পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশি পশুতেই জমবে কোরবানির হাট। মৌসুমের শুরুতে হাটে ভারতীয় গরুর আধিক্য কম থাকবে বলে নানা মহল থেকে দাবি করা হলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত, বিশেষ করে সিলেটের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে দেদারসে ঢুকছে ভারতীয় গরু ও মহিষ। চোরাই পথে আসা এই বিপুলসংখ্যক পশুর কারণে এখন জমজমাট দেশের পশুর হাটগুলো। ফলে বরাবরের মতোই চরম লোকসান আর কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন দেশীয় খামারিরা।
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা, খামারি এবং স্থানীয় পশু ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে ভারতীয় গরু ও মহিষের এই অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। রাতারাতি এসব চোরাই পশু ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশের ছোট-বড় হাট-বাজারে। খামারিদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা ধারদেনা করে, হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কোরবানির হাটের জন্য পশু প্রস্তুত করেন। কিন্তু ঈদের আগমুহূর্তে চোরাই পশুর এই অবাধ প্রবেশ তাদের পুরো বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ভারতীয় গরুর দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় দেশি পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে খামারিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও জকিগঞ্জ সীমান্ত এখন চোরাকারবারিদের জন্য এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত কমপক্ষে হাজারখানেক গরু-মহিষ বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী চক্র এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের পরোক্ষ যোগসাজশে এই অবৈধ বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চলছে। সীমান্ত এলাকার গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমির আল এবং দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা একাধিক দলে ভাগ হয়ে এসব পশু নিয়ে আসে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ টহল দলের পক্ষে তাদের শনাক্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় চোখের সামনে দিয়ে এসব পশুর গাড়ি চলে গেলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের একাংশের মদদ থাকায় সাধারণ মানুষ এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না।
সবচেয়ে বেশি চোরাই পশু আসছে গোয়াইনঘাটের দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে। বিশেষ করে বিছানাকান্দি সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু পিলার সংলগ্ন রুট চোরাচালানের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখান থেকে বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পশুগুলো গোয়াইনঘাট সদর, দরবস্ত বাজারসহ সিলেটের বিভিন্ন বড় বড় হাটে চলে যায়। এছাড়া উপজেলার পশ্চিম জাফলং, মধ্য জাফলং ও পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্ত পথগুলোও এখন চোরাকারবারিদের দখলে। গোয়াইনঘাট ছাড়াও কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ এবং জকিগঞ্জের বাল্লাহ ও আটগ্রাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত ট্রাকে করে চোরাই পশুর চালান দেশের ভেতরে ঢুকছে।
অবশ্য এই চোরাচালান রোধে নিজেদের তৎপরতার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, সীমান্ত দিয়ে যেন কোনোভাবেই অবৈধ পশু প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারি রয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং সন্দেহভাজন যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পশুর হাটে যাতে চোরাই বা অবৈধ উপায়ে আসা কোনো পশু প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য প্রতিটি থানাকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তথ্য পাওয়া মাত্রই অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। তবে প্রশাসনের এমন আশ্বাসের পরও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র খামারিদের মনে স্বস্তি ফেরাতে পারছে না। দেশীয় গরুর বাজার সুরক্ষায় সীমান্তগুলোতে আরও কঠোর ও সৎ নজরদারির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশি পশুতেই জমবে কোরবানির হাট। মৌসুমের শুরুতে হাটে ভারতীয় গরুর আধিক্য কম থাকবে বলে নানা মহল থেকে দাবি করা হলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত, বিশেষ করে সিলেটের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে দেদারসে ঢুকছে ভারতীয় গরু ও মহিষ। চোরাই পথে আসা এই বিপুলসংখ্যক পশুর কারণে এখন জমজমাট দেশের পশুর হাটগুলো। ফলে বরাবরের মতোই চরম লোকসান আর কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন দেশীয় খামারিরা।
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা, খামারি এবং স্থানীয় পশু ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে ভারতীয় গরু ও মহিষের এই অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। রাতারাতি এসব চোরাই পশু ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশের ছোট-বড় হাট-বাজারে। খামারিদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা ধারদেনা করে, হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কোরবানির হাটের জন্য পশু প্রস্তুত করেন। কিন্তু ঈদের আগমুহূর্তে চোরাই পশুর এই অবাধ প্রবেশ তাদের পুরো বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ভারতীয় গরুর দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় দেশি পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে খামারিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও জকিগঞ্জ সীমান্ত এখন চোরাকারবারিদের জন্য এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত কমপক্ষে হাজারখানেক গরু-মহিষ বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী চক্র এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের পরোক্ষ যোগসাজশে এই অবৈধ বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চলছে। সীমান্ত এলাকার গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমির আল এবং দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা একাধিক দলে ভাগ হয়ে এসব পশু নিয়ে আসে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ টহল দলের পক্ষে তাদের শনাক্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় চোখের সামনে দিয়ে এসব পশুর গাড়ি চলে গেলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের একাংশের মদদ থাকায় সাধারণ মানুষ এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না।
সবচেয়ে বেশি চোরাই পশু আসছে গোয়াইনঘাটের দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে। বিশেষ করে বিছানাকান্দি সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু পিলার সংলগ্ন রুট চোরাচালানের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখান থেকে বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পশুগুলো গোয়াইনঘাট সদর, দরবস্ত বাজারসহ সিলেটের বিভিন্ন বড় বড় হাটে চলে যায়। এছাড়া উপজেলার পশ্চিম জাফলং, মধ্য জাফলং ও পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্ত পথগুলোও এখন চোরাকারবারিদের দখলে। গোয়াইনঘাট ছাড়াও কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ এবং জকিগঞ্জের বাল্লাহ ও আটগ্রাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত ট্রাকে করে চোরাই পশুর চালান দেশের ভেতরে ঢুকছে।
অবশ্য এই চোরাচালান রোধে নিজেদের তৎপরতার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, সীমান্ত দিয়ে যেন কোনোভাবেই অবৈধ পশু প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারি রয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং সন্দেহভাজন যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পশুর হাটে যাতে চোরাই বা অবৈধ উপায়ে আসা কোনো পশু প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য প্রতিটি থানাকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তথ্য পাওয়া মাত্রই অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। তবে প্রশাসনের এমন আশ্বাসের পরও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র খামারিদের মনে স্বস্তি ফেরাতে পারছে না। দেশীয় গরুর বাজার সুরক্ষায় সীমান্তগুলোতে আরও কঠোর ও সৎ নজরদারির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন