরুদাসপুরে বিভিন্ন স্থানে সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় নাদিম ইসলাম রুবেল ও ফারুক হোসেন নামের দুই যুবক নিহত হন এবং অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া লালপুর উপজেলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আব্দুল কাদের নামের এক রাজমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে, যিনি সকালে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন।
পটুয়াখালীর গলাচিপায় ঈদের দিন বেলা ১১টার দিকে উলানিয়া সড়কে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তামিম হাওলাদার ও ফয়সাল নামের দুই তরুণ প্রাণ হারান। তারা দুজনেই স্থানীয় পৌর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এই ঘটনায় আরও দুজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। টাঙ্গাইলেও ঈদের আনন্দ এক নিমেষে ফিকে হয়ে গেছে দুই জনের মৃত্যুতে। সখীপুরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে কানন আহমেদ নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্যদিকে কালিহাতী উপজেলায় রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের চাপায় সফিকুল ইসলাম সফি নামের এক দর্জি ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন।
ফরিদপুরে ঈদের বিকেলে পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়ার আনন্দ বিষাদে রূপ নেয় দুই বন্ধুর চিরবিদায়ের মাধ্যমে। ফরিদপুর-ভাঙ্গা মহাসড়কের নারানখালী ব্রিজের কাছে একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে রাজন শেখ ও ইব্রাহিম ফকির নামের দুই কিশোর বন্ধু নিহত হয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকায় রাতে ঈগল পরিবহনের একটি বাস অতিরিক্ত গতিতে উল্টো পথে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি লেগুনার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এই ভয়াবহ কাণ্ডে ৩ জন নিহত এবং অন্তত ২০ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন।
এছাড়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ভাসানী তিস্তা সেতুর কাছে দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মালেকা বেগম নামের এক তিন সন্তানের জননী প্রাণ হারিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারেও সন্ধ্যার দিকে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় একটি অজ্ঞাত যানের ধাক্কায় সড়কে ছিটকে পড়া এক যুবককে পেছন থেকে আসা একটি বাস চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ঈদের এই বিশেষ দিনটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ঝরিয়েছে কেবলই তাজা রক্ত, যা আরও একবার আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও চালকদের অসচেতনতাকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
ঈদের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে বিষাদে পরিণত হয়েছে দেশের ১০টি জেলায়। উৎসবের দিনে সড়ক যেন রক্তক্ষয়ী মরণফাঁদে রূপ নেয়, যার বলি হতে হয়েছে ২০টি তাজা প্রাণকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটেছে গোপালগঞ্জে, যেখানে একই পরিবারের তিন সদস্যসহ মোট ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া নাটোর ও চট্টগ্রামে তিনজন করে, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, ফরিদপুর ও টাঙ্গাইলে দুজন করে এবং গাইবান্ধা ও নারায়ণগঞ্জে একজন করে মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার নির্মম শিকার হয়েছেন। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন না মানার চেনা প্রবণতাই এই উৎসবের দিনটিকে অসংখ্য পরিবারের জন্য আজীবনের কান্নায় পরিণত করেছে।
গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম এলাকায় ঈদের সবচেয়ে বড় এবং হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পিরোজপুরগামী দোলা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি মোটরসাইকেলকে সজোরে ধাক্কা দেয় এবং উল্টে যায়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা দুই বন্ধু ও বাসের যাত্রীসহ একই পরিবারের দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় জনতা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে আহতদের হাসপাতালে পাঠালে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট বছরের এক শিশুও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চালকের অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই এই গণমৃত্যু ঘটেছে। ঘটনার পর প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বৃষ্টির মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ থেকে ভাদুড়িয়ার দিকে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে একটি দ্রুতগামী ট্রাক ধাক্কা দিলে নারী ও শিশুসহ চারজন গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে দুই নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়। এদিকে নাটোরে ঈদের দিন পৃথক পাঁচটি দুর্ঘটনায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। নাটোরের গুরুদাসপুরে বিভিন্ন স্থানে সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় নাদিম ইসলাম রুবেল ও ফারুক হোসেন নামের দুই যুবক নিহত হন এবং অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া লালপুর উপজেলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আব্দুল কাদের নামের এক রাজমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে, যিনি সকালে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন।
পটুয়াখালীর গলাচিপায় ঈদের দিন বেলা ১১টার দিকে উলানিয়া সড়কে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তামিম হাওলাদার ও ফয়সাল নামের দুই তরুণ প্রাণ হারান। তারা দুজনেই স্থানীয় পৌর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এই ঘটনায় আরও দুজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। টাঙ্গাইলেও ঈদের আনন্দ এক নিমেষে ফিকে হয়ে গেছে দুই জনের মৃত্যুতে। সখীপুরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে কানন আহমেদ নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্যদিকে কালিহাতী উপজেলায় রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের চাপায় সফিকুল ইসলাম সফি নামের এক দর্জি ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন।
ফরিদপুরে ঈদের বিকেলে পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়ার আনন্দ বিষাদে রূপ নেয় দুই বন্ধুর চিরবিদায়ের মাধ্যমে। ফরিদপুর-ভাঙ্গা মহাসড়কের নারানখালী ব্রিজের কাছে একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে রাজন শেখ ও ইব্রাহিম ফকির নামের দুই কিশোর বন্ধু নিহত হয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকায় রাতে ঈগল পরিবহনের একটি বাস অতিরিক্ত গতিতে উল্টো পথে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি লেগুনার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এই ভয়াবহ কাণ্ডে ৩ জন নিহত এবং অন্তত ২০ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন।
এছাড়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ভাসানী তিস্তা সেতুর কাছে দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মালেকা বেগম নামের এক তিন সন্তানের জননী প্রাণ হারিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারেও সন্ধ্যার দিকে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় একটি অজ্ঞাত যানের ধাক্কায় সড়কে ছিটকে পড়া এক যুবককে পেছন থেকে আসা একটি বাস চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ঈদের এই বিশেষ দিনটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ঝরিয়েছে কেবলই তাজা রক্ত, যা আরও একবার আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও চালকদের অসচেতনতাকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

আপনার মতামত লিখুন