ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চার দিনব্যাপী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা বিএসএফের মধ্যকার মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন এমন এক সময়ে শেষ হতে চলেছে, যখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণের মনে একটি বড় প্রত্যাশা ছিল। ঢাকা আশা করেছিল যে, সীমান্তে চলমান দীর্ঘদিনের একাধিক অমীমাংসিত সংকটের অন্তত কিছু বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলবে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে। কিন্তু সম্মেলনের একদম শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী মহলে যে সামগ্রিক মূল্যায়ন সামনে আসছে, তার মূল কথা হলো—সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের নির্বিচার হত্যা, জোরপূর্বক পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা, মারাত্মক মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান, ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে বাংলাদেশবিরোধী সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ তৎপরতা কিংবা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অন্যান্য স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারতের কাছ থেকে কার্যকর, দৃশ্যমান বা ইতিবাচক কোনো অগ্রগতি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
গত আট জুন ভারতের মাটিতে শুরু হওয়া এই অতি সংবেদনশীল সম্মেলনটি আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে। বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর শীর্ষ প্রধানদের মধ্যে এটিই প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। স্বভাবতই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে অত্যন্ত বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর সুনিপুণ নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি ১৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লিতে হাজির হয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে আটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বা আলোচনার বিষয় উত্থাপন করে।
বাংলাদেশের এই শক্তিশালী প্রতিনিধিদলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় প্রতিনিধিদলে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন। তবে চার দিনব্যাপী এই বৈঠকের আলোচনা যত সামনের দিকে এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট ধরা পড়েছে যে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল উদ্বেগ ও সংকটগুলোর বিষয়ে ভারত সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিবর্তে কেবলই চেনা কূটনৈতিক ভাষা, চাতুর্যপূর্ণ কৌশল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক ধরনের সাধারণ ও ফাঁকা বক্তব্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলে সীমান্তে জ্বলন্ত ‘সাত দফা সংকট’ সমাধানে ভারতের কাছ থেকে কোনো ধরনের কার্যকর আশ্বাস না মেলায় ঢাকার ঝুলিতে শেষ পর্যন্ত শুধুই হতাশা জমা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে যে, সীমান্তে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও পুশইনের মতো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জানমালের ওপর সরাসরি আঘাত হানা ইস্যুগুলোতে বিএসএফের এমন চাতুর্যপূর্ণ ও কূটনৈতিকভাবে এড়িয়ে যাওয়ার নীতি দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গভীরতাকে কতটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমানার সবচেয়ে বড় ও রক্তাক্ত ক্ষতটি হলো আন্তর্জাতিক সব নিয়মকানুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও সাধারণ বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের অন্যায় গুলিবর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে ‘নন-লেথাল উইপন’ বা অনিনাশী ও কম ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্র ব্যবহারের বারবার প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেলেও, বাস্তবে বাংলাদেশের সীমানায় লাশের মিছিল বিন্দুমাত্র থামেনি। অতি সম্প্রতি গত আট মে তারিখেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচার গুলিতে মোরছালিন নামের এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং নবীর হোসেন নামের এক বৃদ্ধের করুণ মৃত্যু হয়। এবারের দিল্লির বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতীয় বাহিনীর এই বর্বরোচিত নির্মমতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সীমান্ত হত্যা যেকোনো মূল্যে শূন্যের কোঠায় নামানোর জোররালো দাবি তোলা হয়। কিন্তু বিএসএফ বরাবরের মতোই তাদের পুরোনো ও চেনা কূটনৈতিক সাফাইয়ের আশ্রয় নিয়ে এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করেছে। ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে যে, কেবল আত্মরক্ষার্থে এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের স্বার্থেই নাকি বিএসএফ গুলি চালাতে বাধ্য হয়, যা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং সত্যের চরম অপলাপ বলে ঢাকার প্রতিনিধিদল মনে করছে।
একই সাথে এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত ও জ্বলন্ত ইস্যু হিসেবে টেবিল গরম করেছিল বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইন বা অবৈধভাবে ভারতীয় অঞ্চলের লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার নজিরবিহীন অপচেষ্টা। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতের সীমানা দিয়ে বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানো হয়েছে। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যে ভারত যে অশুভ অপতৎপরতা শুরু করেছিল, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন বিএনপি সরকার গঠনের পরও তা থামেনি। বিশেষ করে গত ৩১ মে বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে বিএসএফ সরাসরি কাঁটাতারের বেড়া খুলে নারী ও শিশুসহ ১৩ জনকে জোর করে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি তা শক্ত হাতে প্রতিহত করে। এই ঘটনার পর থেকে দেশের সমগ্র সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করা হয় এবং স্থানীয় সীমান্তবাসীদের সক্রিয় সহায়তায় প্রতিদিন বিজিবি এই পুশইনের অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে। বৈঠকে বিজিবি এই পুশইনের বিরুদ্ধে কঠোর ও আইনি অবস্থান নিয়ে তীব্র বিরোধিতা করলেও বিএসএফের পক্ষ থেকে এই গুরুতর অভিযোগটি সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হয়। তারা উল্টো দাবি করে বসে যে, যারা বাংলাদেশে ঢুকছে তারা নাকি আসলে বাংলাদেশেরই নাগরিক এবং তাদের নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়াই উচিত। কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বা আইনি যাচাই-বাছাই ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই এভাবে পুশইন করার ভারতীয় অনড় মনোভাব বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের জন্য এক বিরাট ও দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও জনশক্তিকে ধ্বংস করার মূল মারাত্মক হাতিয়ার ফেনসিডিল, হেরোইন ও সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের সিংহভাগই চোরাই পথে আসে ভারত থেকে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বহু অবৈধ ফেনসিডিল তৈরির কারখানা এবং বড় বড় মদের গুদাম বছরের পর বছর ধরে সচল রাখা হয়েছে। বিজিবি বাংলাদেশে মাদক ঢোকা বন্ধে কঠোর নজরদারি বজায় রাখলেও ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতর থেকে মাদকের জোগান বন্ধে বিএসএফের সমন্বিত উদ্যোগের অভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মাদকের এসব কারখানার সুনির্দিষ্ট তালিকা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানানো হলেও ভারতের পক্ষ থেকে কিছুটা অস্বীকার এবং কিছুটা কূটনীতির ভাষা ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করা হয়। ফলে হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ওপারে পাচার হওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার সংকটটি পুরোপুরি অমীমাংসিতই রয়ে গেল। শুধু মাদকই নয়, গত ডিসেম্বরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে বিজিবির ২৪টি মারাত্মক বিস্ফোরকসহ একটি বড় চালান জব্দ করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, ওপার থেকে এখন অপরাধীচক্রের হাতে ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভারতের মাটিতে সক্রিয় এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিএসএফ কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কংক্রিট আশ্বাস দেয়নি।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টি। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাহাড়ের নিষিদ্ধ ও সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতির ক্যাম্প ও কোয়ার্টার এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের ভারতের মাটিতে বসে সক্রিয় থাকার অকাট্য ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিশেষ করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধান নাথান বম দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে কড়া আপত্তি জানায় ঢাকা। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে ‘সমন্বিতভাবে কাজ করার’ চেনা ফাঁকা বুলি ছাড়া কোনো শীর্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কোনো পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি মেলেনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিধিমালা লঙ্ঘন করে নোম্যানস ল্যান্ড বা শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার বিরুদ্ধে ঢাকা শক্ত অবস্থান নিলেও তা নিয়ে কোনো বরফ গলেনি।
বাংলাদেশ যখন নিজের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষায় এই সাত দফা এজেন্ডা নিয়ে অনড় অবস্থানে ছিল, তখন ভারত মূল আলোচনা থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতে বেশকিছু কাল্পনিক, মনগড়া ও বায়বীয় পাল্টা অভিযোগ সামনে এনে ঢাকাকে চাপে ফেলার কৌশল নেয়। বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, বাংলাদেশি নাগরিকরা নাকি প্রায়ই ভারতের কাঁটাতারের বেড়া কাটছে এবং বিএসএফ জওয়ানদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালাচ্ছে। এমনকি ভারত থেকে বাংলাদেশে পরিচালিত তথাকথিত ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অবাস্তব দাবিও তুলেছে তারা। ঢাকার প্রতিনিধিদল ভারতের এই কৌশলকে মূল সমস্যা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং এক ধরনের ব্লেম গেম বা দোষ চাপানোর সস্তা রাজনীতি হিসেবে দেখছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, মূলত ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকার আলোর ওপর ভিত্তি করেই দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রথম ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের কলকাতায় ১৯৭৫ সালের ২ ডিসেম্বরে। এরপর ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বছরে মাত্র একবার করে এই বৈঠক হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর থেকে বছরে দুবার পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও দিল্লিতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর আগে সবশেষ ৫৬তম সম্মেলনটি গত বছরের ২৫ থেকে ২৮ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর চলতি ৫৭তম সম্মেলনটি ভারতের নয়াদিল্লিতে গত ৮ জুন শুরু হয়ে শেষ হচ্ছে আজ ১১ জুন।
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম এই চার হাজার ছিয়ানব্বই কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত কেবল মানচিত্রের দুটি আলাদা রেখা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার লড়াই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কূটনৈতিক ভাষায় এই আলোচনাকে ‘সমস্যা মেটানোর উপযুক্ত মঞ্চ’ বলে গণমাধ্যমে প্রচার করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। নয়াদিল্লি সম্মেলন শেষ করে আজই ঢাকার প্রতিনিধিদল দেশে ফিরছে। তবে এবারের আলোচনার টেবিল থেকে দেশের জন্য দৃশ্যমান কোনো স্বস্তি, নিরাপত্তা বা বড় অর্জন না আসায় বাংলাদেশের জনমনে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও গভীর উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠক শেষ হলেও ভারতের পুশইনের জঘন্য অপচেষ্টা বন্ধ হবে না এবং সীমান্তে বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল থামানোর ন্যূনতম সদিচ্ছা ভারতের নেই—এবারের ৫৭তম সম্মেলন আসলে তারই এক ধরনের আনুষ্ঠানিক সিলমোহর। এমতাবস্থায় দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এখন ঢাকাকে একতরফাভাবে বিজিবির কঠোর পাহারা এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চার দিনব্যাপী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা বিএসএফের মধ্যকার মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন এমন এক সময়ে শেষ হতে চলেছে, যখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণের মনে একটি বড় প্রত্যাশা ছিল। ঢাকা আশা করেছিল যে, সীমান্তে চলমান দীর্ঘদিনের একাধিক অমীমাংসিত সংকটের অন্তত কিছু বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলবে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে। কিন্তু সম্মেলনের একদম শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী মহলে যে সামগ্রিক মূল্যায়ন সামনে আসছে, তার মূল কথা হলো—সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের নির্বিচার হত্যা, জোরপূর্বক পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা, মারাত্মক মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান, ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে বাংলাদেশবিরোধী সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ তৎপরতা কিংবা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অন্যান্য স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারতের কাছ থেকে কার্যকর, দৃশ্যমান বা ইতিবাচক কোনো অগ্রগতি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
গত আট জুন ভারতের মাটিতে শুরু হওয়া এই অতি সংবেদনশীল সম্মেলনটি আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে। বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর শীর্ষ প্রধানদের মধ্যে এটিই প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। স্বভাবতই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলনকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে অত্যন্ত বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর সুনিপুণ নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি ১৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লিতে হাজির হয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে আটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বা আলোচনার বিষয় উত্থাপন করে।
বাংলাদেশের এই শক্তিশালী প্রতিনিধিদলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় প্রতিনিধিদলে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন। তবে চার দিনব্যাপী এই বৈঠকের আলোচনা যত সামনের দিকে এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট ধরা পড়েছে যে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল উদ্বেগ ও সংকটগুলোর বিষয়ে ভারত সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিবর্তে কেবলই চেনা কূটনৈতিক ভাষা, চাতুর্যপূর্ণ কৌশল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক ধরনের সাধারণ ও ফাঁকা বক্তব্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলে সীমান্তে জ্বলন্ত ‘সাত দফা সংকট’ সমাধানে ভারতের কাছ থেকে কোনো ধরনের কার্যকর আশ্বাস না মেলায় ঢাকার ঝুলিতে শেষ পর্যন্ত শুধুই হতাশা জমা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে যে, সীমান্তে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও পুশইনের মতো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জানমালের ওপর সরাসরি আঘাত হানা ইস্যুগুলোতে বিএসএফের এমন চাতুর্যপূর্ণ ও কূটনৈতিকভাবে এড়িয়ে যাওয়ার নীতি দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গভীরতাকে কতটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমানার সবচেয়ে বড় ও রক্তাক্ত ক্ষতটি হলো আন্তর্জাতিক সব নিয়মকানুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও সাধারণ বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের অন্যায় গুলিবর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে ‘নন-লেথাল উইপন’ বা অনিনাশী ও কম ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্র ব্যবহারের বারবার প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেলেও, বাস্তবে বাংলাদেশের সীমানায় লাশের মিছিল বিন্দুমাত্র থামেনি। অতি সম্প্রতি গত আট মে তারিখেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচার গুলিতে মোরছালিন নামের এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং নবীর হোসেন নামের এক বৃদ্ধের করুণ মৃত্যু হয়। এবারের দিল্লির বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতীয় বাহিনীর এই বর্বরোচিত নির্মমতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সীমান্ত হত্যা যেকোনো মূল্যে শূন্যের কোঠায় নামানোর জোররালো দাবি তোলা হয়। কিন্তু বিএসএফ বরাবরের মতোই তাদের পুরোনো ও চেনা কূটনৈতিক সাফাইয়ের আশ্রয় নিয়ে এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করেছে। ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে যে, কেবল আত্মরক্ষার্থে এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের স্বার্থেই নাকি বিএসএফ গুলি চালাতে বাধ্য হয়, যা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং সত্যের চরম অপলাপ বলে ঢাকার প্রতিনিধিদল মনে করছে।
একই সাথে এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত ও জ্বলন্ত ইস্যু হিসেবে টেবিল গরম করেছিল বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইন বা অবৈধভাবে ভারতীয় অঞ্চলের লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার নজিরবিহীন অপচেষ্টা। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতের সীমানা দিয়ে বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানো হয়েছে। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যে ভারত যে অশুভ অপতৎপরতা শুরু করেছিল, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন বিএনপি সরকার গঠনের পরও তা থামেনি। বিশেষ করে গত ৩১ মে বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে বিএসএফ সরাসরি কাঁটাতারের বেড়া খুলে নারী ও শিশুসহ ১৩ জনকে জোর করে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি তা শক্ত হাতে প্রতিহত করে। এই ঘটনার পর থেকে দেশের সমগ্র সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করা হয় এবং স্থানীয় সীমান্তবাসীদের সক্রিয় সহায়তায় প্রতিদিন বিজিবি এই পুশইনের অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে। বৈঠকে বিজিবি এই পুশইনের বিরুদ্ধে কঠোর ও আইনি অবস্থান নিয়ে তীব্র বিরোধিতা করলেও বিএসএফের পক্ষ থেকে এই গুরুতর অভিযোগটি সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হয়। তারা উল্টো দাবি করে বসে যে, যারা বাংলাদেশে ঢুকছে তারা নাকি আসলে বাংলাদেশেরই নাগরিক এবং তাদের নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়াই উচিত। কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বা আইনি যাচাই-বাছাই ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই এভাবে পুশইন করার ভারতীয় অনড় মনোভাব বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের জন্য এক বিরাট ও দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও জনশক্তিকে ধ্বংস করার মূল মারাত্মক হাতিয়ার ফেনসিডিল, হেরোইন ও সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের সিংহভাগই চোরাই পথে আসে ভারত থেকে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বহু অবৈধ ফেনসিডিল তৈরির কারখানা এবং বড় বড় মদের গুদাম বছরের পর বছর ধরে সচল রাখা হয়েছে। বিজিবি বাংলাদেশে মাদক ঢোকা বন্ধে কঠোর নজরদারি বজায় রাখলেও ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতর থেকে মাদকের জোগান বন্ধে বিএসএফের সমন্বিত উদ্যোগের অভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মাদকের এসব কারখানার সুনির্দিষ্ট তালিকা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানানো হলেও ভারতের পক্ষ থেকে কিছুটা অস্বীকার এবং কিছুটা কূটনীতির ভাষা ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করা হয়। ফলে হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ওপারে পাচার হওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার সংকটটি পুরোপুরি অমীমাংসিতই রয়ে গেল। শুধু মাদকই নয়, গত ডিসেম্বরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে বিজিবির ২৪টি মারাত্মক বিস্ফোরকসহ একটি বড় চালান জব্দ করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, ওপার থেকে এখন অপরাধীচক্রের হাতে ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভারতের মাটিতে সক্রিয় এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিএসএফ কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কংক্রিট আশ্বাস দেয়নি।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টি। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাহাড়ের নিষিদ্ধ ও সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতির ক্যাম্প ও কোয়ার্টার এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের ভারতের মাটিতে বসে সক্রিয় থাকার অকাট্য ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিশেষ করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধান নাথান বম দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে কড়া আপত্তি জানায় ঢাকা। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে ‘সমন্বিতভাবে কাজ করার’ চেনা ফাঁকা বুলি ছাড়া কোনো শীর্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কোনো পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি মেলেনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিধিমালা লঙ্ঘন করে নোম্যানস ল্যান্ড বা শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার বিরুদ্ধে ঢাকা শক্ত অবস্থান নিলেও তা নিয়ে কোনো বরফ গলেনি।
বাংলাদেশ যখন নিজের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষায় এই সাত দফা এজেন্ডা নিয়ে অনড় অবস্থানে ছিল, তখন ভারত মূল আলোচনা থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতে বেশকিছু কাল্পনিক, মনগড়া ও বায়বীয় পাল্টা অভিযোগ সামনে এনে ঢাকাকে চাপে ফেলার কৌশল নেয়। বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, বাংলাদেশি নাগরিকরা নাকি প্রায়ই ভারতের কাঁটাতারের বেড়া কাটছে এবং বিএসএফ জওয়ানদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালাচ্ছে। এমনকি ভারত থেকে বাংলাদেশে পরিচালিত তথাকথিত ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অবাস্তব দাবিও তুলেছে তারা। ঢাকার প্রতিনিধিদল ভারতের এই কৌশলকে মূল সমস্যা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং এক ধরনের ব্লেম গেম বা দোষ চাপানোর সস্তা রাজনীতি হিসেবে দেখছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, মূলত ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকার আলোর ওপর ভিত্তি করেই দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রথম ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের কলকাতায় ১৯৭৫ সালের ২ ডিসেম্বরে। এরপর ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বছরে মাত্র একবার করে এই বৈঠক হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর থেকে বছরে দুবার পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও দিল্লিতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর আগে সবশেষ ৫৬তম সম্মেলনটি গত বছরের ২৫ থেকে ২৮ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর চলতি ৫৭তম সম্মেলনটি ভারতের নয়াদিল্লিতে গত ৮ জুন শুরু হয়ে শেষ হচ্ছে আজ ১১ জুন।
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম এই চার হাজার ছিয়ানব্বই কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত কেবল মানচিত্রের দুটি আলাদা রেখা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার লড়াই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কূটনৈতিক ভাষায় এই আলোচনাকে ‘সমস্যা মেটানোর উপযুক্ত মঞ্চ’ বলে গণমাধ্যমে প্রচার করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। নয়াদিল্লি সম্মেলন শেষ করে আজই ঢাকার প্রতিনিধিদল দেশে ফিরছে। তবে এবারের আলোচনার টেবিল থেকে দেশের জন্য দৃশ্যমান কোনো স্বস্তি, নিরাপত্তা বা বড় অর্জন না আসায় বাংলাদেশের জনমনে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও গভীর উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠক শেষ হলেও ভারতের পুশইনের জঘন্য অপচেষ্টা বন্ধ হবে না এবং সীমান্তে বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল থামানোর ন্যূনতম সদিচ্ছা ভারতের নেই—এবারের ৫৭তম সম্মেলন আসলে তারই এক ধরনের আনুষ্ঠানিক সিলমোহর। এমতাবস্থায় দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এখন ঢাকাকে একতরফাভাবে বিজিবির কঠোর পাহারা এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন