দীর্ঘ চার মাস ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতি টানার লক্ষ্যে এক নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে একটি স্থায়ী রূপরেখায় নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উচ্চপর্যায়ের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক। এই শান্তি আলোচনাকে সফল করার লক্ষ্য নিয়ে শনিবার তেহরান থেকে ইরানের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এই আলোচনায় অংশ নিতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রোববার থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, তেহরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ছাড়াও জাতীয় নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা রয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাথে হওয়া চৌদ্দ দফা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মতপার্থক্য নিরসনের জন্য আগামী ষাট দিন এই আলোচনা প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলে নির্ধারিত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে মূল আলোচনা শুরুর ঠিক প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় উত্তজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রেভোলিউশনারি গার্ড বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে তেহরান এই কঠোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। তাদের মতে, বিশ্বকে বার্তা দেওয়ার জন্য এই নৌপথ দিয়ে যেকোনো জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ইরানের এই হুমকিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না ওয়াশিংটন। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম নিশ্চিত করেছে যে, শনিবারও হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রায় ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই এবং তিনি ট্রাম্পের এই শান্তি চুক্তি শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে আলোচনার কারিগরি দিকগুলো যাচাই-বাছাই করতে জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফসহ মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
তবে এই শান্তি আলোচনার মূল শর্ত ছিল লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এবং ইসরায়েলের শীর্ষ পর্যায় থেকেও বাহিনীকে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত হতাশাজনক। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের বিভিন্ন প্রান্তে ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকার মতো এলাকায় এখনো তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ তাদের ওপর ৫০টিরও বেশি রকেট নিক্ষেপ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, মার্কিন-ইরান এই চুক্তির সাথে ইসরায়েলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ইসরায়েলি সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই চুক্তির কোনো শর্ত মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন থেকে এখনই তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। হিজবুল্লাহও পাল্টা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন তারা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে। একদিকে লেবাননের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই স্নায়ুযুদ্ধ—সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ডের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে এখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে।

রোববার, ২১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
দীর্ঘ চার মাস ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতি টানার লক্ষ্যে এক নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে একটি স্থায়ী রূপরেখায় নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উচ্চপর্যায়ের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক। এই শান্তি আলোচনাকে সফল করার লক্ষ্য নিয়ে শনিবার তেহরান থেকে ইরানের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এই আলোচনায় অংশ নিতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রোববার থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, তেহরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ছাড়াও জাতীয় নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা রয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাথে হওয়া চৌদ্দ দফা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মতপার্থক্য নিরসনের জন্য আগামী ষাট দিন এই আলোচনা প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলে নির্ধারিত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে মূল আলোচনা শুরুর ঠিক প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় উত্তজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রেভোলিউশনারি গার্ড বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে তেহরান এই কঠোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। তাদের মতে, বিশ্বকে বার্তা দেওয়ার জন্য এই নৌপথ দিয়ে যেকোনো জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ইরানের এই হুমকিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না ওয়াশিংটন। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম নিশ্চিত করেছে যে, শনিবারও হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রায় ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই এবং তিনি ট্রাম্পের এই শান্তি চুক্তি শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে আলোচনার কারিগরি দিকগুলো যাচাই-বাছাই করতে জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফসহ মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
তবে এই শান্তি আলোচনার মূল শর্ত ছিল লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এবং ইসরায়েলের শীর্ষ পর্যায় থেকেও বাহিনীকে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত হতাশাজনক। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের বিভিন্ন প্রান্তে ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকার মতো এলাকায় এখনো তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ তাদের ওপর ৫০টিরও বেশি রকেট নিক্ষেপ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, মার্কিন-ইরান এই চুক্তির সাথে ইসরায়েলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ইসরায়েলি সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই চুক্তির কোনো শর্ত মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন থেকে এখনই তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। হিজবুল্লাহও পাল্টা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন তারা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে। একদিকে লেবাননের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই স্নায়ুযুদ্ধ—সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ডের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে এখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে।

আপনার মতামত লিখুন