জুলাই বিপ্লব চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফারহান ফাইয়াজ ও মাহমুদুল রহমান সৈকতসহ মোট নয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিচারিক কার্যক্রম আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আজ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আইনি লড়াইয়ের নতুন ধাপ শুরু হচ্ছে এবং এরপরই প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হবে।
এর আগে গত ১০ মে আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ওই সময় আসামিপক্ষ থেকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানানো হলেও বিচারক তা সরাসরি খারিজ করে দেন। আদালতে উপস্থিত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গত ৮ জুন বিচার শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে আজকের দিন ধার্য করা হয়েছিল। মামলার এজাহারভুক্ত ২৮ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে চারজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তারা হলেন মোহাম্মদপুর থানা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল এবং সংগঠনের তিন নেতা সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। আজ সকালেই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার এবং যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, জাহাঙ্গীর কবির নানক তৎকালীন সরকারের প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ছাত্র-জনতাকে দমনের নির্দেশনা দিতেন। এছাড়া তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করেন। বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে নিরীহ মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ফারহান ফাইয়াজসহ অনেকে প্রাণ হারান।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, বসিলা রোড ও নূর জাহান রোডসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। বিপ্লব কুমার সরকার ও অন্যান্য কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে চালানো সেই হামলায় রিকশাচালক মাহিন মিয়া, রনিসহ বহু মানুষ শহীদ হন এবং অনেকে গুরুতর আহত হন। ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর এলাকায় আরও ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করা হয়, যা আসামিদের উপস্থিতিতে ও সরাসরি সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছে বলে প্রসিকিউশন উল্লেখ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল আজ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করছে, যা জুলাই বিপ্লবের এই সংঘাতময় দিনগুলোর বিচারিক সত্য উদঘাটনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
জুলাই বিপ্লব চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফারহান ফাইয়াজ ও মাহমুদুল রহমান সৈকতসহ মোট নয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিচারিক কার্যক্রম আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আজ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আইনি লড়াইয়ের নতুন ধাপ শুরু হচ্ছে এবং এরপরই প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হবে।
এর আগে গত ১০ মে আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ওই সময় আসামিপক্ষ থেকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানানো হলেও বিচারক তা সরাসরি খারিজ করে দেন। আদালতে উপস্থিত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গত ৮ জুন বিচার শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে আজকের দিন ধার্য করা হয়েছিল। মামলার এজাহারভুক্ত ২৮ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে চারজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তারা হলেন মোহাম্মদপুর থানা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল এবং সংগঠনের তিন নেতা সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। আজ সকালেই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার এবং যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, জাহাঙ্গীর কবির নানক তৎকালীন সরকারের প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ছাত্র-জনতাকে দমনের নির্দেশনা দিতেন। এছাড়া তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করেন। বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে নিরীহ মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ফারহান ফাইয়াজসহ অনেকে প্রাণ হারান।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, বসিলা রোড ও নূর জাহান রোডসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। বিপ্লব কুমার সরকার ও অন্যান্য কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে চালানো সেই হামলায় রিকশাচালক মাহিন মিয়া, রনিসহ বহু মানুষ শহীদ হন এবং অনেকে গুরুতর আহত হন। ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর এলাকায় আরও ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করা হয়, যা আসামিদের উপস্থিতিতে ও সরাসরি সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছে বলে প্রসিকিউশন উল্লেখ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল আজ থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করছে, যা জুলাই বিপ্লবের এই সংঘাতময় দিনগুলোর বিচারিক সত্য উদঘাটনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন