দিকপাল

শপিং মলে ডেকে সাবেক আইজিপি বেনজীরকে ধরিয়ে দিলেন এমপি বন্ধু


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ | ১১:২১ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

শপিং মলে ডেকে সাবেক আইজিপি বেনজীরকে ধরিয়ে দিলেন এমপি বন্ধু

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নয় বরং একটি শপিং মল থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য ও তার ব্যবসায়িক সহযোগী তাকে ফোন করে ওই শপিং মলে ডেকে নেন। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ওত পেতে থাকা দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এদিকে টানা তিন দিনের সরকারি ছুটি শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুবাইয়ের একটি আদালতে তার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

বেনজীর আহমেদের স্ত্রীর বরাত দিয়ে তার সাবেক এক স্টাফ অফিসার জানান, সাবেক এই আইজিপি দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে দুবাইয়ে বসবাস করছেন। গত ১২ জুন তিনি যথারীতি বাসাতেই ছিলেন। ওই দিন বিকেলে তার বন্ধু চট্টগ্রামের এক সংসদ সদস্য তাকে ফোন করে বাসার কাছের একটি শপিং মলে দেখা করার অনুরোধ জানান। বেনজীর আহমেদ শপিং মলে পৌঁছানো মাত্রই সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া দুবাই পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। এ সময় ওই সংসদ সদস্যের অনুসারীরাও পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

পারিবারিক সূত্র আরও দাবি করেছে, দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জেনেছেন যে বেনজীরের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে কোনো মামলা নেই। বাংলাদেশ পুলিশের অনুরোধে ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশটি ওই সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুবাই পুলিশের কাছে উপস্থাপন করে এই গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করেছেন।

ঢাকায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পরপরই দুবাইয়ে তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য ঢাকা থেকে মামলার সব নথিপত্র ইতিমধ্যেই দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ জুন শুক্রবার সীমিত পরিসরে আদালত চললেও পরবর্তী শনি ও রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। এরপর সোমবার (১৫ জুন) হিজরি নববর্ষের সরকারি ছুটি থাকায় টানা তিন দিন আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে মঙ্গলবার আদালত খোলার পর সাবেক এই আইজিপিকে সেখানে হাজির করা হতে পারে। দুবাই পুলিশ তাকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করলে তার আইনজীবী জামিন চাইবেন। অন্যথায় প্রসিকিউশন দপ্তরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি প্রথমে সাড়া দেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি। রাতে পুনরায় কল করা হলে তিনি রিসিভ করেন, তবে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই কোনো মন্তব্য না করে লাইন কেটে দেন।

বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন পুলিশের সাবেক একজন অতিরিক্ত আইজিপি। তিনি জানান, ব্যক্তিগত উদ্যোগে রেড নোটিশ জমা দিয়ে যেভাবে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে, তা দুবাইয়ের আদালত ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। এই গ্রেপ্তারের পেছনে মূলত ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিরোধ রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনজীরের বিপুল অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেলেও দুবাই প্রসিকিউশনে মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলে মামলা দুর্বল হয়ে যাবে। এছাড়া বেনজীর আহমেদ কোন পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে দুবাই গেলেও বর্তমানে তিনি তুরস্কের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন বলে আলোচনা রয়েছে। এই পরিচয়-সংকট প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দুবাই পুলিশ বেনজীর আহমেদের আটকের বিষয়টি বাংলাদেশ পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। তবে এই গ্রেপ্তার ইন্টারপোলের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় হয়েছে নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাব রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

সদরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, সাবেক আইজিপির গ্রেপ্তারের বিষয়টি তারা অবগত আছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও আইনি চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


শপিং মলে ডেকে সাবেক আইজিপি বেনজীরকে ধরিয়ে দিলেন এমপি বন্ধু

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

featured Image

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নয় বরং একটি শপিং মল থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য ও তার ব্যবসায়িক সহযোগী তাকে ফোন করে ওই শপিং মলে ডেকে নেন। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ওত পেতে থাকা দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এদিকে টানা তিন দিনের সরকারি ছুটি শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুবাইয়ের একটি আদালতে তার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

বেনজীর আহমেদের স্ত্রীর বরাত দিয়ে তার সাবেক এক স্টাফ অফিসার জানান, সাবেক এই আইজিপি দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে দুবাইয়ে বসবাস করছেন। গত ১২ জুন তিনি যথারীতি বাসাতেই ছিলেন। ওই দিন বিকেলে তার বন্ধু চট্টগ্রামের এক সংসদ সদস্য তাকে ফোন করে বাসার কাছের একটি শপিং মলে দেখা করার অনুরোধ জানান। বেনজীর আহমেদ শপিং মলে পৌঁছানো মাত্রই সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া দুবাই পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। এ সময় ওই সংসদ সদস্যের অনুসারীরাও পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

পারিবারিক সূত্র আরও দাবি করেছে, দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জেনেছেন যে বেনজীরের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে কোনো মামলা নেই। বাংলাদেশ পুলিশের অনুরোধে ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশটি ওই সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুবাই পুলিশের কাছে উপস্থাপন করে এই গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করেছেন।

ঢাকায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পরপরই দুবাইয়ে তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য ঢাকা থেকে মামলার সব নথিপত্র ইতিমধ্যেই দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ জুন শুক্রবার সীমিত পরিসরে আদালত চললেও পরবর্তী শনি ও রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। এরপর সোমবার (১৫ জুন) হিজরি নববর্ষের সরকারি ছুটি থাকায় টানা তিন দিন আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে মঙ্গলবার আদালত খোলার পর সাবেক এই আইজিপিকে সেখানে হাজির করা হতে পারে। দুবাই পুলিশ তাকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করলে তার আইনজীবী জামিন চাইবেন। অন্যথায় প্রসিকিউশন দপ্তরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি প্রথমে সাড়া দেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি। রাতে পুনরায় কল করা হলে তিনি রিসিভ করেন, তবে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই কোনো মন্তব্য না করে লাইন কেটে দেন।

বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন পুলিশের সাবেক একজন অতিরিক্ত আইজিপি। তিনি জানান, ব্যক্তিগত উদ্যোগে রেড নোটিশ জমা দিয়ে যেভাবে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে, তা দুবাইয়ের আদালত ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। এই গ্রেপ্তারের পেছনে মূলত ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিরোধ রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনজীরের বিপুল অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেলেও দুবাই প্রসিকিউশনে মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলে মামলা দুর্বল হয়ে যাবে। এছাড়া বেনজীর আহমেদ কোন পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে দুবাই গেলেও বর্তমানে তিনি তুরস্কের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন বলে আলোচনা রয়েছে। এই পরিচয়-সংকট প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দুবাই পুলিশ বেনজীর আহমেদের আটকের বিষয়টি বাংলাদেশ পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। তবে এই গ্রেপ্তার ইন্টারপোলের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় হয়েছে নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাব রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

সদরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, সাবেক আইজিপির গ্রেপ্তারের বিষয়টি তারা অবগত আছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও আইনি চেষ্টা চালানো হচ্ছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল