দিকপাল

আতঙ্কের নাম 'হান্তাভাইরাস': ইঁদুর থেকে ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি, জানুন বাঁচার উপায়!


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬ | ০৪:০৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

আতঙ্কের নাম 'হান্তাভাইরাস': ইঁদুর থেকে ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি, জানুন বাঁচার উপায়!

আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশিতে ভেসে বেড়ানো বিলাসবহুল প্রমোদতরী ‘এমভি হন্দিয়াস’ এখন এক বিষাদময় ও আতঙ্কিত জনপদে পরিণত হয়েছে। আনন্দের ভ্রমণে বের হওয়া পর্যটকদের জন্য এই যাত্রা যে প্রাণঘাতী এক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে, তা হয়তো কারোরই কল্পনাতে ছিল না। 

সম্প্রতি এই প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় পুরো বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই সংক্রমণে জাহাজের অন্তত তিনজন যাত্রী ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে কাজ করছে। তবে মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আসলে কী এই হান্টাভাইরাস এবং এটি কতটা বিপজ্জনক?

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, হান্টাভাইরাস কোনো একক ভাইরাস নয়, বরং এটি একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি। এটি সাধারণত ইঁদুর বা এই জাতীয় ক্ষুদ্র বন্য প্রাণীদের শরীর থেকে ছড়ায়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আশেপাশে থাকা ইঁদুরের লালা, মল-মূত্র কিংবা তাদের বসবাসের স্থানে জমে থাকা ধূলিকণা যখন মানুষের সংস্পর্শে আসে, তখন এই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাময়িকী ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এই ভাইরাসের লক্ষণ এবং ভয়াবহতার ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এটি মূলত মানুষের শ্বাসতন্ত্র বা ফুসফুসকে আক্রমণ করে, যাকে বলা হয় ‘হান্টাভাইরাস কার্ডিওপালমোনারি সিনড্রোম’ বা এইচসিপিএস। এই নির্দিষ্ট ধরনে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেকই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্যদিকে, ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে এই ভাইরাসটি মানুষের কিডনি ও রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে।

এমভি হন্দিয়াস জাহাজের এই প্রাদুর্ভাবটি বিশেষ নজর কেড়েছে কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস’ নিশ্চিত করেছে যে, আক্রান্তদের মধ্যে ‘আন্দেস ভাইরাস’-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এটি হান্টাভাইরাসের এমন এক রূপ যা অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, যা মূলত দীর্ঘক্ষণ ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকার কারণে ঘটে থাকে। সাধারণ ফ্লুর মতো লক্ষণ নিয়ে এই রোগের শুরু হলেও দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে। লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ রজার হিউসন বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে বলেছেন যে, কোনো বদ্ধ পরিবেশে ইঁদুরের উপদ্রব থাকলে সেখানে বাতাসের মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই জাহাজের কেবিন বা স্টোরেজ এরিয়াগুলো এই সংক্রমণের মূল উৎস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এত কিছুর পরেও বিশেষজ্ঞরা এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম টেইলর জানিয়েছেন যে, হান্টাভাইরাস সাধারণত গণহারে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে না। জাহাজের যাত্রীরা হয়তো ভ্রমণের কোনো এক পর্যায়ে ইঁদুর উপদ্রুত কোনো দ্বীপ বা পরিবেশে গিয়েছিলেন, যার ফলে এই সংক্রমণ ঘটেছে। ২ মে জাহাজটিতে প্রথম অসুস্থতার খবর পাওয়া যায়, যা গত ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আটলান্টিকের বিভিন্ন দ্বীপে যাত্রাবিরতি নিয়েছিল। বর্তমানে জাহাজটি নিয়ে স্বাস্থ্য তদন্ত ও ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করার কাজ চলছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এড়িয়ে চলাই এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬


আতঙ্কের নাম 'হান্তাভাইরাস': ইঁদুর থেকে ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি, জানুন বাঁচার উপায়!

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬

featured Image

আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশিতে ভেসে বেড়ানো বিলাসবহুল প্রমোদতরী ‘এমভি হন্দিয়াস’ এখন এক বিষাদময় ও আতঙ্কিত জনপদে পরিণত হয়েছে। আনন্দের ভ্রমণে বের হওয়া পর্যটকদের জন্য এই যাত্রা যে প্রাণঘাতী এক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে, তা হয়তো কারোরই কল্পনাতে ছিল না। 

সম্প্রতি এই প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় পুরো বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই সংক্রমণে জাহাজের অন্তত তিনজন যাত্রী ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে কাজ করছে। তবে মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আসলে কী এই হান্টাভাইরাস এবং এটি কতটা বিপজ্জনক?

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, হান্টাভাইরাস কোনো একক ভাইরাস নয়, বরং এটি একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি। এটি সাধারণত ইঁদুর বা এই জাতীয় ক্ষুদ্র বন্য প্রাণীদের শরীর থেকে ছড়ায়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আশেপাশে থাকা ইঁদুরের লালা, মল-মূত্র কিংবা তাদের বসবাসের স্থানে জমে থাকা ধূলিকণা যখন মানুষের সংস্পর্শে আসে, তখন এই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাময়িকী ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এই ভাইরাসের লক্ষণ এবং ভয়াবহতার ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এটি মূলত মানুষের শ্বাসতন্ত্র বা ফুসফুসকে আক্রমণ করে, যাকে বলা হয় ‘হান্টাভাইরাস কার্ডিওপালমোনারি সিনড্রোম’ বা এইচসিপিএস। এই নির্দিষ্ট ধরনে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেকই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্যদিকে, ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে এই ভাইরাসটি মানুষের কিডনি ও রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে।

এমভি হন্দিয়াস জাহাজের এই প্রাদুর্ভাবটি বিশেষ নজর কেড়েছে কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস’ নিশ্চিত করেছে যে, আক্রান্তদের মধ্যে ‘আন্দেস ভাইরাস’-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এটি হান্টাভাইরাসের এমন এক রূপ যা অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, যা মূলত দীর্ঘক্ষণ ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকার কারণে ঘটে থাকে। সাধারণ ফ্লুর মতো লক্ষণ নিয়ে এই রোগের শুরু হলেও দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে। লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ রজার হিউসন বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে বলেছেন যে, কোনো বদ্ধ পরিবেশে ইঁদুরের উপদ্রব থাকলে সেখানে বাতাসের মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই জাহাজের কেবিন বা স্টোরেজ এরিয়াগুলো এই সংক্রমণের মূল উৎস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এত কিছুর পরেও বিশেষজ্ঞরা এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম টেইলর জানিয়েছেন যে, হান্টাভাইরাস সাধারণত গণহারে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে না। জাহাজের যাত্রীরা হয়তো ভ্রমণের কোনো এক পর্যায়ে ইঁদুর উপদ্রুত কোনো দ্বীপ বা পরিবেশে গিয়েছিলেন, যার ফলে এই সংক্রমণ ঘটেছে। ২ মে জাহাজটিতে প্রথম অসুস্থতার খবর পাওয়া যায়, যা গত ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আটলান্টিকের বিভিন্ন দ্বীপে যাত্রাবিরতি নিয়েছিল। বর্তমানে জাহাজটি নিয়ে স্বাস্থ্য তদন্ত ও ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করার কাজ চলছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এড়িয়ে চলাই এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল