গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এবং এর প্রভাবশালী অনেক নেতা দেশত্যাগ করলেও কুমিল্লায় সাবেক সংসদ সদস্য আকম বাহাউদ্দিন বাহারের রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা এই প্রভাবশালী নেতা সম্প্রতি অনলাইনে একটি ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণকে উত্তপ্ত করে তুলেছেন। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই কুমিল্লা জেলা জুড়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন রয়েছে যে, বাহারের অনেক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ঘনিষ্ঠজনরা এখনো কুমিল্লার প্রভাবশালী বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিরাপদে আছেন, যার ফলে পলাতক থেকেও তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
গত শনিবার রাতের ওই ভার্চুয়াল বক্তব্যে বাহার দাবি করেন, সরকারের ক্ষমতার দাপটে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই পুরোনো সম্পর্কের রেশ ধরেই এখনো বিএনপির একটি অংশ বাহারের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করছেন। এই সহায়তার কারণেই কুমিল্লার অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সাংগঠনিক যোগাযোগ এখনো অটুট রয়েছে। একই সাথে বাহারের উস্কানিমূলক বক্তব্যের পরপরই গত রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানা এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রায় তিন শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল বের করে। তবে স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং স্থানীয়রা ৪৮ জনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে জন্মদিনের অনুষ্ঠান ও বনভোজনের নাম করে দূর-দূরান্ত থেকে কিশোর ও সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের ওই মিছিলে জড়ো করা হয়েছিল। প্রতিটি মিছিলে অংশ নেওয়ার জন্য অর্থের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বাহারের অনুসারীরা এখন ছদ্মবেশে বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে মিছিলের কৌশল নিয়েছে। বুড়িচং, চান্দিনা, সদর দক্ষিণ এবং মুরাদনগরে এভাবে পাল্টাপাল্টি মিছিলের মাধ্যমে জনমনে ভীতি ছড়ানোর অভিযোগ করছেন স্থানীয় পরিবহন চালক ও সাধারণ মানুষ।
বাহারের বক্তব্যে বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষা থাকলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে এর কোনো জোরালো প্রতিবাদ দেখা যায়নি, যা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দাবি, কিছু সুবিধাবাদী নেতা ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়ে পলাতক বাহারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের পেছনে কুমিল্লার কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা শোনা যাচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও ঠিকাদারি কাজ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করছেন অনেক স্থানীয় নেতা। কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলে এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ থাকত না। এদিকে বাহারের মাদরাসা বিরোধী বক্তব্য এবং জনগণের প্রতি হুমকির প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার আলেম-উলামা সমাজ। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা বাহারকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আটক অভিযান নয়, বরং এসব নেপথ্যের কারিগরদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না হলে এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরবে না।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এবং এর প্রভাবশালী অনেক নেতা দেশত্যাগ করলেও কুমিল্লায় সাবেক সংসদ সদস্য আকম বাহাউদ্দিন বাহারের রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা এই প্রভাবশালী নেতা সম্প্রতি অনলাইনে একটি ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণকে উত্তপ্ত করে তুলেছেন। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই কুমিল্লা জেলা জুড়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন রয়েছে যে, বাহারের অনেক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ঘনিষ্ঠজনরা এখনো কুমিল্লার প্রভাবশালী বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিরাপদে আছেন, যার ফলে পলাতক থেকেও তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
গত শনিবার রাতের ওই ভার্চুয়াল বক্তব্যে বাহার দাবি করেন, সরকারের ক্ষমতার দাপটে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই পুরোনো সম্পর্কের রেশ ধরেই এখনো বিএনপির একটি অংশ বাহারের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করছেন। এই সহায়তার কারণেই কুমিল্লার অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সাংগঠনিক যোগাযোগ এখনো অটুট রয়েছে। একই সাথে বাহারের উস্কানিমূলক বক্তব্যের পরপরই গত রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানা এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রায় তিন শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল বের করে। তবে স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং স্থানীয়রা ৪৮ জনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে জন্মদিনের অনুষ্ঠান ও বনভোজনের নাম করে দূর-দূরান্ত থেকে কিশোর ও সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের ওই মিছিলে জড়ো করা হয়েছিল। প্রতিটি মিছিলে অংশ নেওয়ার জন্য অর্থের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বাহারের অনুসারীরা এখন ছদ্মবেশে বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে মিছিলের কৌশল নিয়েছে। বুড়িচং, চান্দিনা, সদর দক্ষিণ এবং মুরাদনগরে এভাবে পাল্টাপাল্টি মিছিলের মাধ্যমে জনমনে ভীতি ছড়ানোর অভিযোগ করছেন স্থানীয় পরিবহন চালক ও সাধারণ মানুষ।
বাহারের বক্তব্যে বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষা থাকলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে এর কোনো জোরালো প্রতিবাদ দেখা যায়নি, যা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দাবি, কিছু সুবিধাবাদী নেতা ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়ে পলাতক বাহারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের পেছনে কুমিল্লার কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা শোনা যাচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও ঠিকাদারি কাজ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করছেন অনেক স্থানীয় নেতা। কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলে এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ থাকত না। এদিকে বাহারের মাদরাসা বিরোধী বক্তব্য এবং জনগণের প্রতি হুমকির প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার আলেম-উলামা সমাজ। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা বাহারকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আটক অভিযান নয়, বরং এসব নেপথ্যের কারিগরদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না হলে এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরবে না।

আপনার মতামত লিখুন