বরিশালভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডকে ঘিরে বর্তমানে তীব্র আর্থিক কেলেঙ্কারি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচারের মাধ্যমে কোম্পানিটিকে লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়ার পর অবশেষে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকসহ চারটি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ঋণ এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে মূলধন সরিয়ে নেওয়ার পেছনে চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাচার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন শতাধিক শ্রমিকের বকেয়া বেতন ও বিভিন্ন পাওনা বাবদ সাড়ে নয় কোটি টাকা পরিশোধ না করেই গোপনে অন্য একটি সিমেন্ট কোম্পানির কাছে কারখানাটি বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। মালিকপক্ষের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গোপনে দেশত্যাগের পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো দাবি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বরিশাল নগরীর রূপাতলীতে কীর্তনখোলা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটি খান সন্স গ্রুপের একটি অংশ ছিল, যারা বাজারে অ্যাঙ্কর সিমেন্ট নামে তাদের পণ্য সরবরাহ করত। জানা যায়, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান খানের মৃত্যুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। তার স্ত্রী জুলিয়া রহমান বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাদের বড় মেয়ে আনিকা রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। বর্তমানে তারা দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও পরিচালনা পর্ষদে থাকা অন্য সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে একই নামের বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলসি বা ঋণপত্রের লেনদেনে অতিমূল্যায়ন দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা বিদেশে সরিয়েছেন তারা।
কেবল অর্থ পাচার নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকির গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোম্পানিটির অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে হুন্ডি প্রক্রিয়ার সহায়তা নেওয়া হয়েছে এবং এতে প্রতিষ্ঠানের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিগত তিন থেকে চার বছর ধরে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন না দিয়ে এবং একাধিক দফায় কর্মী ছাঁটাই করার পর গত ১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে প্রতিকারের জন্য অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর গত রোববার বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে প্রশাসনিক কঠোর অবস্থানের মুখে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ১৯ জুনের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির ৯০টি ট্রাক ও একটি লাইটার জাহাজ ক্রোকসহ পরিচালকদের দেশত্যাগের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. শাহেদ উদ্দীন জানিয়েছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আগামী ১৯ জুনের মধ্যে সাড়ে তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাওনা সাড়ে নয় কোটি টাকার চেক দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এক মাসের মধ্যে সব হিসাব সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ পুনরায় নিশ্চিত করেছেন যে, শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটির কোনো ধরনের মালিকানা হস্তান্তর বা হাতবদল সম্ভব নয় এবং প্রশাসনিক তদারকি অব্যাহত থাকবে।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬
বরিশালভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডকে ঘিরে বর্তমানে তীব্র আর্থিক কেলেঙ্কারি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচারের মাধ্যমে কোম্পানিটিকে লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়ার পর অবশেষে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকসহ চারটি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ঋণ এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে মূলধন সরিয়ে নেওয়ার পেছনে চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাচার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন শতাধিক শ্রমিকের বকেয়া বেতন ও বিভিন্ন পাওনা বাবদ সাড়ে নয় কোটি টাকা পরিশোধ না করেই গোপনে অন্য একটি সিমেন্ট কোম্পানির কাছে কারখানাটি বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। মালিকপক্ষের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গোপনে দেশত্যাগের পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো দাবি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বরিশাল নগরীর রূপাতলীতে কীর্তনখোলা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটি খান সন্স গ্রুপের একটি অংশ ছিল, যারা বাজারে অ্যাঙ্কর সিমেন্ট নামে তাদের পণ্য সরবরাহ করত। জানা যায়, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান খানের মৃত্যুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। তার স্ত্রী জুলিয়া রহমান বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাদের বড় মেয়ে আনিকা রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। বর্তমানে তারা দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও পরিচালনা পর্ষদে থাকা অন্য সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে একই নামের বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলসি বা ঋণপত্রের লেনদেনে অতিমূল্যায়ন দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা বিদেশে সরিয়েছেন তারা।
কেবল অর্থ পাচার নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকির গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোম্পানিটির অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে হুন্ডি প্রক্রিয়ার সহায়তা নেওয়া হয়েছে এবং এতে প্রতিষ্ঠানের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিগত তিন থেকে চার বছর ধরে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন না দিয়ে এবং একাধিক দফায় কর্মী ছাঁটাই করার পর গত ১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে প্রতিকারের জন্য অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর গত রোববার বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে প্রশাসনিক কঠোর অবস্থানের মুখে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ১৯ জুনের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির ৯০টি ট্রাক ও একটি লাইটার জাহাজ ক্রোকসহ পরিচালকদের দেশত্যাগের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. শাহেদ উদ্দীন জানিয়েছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আগামী ১৯ জুনের মধ্যে সাড়ে তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাওনা সাড়ে নয় কোটি টাকার চেক দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এক মাসের মধ্যে সব হিসাব সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ পুনরায় নিশ্চিত করেছেন যে, শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটির কোনো ধরনের মালিকানা হস্তান্তর বা হাতবদল সম্ভব নয় এবং প্রশাসনিক তদারকি অব্যাহত থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন