দিকপাল

দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভুটানের পরেই বাংলাদেশ


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ | ০৯:২০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভুটানের পরেই বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শান্তি সূচক (গ্লোবাল পিস ইনডেক্স) প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ১৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে শান্তির পারদ ক্রমান্বয়ে নিচে নামছে। এবারের সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থাকলেও সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলটি তীব্র অস্থিতিশীলতা ও বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির মাত্রা সবচেয়ে দ্রুত হারে হ্রাস পেয়েছে।

প্রকাশিত সূচকে ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১১৭তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ৫-এর মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ২.২২৬, যা দেশকে ‘মধ্যম শান্তির’ দেশের তালিকায় রেখেছে। শান্তিমাপক তিনটি প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় ২.৫৭৯, চলমান সংঘাতের সূচকে ২.২৩৭ এবং সামরিকীকরণ রোধে ১.৬১৫ স্কোর অর্জন করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তুলনায় ভালো অবস্থানে থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শান্তির শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় ১৬তম অবস্থানে থাকা এই দেশটিই এই অঞ্চলের একমাত্র ‘উচ্চ শান্তির’ মর্যাদাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র। এরপর ৬৭তম স্থানে শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় এবং ১১১তম স্থানে নেপাল তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত সংঘাতের কারণে অবনতি ঘটে ১২৭তম স্থানে নেমে যাওয়া ভারত এবার ‘নিম্ন শান্তির’ দেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তালিকার ১৫২তম অবস্থানে পাকিস্তান এবং ১৫৭তম অবস্থানে থেকে আফগানিস্তান এই অঞ্চলের সবচেয়ে অশান্ত ও অস্থির দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে বিশ্বের সব অঞ্চলের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াতেই শান্তির মাত্রা সবচেয়ে দ্রুত গতিতে কমেছে, যার গড় হার ২.৩ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমান্ত উত্তেজনার ফলে এই অঞ্চলে চলমান সংঘাতের পরিস্থিতির প্রায় ৭.১ শতাংশ পর্যন্ত অবনতি ঘটেছে। বিশ্বজুড়েও এই নেতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট। গত ১২ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক শান্তি সূচক নিম্নমুখী, যেখানে সর্বশেষ এক বছরেই এই অবনতির হার ০.৭ শতাংশ। মূল্যায়ন করা দেশগুলোর মধ্যে ৯৯টি দেশেই শান্তি পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

এবারের সূচকেও টানা ১৯ বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষ মর্যাদা ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। শীর্ষ তালিকায় এর পরেই রয়েছে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। বিপরীতে, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে প্রথমবারের মতো রাশিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ বা শীর্ষ অশান্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাশিয়ার পরেই ক্রমান্বয়ে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইউক্রেন ও ইসরায়েলের অবস্থান।

শান্তি সূচকে বাংলাদেশ মধ্যম অবস্থানে থাকলেও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেদনে কিছু গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে iran যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আকাশচুম্বী মূল্য এবং বিশ্ববাজারে চাহিদার তীব্র ওঠানামা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করতে পারে।

প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি আমদানিতে অতি-নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশগত ঝুঁকিকে বাংলাদেশের জন্য ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম রুট হরমুজ প্রণালিতে যদি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দেশের মোট জিডিপির ১.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন চরম পরিস্থিতি তৈরি হলে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানি-নির্ভর দেশগুলোই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার শিকার হবে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভুটানের পরেই বাংলাদেশ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শান্তি সূচক (গ্লোবাল পিস ইনডেক্স) প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ১৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে শান্তির পারদ ক্রমান্বয়ে নিচে নামছে। এবারের সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থাকলেও সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলটি তীব্র অস্থিতিশীলতা ও বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির মাত্রা সবচেয়ে দ্রুত হারে হ্রাস পেয়েছে।

প্রকাশিত সূচকে ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১১৭তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ৫-এর মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ২.২২৬, যা দেশকে ‘মধ্যম শান্তির’ দেশের তালিকায় রেখেছে। শান্তিমাপক তিনটি প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় ২.৫৭৯, চলমান সংঘাতের সূচকে ২.২৩৭ এবং সামরিকীকরণ রোধে ১.৬১৫ স্কোর অর্জন করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তুলনায় ভালো অবস্থানে থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শান্তির শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় ১৬তম অবস্থানে থাকা এই দেশটিই এই অঞ্চলের একমাত্র ‘উচ্চ শান্তির’ মর্যাদাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র। এরপর ৬৭তম স্থানে শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় এবং ১১১তম স্থানে নেপাল তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত সংঘাতের কারণে অবনতি ঘটে ১২৭তম স্থানে নেমে যাওয়া ভারত এবার ‘নিম্ন শান্তির’ দেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তালিকার ১৫২তম অবস্থানে পাকিস্তান এবং ১৫৭তম অবস্থানে থেকে আফগানিস্তান এই অঞ্চলের সবচেয়ে অশান্ত ও অস্থির দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে বিশ্বের সব অঞ্চলের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াতেই শান্তির মাত্রা সবচেয়ে দ্রুত গতিতে কমেছে, যার গড় হার ২.৩ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমান্ত উত্তেজনার ফলে এই অঞ্চলে চলমান সংঘাতের পরিস্থিতির প্রায় ৭.১ শতাংশ পর্যন্ত অবনতি ঘটেছে। বিশ্বজুড়েও এই নেতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট। গত ১২ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক শান্তি সূচক নিম্নমুখী, যেখানে সর্বশেষ এক বছরেই এই অবনতির হার ০.৭ শতাংশ। মূল্যায়ন করা দেশগুলোর মধ্যে ৯৯টি দেশেই শান্তি পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

এবারের সূচকেও টানা ১৯ বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষ মর্যাদা ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। শীর্ষ তালিকায় এর পরেই রয়েছে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। বিপরীতে, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে প্রথমবারের মতো রাশিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ বা শীর্ষ অশান্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাশিয়ার পরেই ক্রমান্বয়ে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইউক্রেন ও ইসরায়েলের অবস্থান।

শান্তি সূচকে বাংলাদেশ মধ্যম অবস্থানে থাকলেও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেদনে কিছু গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে iran যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আকাশচুম্বী মূল্য এবং বিশ্ববাজারে চাহিদার তীব্র ওঠানামা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করতে পারে।

প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি আমদানিতে অতি-নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশগত ঝুঁকিকে বাংলাদেশের জন্য ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম রুট হরমুজ প্রণালিতে যদি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দেশের মোট জিডিপির ১.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন চরম পরিস্থিতি তৈরি হলে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানি-নির্ভর দেশগুলোই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার শিকার হবে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল