আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ত্যাগে গ্যাসের তীব্র সংকট এবং শিল্প-কৃষিতে নানামুখী স্থবিরতার কারণে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে অন্তত ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সাথে থমকে যেতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের সার্বিক গতি।
বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকলেও বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক সংকটের দরুন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। ফলে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সুযোগ হারাবেন বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। ইতোপূর্বে কেবল ২০২৫ সালেই দেশে নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ মূল প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকেরও বেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, দেশে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির (LNG) ৫৫-৬০ শতাংশ সরবরাহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পেট্রোবাংলার অধীনে থাকা ছয়টি দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি চুক্তির মধ্যে পাঁচটিতেই 'ফোর্স মেজর' (অবশ্যম্ভাবী বাধা) পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBTIU) এলএনজির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে—যা আগের স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এর সার্বিক প্রভাবে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষিখাতে। দেশে প্রতি হেক্টরে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি (৩৯১.৯ কেজি) সার ব্যবহার করা হলেও কাঁচামাল ও গ্যাস সংকটে অভ্যন্তরীণ ৬টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে ৫টিরই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার মূল্য ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সারের দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে, যা সরাসরি ক্ষুদ্র কৃষক ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তায় দেশের প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৬ হাজার ২০০টি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালনা ব্যয় মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহৎ সরকারি হাসপাতালগুলোর কেবল বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি মাসে গড়ে ৬ থেকে ১১ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও শিপিং খরচ বাড়ায় বিদেশ থেকে আসা ৯০ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ২৫০টি দেশীয় ওষুধ কারখানার কাঁচামাল আমদানিতে চড়া মূল্য গুনতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল জ্বালানি খাতেই সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২.৮ শতাংশে—যা অর্থের অংকে প্রায় ২.৫ থেকে ৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিগত সময়ের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় এবং এতে কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল এবং আন্তর্জাতিক সংকট না থাকলে তা আরও কমত।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কার যে আলোচনা চলছে, তা আমাদের বর্তমান বাস্তবতারই প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।”

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ত্যাগে গ্যাসের তীব্র সংকট এবং শিল্প-কৃষিতে নানামুখী স্থবিরতার কারণে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে অন্তত ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সাথে থমকে যেতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের সার্বিক গতি।
বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকলেও বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক সংকটের দরুন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। ফলে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সুযোগ হারাবেন বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। ইতোপূর্বে কেবল ২০২৫ সালেই দেশে নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ মূল প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকেরও বেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, দেশে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির (LNG) ৫৫-৬০ শতাংশ সরবরাহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পেট্রোবাংলার অধীনে থাকা ছয়টি দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি চুক্তির মধ্যে পাঁচটিতেই 'ফোর্স মেজর' (অবশ্যম্ভাবী বাধা) পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBTIU) এলএনজির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে—যা আগের স্বাভাবিক মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এর সার্বিক প্রভাবে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষিখাতে। দেশে প্রতি হেক্টরে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি (৩৯১.৯ কেজি) সার ব্যবহার করা হলেও কাঁচামাল ও গ্যাস সংকটে অভ্যন্তরীণ ৬টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে ৫টিরই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার মূল্য ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সারের দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে, যা সরাসরি ক্ষুদ্র কৃষক ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তায় দেশের প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৬ হাজার ২০০টি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালনা ব্যয় মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহৎ সরকারি হাসপাতালগুলোর কেবল বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি মাসে গড়ে ৬ থেকে ১১ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও শিপিং খরচ বাড়ায় বিদেশ থেকে আসা ৯০ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ২৫০টি দেশীয় ওষুধ কারখানার কাঁচামাল আমদানিতে চড়া মূল্য গুনতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল জ্বালানি খাতেই সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২.৮ শতাংশে—যা অর্থের অংকে প্রায় ২.৫ থেকে ৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিগত সময়ের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় এবং এতে কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল এবং আন্তর্জাতিক সংকট না থাকলে তা আরও কমত।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কার যে আলোচনা চলছে, তা আমাদের বর্তমান বাস্তবতারই প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।”

আপনার মতামত লিখুন