দিকপাল

কম্বোডিয়ার কুখ্যাত সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে দেশে ফিরলেন আরও ৫৪ বাংলাদেশি


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ | ১২:৩৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

কম্বোডিয়ার কুখ্যাত সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে দেশে ফিরলেন আরও ৫৪ বাংলাদেশি

কম্বোডিয়ার কুখ্যাত অনলাইন প্রতারণা চক্রের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া আরও চুয়ান্ন জন বাংলাদেশি নাগরিক নিরাপদে দেশে ফিরে এসেছেন। শনিবার দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এর আগে শুক্রবারও সাঁইত্রিশ জন বাংলাদেশি ফিরেছিলেন। ফলে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে মোট একানব্বই জন ভুক্তভোগী মানবপাচারকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে স্বজনদের কাছে ফিরে আসার সুযোগ পেলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে তাদের জরুরি সহায়তা ও বাড়ি ফেরার আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।

দেশে ফেরা ভুক্তভোগীদের বর্ণনা থেকে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক চিত্র ফুটে উঠেছে। তারা জানান, ভালো বেতনের আইটি ও সুপারশপের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ ছাড়পত্র ব্যবহার করেই তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় দৃশ্যপট। বিমানবন্দরে নামার পরপরই স্থানীয় বাংলাদেশি দালাল চক্রের সদস্যরা তাদের জিম্মি করে এবং চীনা নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেয়।

শনিবার ফিরে আসা এক ভুক্তভোগী নিজের নির্মম অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া হয়ে কম্বোডিয়া যাওয়ার পর বিমানবন্দর থেকেই রবিন শেখ নামের এক বাংলাদেশি দালাল তাকে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে সাধারণ চাকরির কথা বলা হলেও পরে তাকে একটি অনলাইন স্ক্যাম প্ল্যাটফর্মে আটকে ফেলা হয়। সেখানে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতন। পাচারকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যে চড়া মূল্যে তাকে কেনা হয়েছে, সেই টাকা পরিশোধ না করলে মুক্তি মিলবে না।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, এসব সুরক্ষিত স্ক্যাম সেন্টারে জিম্মি করে তাদের দিয়ে মূলত আন্তর্জাতিক অনলাইন জালিয়াতির কাজ করানো হতো। প্রতিদিনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (টার্গেট) পূরণে ব্যর্থ হলে চলতো অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দীর্ঘ কয়েক মাস অবর্ণনীয় নরকযাতনা সহ্য করার পর, কম্বোডিয়ান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানের মুখে এসব কম্পাউন্ড থেকে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই ঘটনাকে মানবপাচারের এক ভয়ংকর ও আধুনিক রূপ (ডিজিটাল স্লেভারি) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বেতনের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ তরুণদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

"কেবল কম্বোডিয়া নয়; থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও এই সাইবার স্ক্যাম চক্রগুলো ব্যাপকভাবে সক্রিয় রয়েছে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, যা এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ।" — শরিফুল হাসান, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

বিশেষজ্ঞরা দেশের মানুষকে বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অতি-লোভনীয় প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কোনো এজেন্সির মাধ্যমে বা কোনো প্রতিষ্ঠানে পাড়ি জমানোর আগে সরকারিভাবে তার বৈধতা এবং কাজের পরিবেশ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


কম্বোডিয়ার কুখ্যাত সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে দেশে ফিরলেন আরও ৫৪ বাংলাদেশি

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

কম্বোডিয়ার কুখ্যাত অনলাইন প্রতারণা চক্রের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া আরও চুয়ান্ন জন বাংলাদেশি নাগরিক নিরাপদে দেশে ফিরে এসেছেন। শনিবার দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এর আগে শুক্রবারও সাঁইত্রিশ জন বাংলাদেশি ফিরেছিলেন। ফলে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে মোট একানব্বই জন ভুক্তভোগী মানবপাচারকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে স্বজনদের কাছে ফিরে আসার সুযোগ পেলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে তাদের জরুরি সহায়তা ও বাড়ি ফেরার আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।

দেশে ফেরা ভুক্তভোগীদের বর্ণনা থেকে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক চিত্র ফুটে উঠেছে। তারা জানান, ভালো বেতনের আইটি ও সুপারশপের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ ছাড়পত্র ব্যবহার করেই তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় দৃশ্যপট। বিমানবন্দরে নামার পরপরই স্থানীয় বাংলাদেশি দালাল চক্রের সদস্যরা তাদের জিম্মি করে এবং চীনা নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেয়।

শনিবার ফিরে আসা এক ভুক্তভোগী নিজের নির্মম অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া হয়ে কম্বোডিয়া যাওয়ার পর বিমানবন্দর থেকেই রবিন শেখ নামের এক বাংলাদেশি দালাল তাকে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে সাধারণ চাকরির কথা বলা হলেও পরে তাকে একটি অনলাইন স্ক্যাম প্ল্যাটফর্মে আটকে ফেলা হয়। সেখানে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতন। পাচারকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যে চড়া মূল্যে তাকে কেনা হয়েছে, সেই টাকা পরিশোধ না করলে মুক্তি মিলবে না।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, এসব সুরক্ষিত স্ক্যাম সেন্টারে জিম্মি করে তাদের দিয়ে মূলত আন্তর্জাতিক অনলাইন জালিয়াতির কাজ করানো হতো। প্রতিদিনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (টার্গেট) পূরণে ব্যর্থ হলে চলতো অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দীর্ঘ কয়েক মাস অবর্ণনীয় নরকযাতনা সহ্য করার পর, কম্বোডিয়ান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানের মুখে এসব কম্পাউন্ড থেকে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই ঘটনাকে মানবপাচারের এক ভয়ংকর ও আধুনিক রূপ (ডিজিটাল স্লেভারি) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বেতনের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ তরুণদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

"কেবল কম্বোডিয়া নয়; থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও এই সাইবার স্ক্যাম চক্রগুলো ব্যাপকভাবে সক্রিয় রয়েছে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, যা এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ।" — শরিফুল হাসান, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

বিশেষজ্ঞরা দেশের মানুষকে বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অতি-লোভনীয় প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কোনো এজেন্সির মাধ্যমে বা কোনো প্রতিষ্ঠানে পাড়ি জমানোর আগে সরকারিভাবে তার বৈধতা এবং কাজের পরিবেশ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল