দিকপাল

দুবাইয়ে বেনজীরের গ্রেপ্তার, বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ | ০৯:০৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

দুবাইয়ে বেনজীরের গ্রেপ্তার, বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং হত্যাসহ নানা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালী এই কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে, যারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশের মাটিতে আত্মগোপন করে আছেন, তাদের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস রয়েছে, তারা এখন বর্তমান আশ্রয়স্থল ছেড়ে আরও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অস্থির হয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

দুবাই সিটি পুলিশ কর্তৃক বেনজীর আহমেদকে আটকের বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে গত ১২ জুন আবুধাবি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বিবৃতি প্রদান করেন এবং তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান। দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বেনজীরের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের ছয়টি মামলা চলমান রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অন্তত দশটি মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির এভাবে বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে বর্তমান সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি শুভ সংকেত এবং আইনের শাসনে অপরাধী যে দলের বা শক্তিরই হোক না কেন, তাদের ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরটি পঁচিশ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে ও পরে বিদেশে পাড়ি জমানো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সুবিধাভোগী মহলে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা ব্যক্তিদের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। এছাড়া যেসব নেতাকর্মী রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে নাকচ হয়েছেন, তাদের মধ্যে ভীতি আরও প্রবল। তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে এখন যে কোনো প্রান্ত থেকেই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তবে ভারতপ্রবাসী নেতারা এখনো নিজেদের কিছুটা নিরাপদ মনে করছেন। তারা ধারণা করছেন, শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারত সরকারের বিশেষ সুসম্পর্ক থাকার কারণে সেখানে তারা অনেকটা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা সেই আস্থার জায়গাটিকেও কিছুটা নড়বড়ে করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনা কেবল তার একার জন্য নয়, বরং বিদেশে পলাতক সব অপরাধীর জন্যই একটি কঠোর বার্তা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার একটি অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে। এখন বিশ্বের অনেক দেশ ভিসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস যাচাই করছে, ফলে রেড নোটিস জারি থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিদেশে আত্মগোপন করে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও আইনি প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ এবং জটিল হতে পারে। অপরাধী হিসেবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ব্যবস্থাকে সন্তুষ্ট করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। তিনি সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেন।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশন প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দুদকের তথ্যানুযায়ী, তার নামে অঢেল অবৈধ সম্পদের পাহাড় রয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে তার শত শত বিঘা জমির তথ্যও পাওয়া গেছে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তির বিষয়টি দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে বেনজীরের ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা সফল করার জন্য সরকার সর্বাত্মক কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই গ্রেপ্তারের ঘটনা বিদেশে পলাতক অপরাধী মহলে যে অস্বস্তি তৈরি করেছে, তা আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হবে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


দুবাইয়ে বেনজীরের গ্রেপ্তার, বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং হত্যাসহ নানা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালী এই কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে, যারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশের মাটিতে আত্মগোপন করে আছেন, তাদের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস রয়েছে, তারা এখন বর্তমান আশ্রয়স্থল ছেড়ে আরও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অস্থির হয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

দুবাই সিটি পুলিশ কর্তৃক বেনজীর আহমেদকে আটকের বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে গত ১২ জুন আবুধাবি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বিবৃতি প্রদান করেন এবং তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান। দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বেনজীরের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের ছয়টি মামলা চলমান রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অন্তত দশটি মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির এভাবে বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে বর্তমান সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি শুভ সংকেত এবং আইনের শাসনে অপরাধী যে দলের বা শক্তিরই হোক না কেন, তাদের ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরটি পঁচিশ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে ও পরে বিদেশে পাড়ি জমানো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সুবিধাভোগী মহলে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা ব্যক্তিদের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। এছাড়া যেসব নেতাকর্মী রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে নাকচ হয়েছেন, তাদের মধ্যে ভীতি আরও প্রবল। তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে এখন যে কোনো প্রান্ত থেকেই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তবে ভারতপ্রবাসী নেতারা এখনো নিজেদের কিছুটা নিরাপদ মনে করছেন। তারা ধারণা করছেন, শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারত সরকারের বিশেষ সুসম্পর্ক থাকার কারণে সেখানে তারা অনেকটা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা সেই আস্থার জায়গাটিকেও কিছুটা নড়বড়ে করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনা কেবল তার একার জন্য নয়, বরং বিদেশে পলাতক সব অপরাধীর জন্যই একটি কঠোর বার্তা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার একটি অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে। এখন বিশ্বের অনেক দেশ ভিসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস যাচাই করছে, ফলে রেড নোটিস জারি থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিদেশে আত্মগোপন করে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও আইনি প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ এবং জটিল হতে পারে। অপরাধী হিসেবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ব্যবস্থাকে সন্তুষ্ট করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। তিনি সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেন।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশন প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দুদকের তথ্যানুযায়ী, তার নামে অঢেল অবৈধ সম্পদের পাহাড় রয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে তার শত শত বিঘা জমির তথ্যও পাওয়া গেছে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তির বিষয়টি দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে বেনজীরের ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা সফল করার জন্য সরকার সর্বাত্মক কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই গ্রেপ্তারের ঘটনা বিদেশে পলাতক অপরাধী মহলে যে অস্বস্তি তৈরি করেছে, তা আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হবে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল