দিকপাল

পদ্মা-যমুনা-সুরমায় ভাঙন, ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা মানুষ


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ | ১০:০৪ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা-যমুনা-সুরমায় ভাঙন, ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা মানুষ

যমুনা, পদ্মা ও সুরমা—এই তিন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নদীভাঙন এক ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। নদীপাড়ের মানুষগুলোর জীবনে এখন এক চরম অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। চোখের সামনে নিজেদের ভিটেমাটি, ফসলি জমি, স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে দেখে তারা আজ দিশাহারা। ভাঙন রোধে অনেক জায়গায় সরকারিভাবে বালুভর্তি বস্তা বা জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তীব্র স্রোতের তোড়ে তা কার্যত কোনো কাজে আসছে না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক।


সুনামগঞ্জের সুরমা নদী এখন তার সর্বনাশা রূপ দেখিয়েছে। গত কয়েকদিনের ভাঙনে শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিনটি গ্রামের শত শত মানুষ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙন চললেও এখানে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বছর ধরেই এই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে অসংখ্য পরিবার তাদের সহায়-সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিষয়টি নিয়ে সুনামগঞ্জ তিন আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি দ্রুতই এলাকাটি পরিদর্শন করবেন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন রোধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরাও আশ্বাস দিয়েছেন যে, এখন জরুরিভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।


অন্যদিকে, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর ভাঙন যেন থামছেই না। গত তিন দিনে নদীগর্ভে চলে গেছে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা। অথচ সেখানে ভাঙন ঠেকাতে দিনরাত জিও ব্যাগ ও বিশেষ টিউব ফেলা হচ্ছে। কিন্তু নদীর ভাঙন যেন কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও জনবসতি লক্ষ্য করে এগিয়ে আসা এই ভাঙন স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং এই বিশেষ টিউবগুলো ভাঙন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই অবস্থা দেখা দিয়েছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর অঞ্চলেও। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে যমুনার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলগুলোতে বসতভিটা ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাট, আখ ও বাদামের মতো ফসলের মাঠ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা এখন পথে বসার উপক্রম।


রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ অঞ্চলেও পদ্মা নদীর ভাঙন স্থানীয়দের জীবনে দুর্দিন ডেকে এনেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের চারটি গ্রামে তীব্র ভাঙন চলছে। কাঁচা সড়ক থেকে শুরু করে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাওয়ায় এখানকার মানুষ চরম ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানিয়েছেন, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে রক্ষার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হচ্ছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে।


সামগ্রিকভাবে, দেশের এই নদীপ্রধান অঞ্চলগুলোতে ভাঙন রোধে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা বা বালুর বস্তা ফেলা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, প্রকৃতির এই ভয়াবহ থাবা থেকে বাঁচতে দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটানো এই পরিবারগুলোর জন্য এখন দ্রুত সরকারি ও প্রশাসনিক কার্যকর পদক্ষেপই শেষ ভরসা।

 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬


পদ্মা-যমুনা-সুরমায় ভাঙন, ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬

featured Image

যমুনা, পদ্মা ও সুরমা—এই তিন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নদীভাঙন এক ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। নদীপাড়ের মানুষগুলোর জীবনে এখন এক চরম অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। চোখের সামনে নিজেদের ভিটেমাটি, ফসলি জমি, স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে দেখে তারা আজ দিশাহারা। ভাঙন রোধে অনেক জায়গায় সরকারিভাবে বালুভর্তি বস্তা বা জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তীব্র স্রোতের তোড়ে তা কার্যত কোনো কাজে আসছে না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক।


সুনামগঞ্জের সুরমা নদী এখন তার সর্বনাশা রূপ দেখিয়েছে। গত কয়েকদিনের ভাঙনে শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিনটি গ্রামের শত শত মানুষ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙন চললেও এখানে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বছর ধরেই এই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে অসংখ্য পরিবার তাদের সহায়-সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিষয়টি নিয়ে সুনামগঞ্জ তিন আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি দ্রুতই এলাকাটি পরিদর্শন করবেন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন রোধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরাও আশ্বাস দিয়েছেন যে, এখন জরুরিভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।


অন্যদিকে, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর ভাঙন যেন থামছেই না। গত তিন দিনে নদীগর্ভে চলে গেছে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা। অথচ সেখানে ভাঙন ঠেকাতে দিনরাত জিও ব্যাগ ও বিশেষ টিউব ফেলা হচ্ছে। কিন্তু নদীর ভাঙন যেন কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও জনবসতি লক্ষ্য করে এগিয়ে আসা এই ভাঙন স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং এই বিশেষ টিউবগুলো ভাঙন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই অবস্থা দেখা দিয়েছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর অঞ্চলেও। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে যমুনার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলগুলোতে বসতভিটা ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাট, আখ ও বাদামের মতো ফসলের মাঠ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা এখন পথে বসার উপক্রম।


রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ অঞ্চলেও পদ্মা নদীর ভাঙন স্থানীয়দের জীবনে দুর্দিন ডেকে এনেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের চারটি গ্রামে তীব্র ভাঙন চলছে। কাঁচা সড়ক থেকে শুরু করে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাওয়ায় এখানকার মানুষ চরম ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানিয়েছেন, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে রক্ষার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হচ্ছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে।


সামগ্রিকভাবে, দেশের এই নদীপ্রধান অঞ্চলগুলোতে ভাঙন রোধে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা বা বালুর বস্তা ফেলা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, প্রকৃতির এই ভয়াবহ থাবা থেকে বাঁচতে দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটানো এই পরিবারগুলোর জন্য এখন দ্রুত সরকারি ও প্রশাসনিক কার্যকর পদক্ষেপই শেষ ভরসা।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল