দিকপাল

বিশ্বকাপের ‘ফাইনালের ফাইনাল’ ছিল যে ম্যাচ


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ | ১০:২৩ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপের ‘ফাইনালের ফাইনাল’ ছিল যে ম্যাচ

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো শুধুমাত্র একটি শিরোপা জয়ের গল্প নয়; বরং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার গল্প। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল তেমনই একটি ম্যাচ। কারণ সেই ম্যাচে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই নির্ধারিত হয়নি, নির্ধারিত হয়েছিল কিংবদন্তি ‘জুলে রিমে’ ট্রফির স্থায়ী মালিকও।

বর্তমানে ফিফা বিশ্বকাপে যে ট্রফি দেওয়া হয়, সেটি ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয়েছে। তার আগে বিশ্বকাপজয়ী দলকে দেওয়া হতো ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের সম্মানে ট্রফিটির নামকরণ করা হয়েছিল। ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ফিফার নেতৃত্বে থাকা এই ক্রীড়া সংগঠকই বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকের আদলে তৈরি ট্রফিটি ছিল স্টার্লিং রুপার ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া। এর ভিত্তিতে ব্যবহৃত হয়েছিল মূল্যবান পাথর লাপিস লাজুলি। শুধু নান্দনিকতাই নয়, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল এই ট্রফি।

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, যে দেশ প্রথম তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফির মালিক হবে। ফলে বিশ্বকাপের প্রথম কয়েক দশকে ট্রফিটি নিজেদের করে নেওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল অত্যন্ত তীব্র।

১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে শিরোপা জিতে উরুগুয়ে এবং ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতালি দুইবার করে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। ফলে উভয় দলের সামনে সুযোগ ছিল তৃতীয় শিরোপা জিতে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেওয়ার। তবে তারা কেউই সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।

মজার বিষয় হলো, জুলে রিমে নিজে জীবদ্দশায় ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেননি। ১৯৫৬ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় বিশ্বকাপজয়ী দেশের তালিকায় ছিল উরুগুয়ে, ইতালি এবং ১৯৫৪ সালের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি।

এর দুই বছর পর, ১৯৫৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। এরপর ১৯৬২ সালেও শিরোপা ধরে রাখে সেলেসাওরা। ফলে ১৯৭০ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল, ইতালি ও উরুগুয়ের প্রত্যেকের ঝুলিতে ছিল দুটি করে বিশ্বকাপ শিরোপা।

এমন পরিস্থিতিতে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক অনন্য মঞ্চ। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও ইতালি—দুই দলই তৃতীয় শিরোপার সন্ধানে।

সেই ম্যাচে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারায় ব্রাজিল। কিংবদন্তি Pelé-এর নেতৃত্বে জয়ের মাধ্যমে সেলেসাওরা শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই হয়নি, স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নিয়েছিল জুলে রিমে ট্রফিও।

ফলে ১৯৭০ সালের সেই ফাইনালকে অনেক ইতিহাসবিদ ও ফুটবল বিশ্লেষক বিশ্বকাপের ‘ফাইনালের ফাইনাল’ বলে আখ্যা দেন। কারণ এটি ছিল এমন এক ম্যাচ, যেখানে নির্ধারিত হয়েছিল শুধু একটি টুর্নামেন্টের বিজয়ী নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ট্রফির চিরস্থায়ী ঠিকানাও।

জুলে রিমে ট্রফির যাত্রা সেখানেই শেষ হয়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বকাপে চালু হয় নতুন ট্রফি, যা আজও ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


বিশ্বকাপের ‘ফাইনালের ফাইনাল’ ছিল যে ম্যাচ

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

featured Image

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো শুধুমাত্র একটি শিরোপা জয়ের গল্প নয়; বরং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার গল্প। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল তেমনই একটি ম্যাচ। কারণ সেই ম্যাচে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই নির্ধারিত হয়নি, নির্ধারিত হয়েছিল কিংবদন্তি ‘জুলে রিমে’ ট্রফির স্থায়ী মালিকও।

বর্তমানে ফিফা বিশ্বকাপে যে ট্রফি দেওয়া হয়, সেটি ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয়েছে। তার আগে বিশ্বকাপজয়ী দলকে দেওয়া হতো ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের সম্মানে ট্রফিটির নামকরণ করা হয়েছিল। ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ফিফার নেতৃত্বে থাকা এই ক্রীড়া সংগঠকই বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকের আদলে তৈরি ট্রফিটি ছিল স্টার্লিং রুপার ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া। এর ভিত্তিতে ব্যবহৃত হয়েছিল মূল্যবান পাথর লাপিস লাজুলি। শুধু নান্দনিকতাই নয়, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল এই ট্রফি।

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, যে দেশ প্রথম তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফির মালিক হবে। ফলে বিশ্বকাপের প্রথম কয়েক দশকে ট্রফিটি নিজেদের করে নেওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল অত্যন্ত তীব্র।

১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে শিরোপা জিতে উরুগুয়ে এবং ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতালি দুইবার করে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। ফলে উভয় দলের সামনে সুযোগ ছিল তৃতীয় শিরোপা জিতে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেওয়ার। তবে তারা কেউই সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।

মজার বিষয় হলো, জুলে রিমে নিজে জীবদ্দশায় ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেননি। ১৯৫৬ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় বিশ্বকাপজয়ী দেশের তালিকায় ছিল উরুগুয়ে, ইতালি এবং ১৯৫৪ সালের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি।

এর দুই বছর পর, ১৯৫৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। এরপর ১৯৬২ সালেও শিরোপা ধরে রাখে সেলেসাওরা। ফলে ১৯৭০ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল, ইতালি ও উরুগুয়ের প্রত্যেকের ঝুলিতে ছিল দুটি করে বিশ্বকাপ শিরোপা।

এমন পরিস্থিতিতে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক অনন্য মঞ্চ। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও ইতালি—দুই দলই তৃতীয় শিরোপার সন্ধানে।

সেই ম্যাচে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারায় ব্রাজিল। কিংবদন্তি Pelé-এর নেতৃত্বে জয়ের মাধ্যমে সেলেসাওরা শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই হয়নি, স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নিয়েছিল জুলে রিমে ট্রফিও।

ফলে ১৯৭০ সালের সেই ফাইনালকে অনেক ইতিহাসবিদ ও ফুটবল বিশ্লেষক বিশ্বকাপের ‘ফাইনালের ফাইনাল’ বলে আখ্যা দেন। কারণ এটি ছিল এমন এক ম্যাচ, যেখানে নির্ধারিত হয়েছিল শুধু একটি টুর্নামেন্টের বিজয়ী নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ট্রফির চিরস্থায়ী ঠিকানাও।

জুলে রিমে ট্রফির যাত্রা সেখানেই শেষ হয়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বকাপে চালু হয় নতুন ট্রফি, যা আজও ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল