দিকপাল

পদ্মার চরে বন্দুকধারীদের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে এলাকাবাসী


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৯ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মার চরে বন্দুকধারীদের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে এলাকাবাসী

রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী পদ্মার বিশাল চরাঞ্চল এখন অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা প্রতিনিয়ত চালাচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। বালুমহাল দখল এবং চরের জমির মালিকানা নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো অঞ্চলটি এখন এক আতঙ্কের জনপদ। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে স্পিডবোটে অস্ত্রের মহড়া, ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং নির্বিচারে গুলি বর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা চরবাসীর নিত্যদিনের অসহনীয় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষ দিন পার করছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়, যেখানে প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী চরজাজিরা এলাকায় বালুমহালের ম্যানেজার আজিজুল হাকিমকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা পুরো চরাঞ্চলে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার বিকেলে বেশ কয়েকটি স্পিডবোটে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে হামলা চালায়। তাদের একটি নৌযান থেকে ড্রোন ক্যামেরা উড়িয়ে নিখুঁতভাবে ভুক্তভোগীর অবস্থান নিশ্চিত করা হয় এবং এরপরই চলে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। আজিজুলকে ধরে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই গোষ্ঠীগুলো কতটা বেপরোয়া ও সুসংগঠিত। ঈশ্বরদীর লক্ষ্ণীকুণ্ডা নৌ পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত লাশের বাঁ চোখের ওপর দিয়ে গুলি ঢুকে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে, যা আধুনিক ও ভারী অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।

পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে পদ্মার এই দুর্গম এলাকায় অন্তত এগারোটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সক্রিয় থাকার প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে হাসানুজ্জামান কাঁকন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন ‘কাঁকন বাহিনী’ বর্তমানে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও আলোচিত নাম। বাঘা, চারঘাট, ঈশ্বরদী ও দৌলতপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তাদের ত্রাসের রাজত্ব। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল এবং নদীপথে চাঁদাবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পুলিশ ও নৌ পুলিশের অভিযানে বাহিনীর কিছু সদস্য গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। অপরাধীরা দ্রুত এক জেলার সীমানা থেকে অন্য জেলায় পালিয়ে যেতে পারায় এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সমন্বিত অভিযান চালানো পুলিশের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেনের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ সংঘাতে আধুনিক ভারী অস্ত্র ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক করে তুলেছে। পুলিশের রাজশাহী ও খুলনা রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখন যৌথভাবে এই অস্থিরতা দমনের কৌশল নিয়ে কাজ করছেন। এর আগেও ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামক বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার ও বহু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হলেও চরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে তা পর্যাপ্ত ছিল না। চরের বাসিন্দারা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযানের বদলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চার জেলার প্রশাসনের মধ্যে নিবিড় সমন্বয়। সন্ধ্যার পর নদীপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে রোগীবহন বা জরুরি প্রয়োজনেও চরের মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন। কৃষকরা ফসলের মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন, মাছ ধরতে বা গরু চরাতেও দিতে হচ্ছে নিয়মিত চাঁদা।

দুই দশক আগে এই অঞ্চলে পান্না বাহিনী ও লালচাঁদ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, যা তৎকালীন সময়ে জনজীবন স্থবির করে দিয়েছিল। আজকের পরিস্থিতি সেই অতীতের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের বলয় তৈরি হওয়ায় বারবার প্রশাসনিক উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন। চরের বাসিন্দাদের আকুতি একটাই—তারা আর বন্দুকের গুলির শব্দে ঘুম ভাঙতে চান না। একজন অপরাধীর পতন মানেই আরেকজনের উত্থান—এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে তারা প্রশাসনের একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। পদ্মার চরাঞ্চলে শান্তি ফিরবে কি না, তা এখন প্রশাসনের পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপ এবং সমন্বিত অভিযানের সফলতার ওপরই নির্ভর করছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


পদ্মার চরে বন্দুকধারীদের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে এলাকাবাসী

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী পদ্মার বিশাল চরাঞ্চল এখন অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা প্রতিনিয়ত চালাচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। বালুমহাল দখল এবং চরের জমির মালিকানা নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো অঞ্চলটি এখন এক আতঙ্কের জনপদ। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে স্পিডবোটে অস্ত্রের মহড়া, ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং নির্বিচারে গুলি বর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা চরবাসীর নিত্যদিনের অসহনীয় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষ দিন পার করছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়, যেখানে প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী চরজাজিরা এলাকায় বালুমহালের ম্যানেজার আজিজুল হাকিমকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা পুরো চরাঞ্চলে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার বিকেলে বেশ কয়েকটি স্পিডবোটে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে হামলা চালায়। তাদের একটি নৌযান থেকে ড্রোন ক্যামেরা উড়িয়ে নিখুঁতভাবে ভুক্তভোগীর অবস্থান নিশ্চিত করা হয় এবং এরপরই চলে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। আজিজুলকে ধরে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই গোষ্ঠীগুলো কতটা বেপরোয়া ও সুসংগঠিত। ঈশ্বরদীর লক্ষ্ণীকুণ্ডা নৌ পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত লাশের বাঁ চোখের ওপর দিয়ে গুলি ঢুকে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে, যা আধুনিক ও ভারী অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।

পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে পদ্মার এই দুর্গম এলাকায় অন্তত এগারোটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সক্রিয় থাকার প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে হাসানুজ্জামান কাঁকন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন ‘কাঁকন বাহিনী’ বর্তমানে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও আলোচিত নাম। বাঘা, চারঘাট, ঈশ্বরদী ও দৌলতপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তাদের ত্রাসের রাজত্ব। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল এবং নদীপথে চাঁদাবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পুলিশ ও নৌ পুলিশের অভিযানে বাহিনীর কিছু সদস্য গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। অপরাধীরা দ্রুত এক জেলার সীমানা থেকে অন্য জেলায় পালিয়ে যেতে পারায় এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সমন্বিত অভিযান চালানো পুলিশের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেনের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ সংঘাতে আধুনিক ভারী অস্ত্র ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক করে তুলেছে। পুলিশের রাজশাহী ও খুলনা রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখন যৌথভাবে এই অস্থিরতা দমনের কৌশল নিয়ে কাজ করছেন। এর আগেও ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামক বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার ও বহু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হলেও চরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে তা পর্যাপ্ত ছিল না। চরের বাসিন্দারা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযানের বদলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চার জেলার প্রশাসনের মধ্যে নিবিড় সমন্বয়। সন্ধ্যার পর নদীপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে রোগীবহন বা জরুরি প্রয়োজনেও চরের মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন। কৃষকরা ফসলের মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন, মাছ ধরতে বা গরু চরাতেও দিতে হচ্ছে নিয়মিত চাঁদা।

দুই দশক আগে এই অঞ্চলে পান্না বাহিনী ও লালচাঁদ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, যা তৎকালীন সময়ে জনজীবন স্থবির করে দিয়েছিল। আজকের পরিস্থিতি সেই অতীতের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের বলয় তৈরি হওয়ায় বারবার প্রশাসনিক উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন। চরের বাসিন্দাদের আকুতি একটাই—তারা আর বন্দুকের গুলির শব্দে ঘুম ভাঙতে চান না। একজন অপরাধীর পতন মানেই আরেকজনের উত্থান—এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে তারা প্রশাসনের একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। পদ্মার চরাঞ্চলে শান্তি ফিরবে কি না, তা এখন প্রশাসনের পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপ এবং সমন্বিত অভিযানের সফলতার ওপরই নির্ভর করছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল