দিকপাল

ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের খোঁজে ইউরোপ, চাপে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা


তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ | ০৯:৩২ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের খোঁজে ইউরোপ, চাপে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা

ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে তাদের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের যে নির্ভরতা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে আনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিরাপত্তার ঝুঁকি, আইনি জটিলতা এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির একটি যৌক্তিক ফলাফল।


ফ্রান্স সরকার তাদের সরকারি দপ্তরে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজের মতো মার্কিন সফটওয়্যারের ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকারি কাজে লিনাক্স ও ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের সিভিল সার্ভিস ও স্টেট রিফর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা জুম এবং মাইক্রোসফট টিমসকে প্রতিস্থাপন করতে নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ভিসিও ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের ডিজিটাল প্রশাসন ডিনাম সরকারি দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যেন ২০২৬ সালের শরতের মধ্যে তারা তাদের সিস্টেম মাইগ্রেশনের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সম্পন্ন করে। এই পরিবর্তনের পরিধি শুধু অপারেটিং সিস্টেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর আওতায় ক্লাউড স্টোরেজ, ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট এবং সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বেলজিয়ামের সাইবার নিরাপত্তা প্রধানের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরেছেন এবং সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চাইছেন।


ইউরোপের এই উদ্বেগের পেছনে মূলত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার ঝুঁকি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাউড আইনের বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অস্বস্তি রয়েছে। এই আইনের আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নির্দেশে যে কোনো ডেটা সরবরাহ করতে হয়, এমনকি সেই তথ্য যদি বিদেশের সার্ভারেও সংরক্ষিত থাকে। মাইক্রোসফট, ওরাকল, গুগল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তরের সংবেদনশীল তথ্য থাকায় ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা নিরাপত্তার ঝুঁকি অনুভব করছেন। তাদের ভয়, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেলে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।


ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এখন ডিজিটাল নীতিতে স্বাধীনতা এবং ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং দেশভিত্তিক ধাপে ধাপে পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডসের সরকার মাইক্রোসফটের গিটহাব থেকে তাদের কোড সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, ফিনল্যান্ড নির্বাচনী তথ্য অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভারে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বেলজিয়ামের ডোমেইন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই পরিবর্তন মানেই মার্কিন প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা নয়। ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তাদের লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের এই ডিজিটাল কৌশলটি মূলত কোনো হঠকারী নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬


ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের খোঁজে ইউরোপ, চাপে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬

featured Image

ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে তাদের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের যে নির্ভরতা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে আনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিরাপত্তার ঝুঁকি, আইনি জটিলতা এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির একটি যৌক্তিক ফলাফল।


ফ্রান্স সরকার তাদের সরকারি দপ্তরে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজের মতো মার্কিন সফটওয়্যারের ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকারি কাজে লিনাক্স ও ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের সিভিল সার্ভিস ও স্টেট রিফর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা জুম এবং মাইক্রোসফট টিমসকে প্রতিস্থাপন করতে নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ভিসিও ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের ডিজিটাল প্রশাসন ডিনাম সরকারি দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যেন ২০২৬ সালের শরতের মধ্যে তারা তাদের সিস্টেম মাইগ্রেশনের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সম্পন্ন করে। এই পরিবর্তনের পরিধি শুধু অপারেটিং সিস্টেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর আওতায় ক্লাউড স্টোরেজ, ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট এবং সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বেলজিয়ামের সাইবার নিরাপত্তা প্রধানের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরেছেন এবং সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চাইছেন।


ইউরোপের এই উদ্বেগের পেছনে মূলত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার ঝুঁকি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাউড আইনের বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অস্বস্তি রয়েছে। এই আইনের আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নির্দেশে যে কোনো ডেটা সরবরাহ করতে হয়, এমনকি সেই তথ্য যদি বিদেশের সার্ভারেও সংরক্ষিত থাকে। মাইক্রোসফট, ওরাকল, গুগল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তরের সংবেদনশীল তথ্য থাকায় ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা নিরাপত্তার ঝুঁকি অনুভব করছেন। তাদের ভয়, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেলে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।


ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এখন ডিজিটাল নীতিতে স্বাধীনতা এবং ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং দেশভিত্তিক ধাপে ধাপে পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডসের সরকার মাইক্রোসফটের গিটহাব থেকে তাদের কোড সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, ফিনল্যান্ড নির্বাচনী তথ্য অ্যামাজনের ক্লাউড সার্ভারে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বেলজিয়ামের ডোমেইন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই পরিবর্তন মানেই মার্কিন প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা নয়। ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তাদের লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের এই ডিজিটাল কৌশলটি মূলত কোনো হঠকারী নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল