২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট নিয়ে সম্প্রতি দেশের একটি গণমাধ্যমের নিয়মিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বাজেট এবং দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থার নানাদিক নিয়ে তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদের মতে, সংকোচনমূলক নীতির সাথে সরকারের রাজস্ব নীতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সরকারের রাজস্ব নীতি যদি সঠিক ও সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত না হয়, তবে কেবল আর্থিক নীতি বা সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্যকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কারণ একদিকে যেমন সুদের হার বাড়িয়ে ব্যাংক খাত থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে আবার এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করে সরাসরি বাজারে ছাড়া হচ্ছে। সরকারের এই দ্বিমুখী নীতির ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে গিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে।
আলোচনায় তিনি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত প্রায় চার বছর ধরেই অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই নাজুক অবস্থার কারণে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশ খাদ্য ঝুঁকিপূর্ণ বা লাল তালিকাভুক্ত দেশের মধ্যে রয়েছে। ড. জাহাঙ্গীর আলম স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের ভেতরের উৎপাদন আশানুরূপভাবে না বাড়িয়ে কেবল অন্য কোনো নীতি দিয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত ২০২৪-২৫ সময়ে কৃষি খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৪২ শতাংশ। আর চলতি বছরে প্রাথমিকভাবে যে প্রবৃদ্ধির আভাস পাওয়া যাচ্ছে তা প্রায় ২.৭২ শতাংশ। অথচ গত ৫৪ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের গড় প্রবৃদ্ধি সবসময় ৩ শতাংশ বা তার চেয়ে ওপরে ছিল। সেই তুলনায় বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার বেশ কম। আর স্বাভাবিক নিয়মেই উৎপাদন যখন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয়, তখন বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যায় এবং সরবরাহ কমলেই জিনিসের দাম একলাফে বেড়ে যায়। খাদ্যের ক্ষেত্রে এই সংকটটি এখন অত্যন্ত প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি দেশের বাজার ব্যবস্থার ওপর সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও তিনি বেশ জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের বর্তমান বাজার ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং তা এখন পুরোপুরি ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, বাজারে হস্তক্ষেপ করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা বা মজুত সরকারের হাতে নেই। সরকারি গুদামগুলোতে বড় জোর ২০ থেকে ২২ লাখ টন চাল ও গম মজুত থাকে, যা দিয়ে পুরো বাজারকে প্রভাবিত করা অসম্ভব। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের হাতে এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য মজুত থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষমতা ও সুযোগ অনেক বেশি এবং তারা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে যেভাবে ইচ্ছা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ ও ওঠানামা করাতে পারে। সরকারের হাতে যদি আরও বড় আকারের মজুত ও বাজারে হস্তক্ষেপ করার মতো ক্ষমতা থাকত, তবে এই অসাধু চক্রকে থামানো সম্ভব হতো।
বাজারের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবকেও তিনি অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মাঝখানে পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে পণ্যমূল্য আবারও বাড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, বৈশ্বিক সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদনের প্রধান উপকরণ যেমন— রাসায়নিক সার ও জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সারা বিশ্বে কৃষি উৎপাদন সামগ্রিকভাবে প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এবং প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, যার সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও। এমনকি দেশে এখন বোরো ধানের ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও ভরা মৌসুমে চালের দাম প্রতি কেজিতে তিন থেকে চার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট নিয়ে সম্প্রতি দেশের একটি গণমাধ্যমের নিয়মিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বাজেট এবং দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থার নানাদিক নিয়ে তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদের মতে, সংকোচনমূলক নীতির সাথে সরকারের রাজস্ব নীতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সরকারের রাজস্ব নীতি যদি সঠিক ও সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত না হয়, তবে কেবল আর্থিক নীতি বা সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্যকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কারণ একদিকে যেমন সুদের হার বাড়িয়ে ব্যাংক খাত থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে আবার এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করে সরাসরি বাজারে ছাড়া হচ্ছে। সরকারের এই দ্বিমুখী নীতির ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে গিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে।
আলোচনায় তিনি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত প্রায় চার বছর ধরেই অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই নাজুক অবস্থার কারণে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশ খাদ্য ঝুঁকিপূর্ণ বা লাল তালিকাভুক্ত দেশের মধ্যে রয়েছে। ড. জাহাঙ্গীর আলম স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের ভেতরের উৎপাদন আশানুরূপভাবে না বাড়িয়ে কেবল অন্য কোনো নীতি দিয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত ২০২৪-২৫ সময়ে কৃষি খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৪২ শতাংশ। আর চলতি বছরে প্রাথমিকভাবে যে প্রবৃদ্ধির আভাস পাওয়া যাচ্ছে তা প্রায় ২.৭২ শতাংশ। অথচ গত ৫৪ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের গড় প্রবৃদ্ধি সবসময় ৩ শতাংশ বা তার চেয়ে ওপরে ছিল। সেই তুলনায় বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার বেশ কম। আর স্বাভাবিক নিয়মেই উৎপাদন যখন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয়, তখন বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যায় এবং সরবরাহ কমলেই জিনিসের দাম একলাফে বেড়ে যায়। খাদ্যের ক্ষেত্রে এই সংকটটি এখন অত্যন্ত প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি দেশের বাজার ব্যবস্থার ওপর সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও তিনি বেশ জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের বর্তমান বাজার ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং তা এখন পুরোপুরি ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, বাজারে হস্তক্ষেপ করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা বা মজুত সরকারের হাতে নেই। সরকারি গুদামগুলোতে বড় জোর ২০ থেকে ২২ লাখ টন চাল ও গম মজুত থাকে, যা দিয়ে পুরো বাজারকে প্রভাবিত করা অসম্ভব। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের হাতে এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য মজুত থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষমতা ও সুযোগ অনেক বেশি এবং তারা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে যেভাবে ইচ্ছা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ ও ওঠানামা করাতে পারে। সরকারের হাতে যদি আরও বড় আকারের মজুত ও বাজারে হস্তক্ষেপ করার মতো ক্ষমতা থাকত, তবে এই অসাধু চক্রকে থামানো সম্ভব হতো।
বাজারের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবকেও তিনি অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মাঝখানে পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে পণ্যমূল্য আবারও বাড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, বৈশ্বিক সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদনের প্রধান উপকরণ যেমন— রাসায়নিক সার ও জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সারা বিশ্বে কৃষি উৎপাদন সামগ্রিকভাবে প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এবং প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, যার সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও। এমনকি দেশে এখন বোরো ধানের ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও ভরা মৌসুমে চালের দাম প্রতি কেজিতে তিন থেকে চার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

আপনার মতামত লিখুন